জমি কেনার আগে দলিল যাচাই করবেন কীভাবে, জানুন রেজিস্ট্রির সঠিক নিয়ম
-c8d70b-720x405.webp)
স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় বা মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল হলো ‘কবলা’ বা সাধারণ ভাষায় ‘দলিল’। এটি কেবল একটি কাগজ নয়, বরং ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সম্পাদিত আইনি চুক্তির লিখিত প্রমাণপত্র। আইনগতভাবে, কোনো ব্যক্তি যখন অন্যের কাছে জমি হস্তান্তর করেন, তখন ভূমির বিস্তারিত বিবরণ, বিক্রেতা ও ক্রেতার পরিচয়, হস্তান্তর প্রক্রিয়া এবং হস্তান্তরিত মূল্যের পরিমাণ ইত্যাদি সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করে যে চুক্তিনামা প্রস্তুত করা হয়, তাকেই দলিল বলে।
জমির হিসাব, বাড়ী নির্মাণ ও এর তত্ত্বাবধানের আইন ও আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে বইটিতে আলোচনা করেছেন মো: শহিদুল ইসলাম (শাহীন)। তার রচিত বইটির অষ্টম অধ্যায়ের ৮৭, ৮৮ ও ৮৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দলিল লিখন ও রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৪ থেকে ৫৭ ধারা অনুযায়ী, যেকোনো স্থাবর সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয় কার্যকর করার জন্য কবলা দলিল প্রস্তুত করা ও তা সরকারি রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত (রেজিস্ট্রি) করা বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন না হলে আইনের চোখে ঐ হস্তান্তরের কোনো ভিত্তি থাকে না। দানপত্র, হেবানামা বা ওয়াকফসহ বিভিন্ন প্রকার দলিল থাকলেও জমি কেনাবেচায় 'সাফ কবলা' বা বিক্রয় দলিলই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
পরবর্তীকালে জমি নিয়ে যেকোনো ধরনের আইনি জটিলতা বা স্বত্ব সংক্রান্ত বিরোধ এড়াতে সঠিক নিয়ম মেনে দলিল প্রস্তুত করা, এতে ব্যবহৃত পরিভাষা স্পষ্ট রাখা এবং মূল ভলিউমের সাথে তা যাচাই করে রেজিস্ট্রি করা অত্যন্ত জরুরি। সহজ কথায়, জমির প্রকৃত মালিকানা প্রমাণের মূল চাবিকাঠিই হলো একটি নির্ভুল ও রেজিস্ট্রিকৃত দলিল।
জমি কেনাবেচা ও দলিল রেজিস্ট্রি, আসল-নকল চিনবেন যেভাবে
জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে ‘দলিল’ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি। আইনের ভাষায়, জমি কেনাবেচার সময় বিক্রেতা ও ক্রেতার পরিচয়, জমির বিবরণ, মূল্য এবং তিনজন সাক্ষী ও একজন সনাক্তকারীর উপস্থিতিতে সম্পাদিত লিখিত চুক্তিকে ‘দলিল’ বা ‘কবলা’ বলা হয়। ভুল সংশোধন ও প্রতারণা এড়াতে দলিল রেজিস্ট্রি এবং আইনি নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক।

দলিলের ধরন ও আইনি বাধ্যবাধকতা
জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সাফ কবলা, দানপত্র, হেবানামা, হেবা-বিল-এওয়াজ ও ওয়াকফসহ বিভিন্ন ধরনের দলিল প্রচলিত রয়েছে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৪ থেকে ৫৭ ধারা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচায় কবলা দলিল অপরিহার্য। তবে কেবল ফরমেট দেখে দলিল লিখলেই চলে না; দলিল লেখকদের 'ইয়াদকির্দ', 'কস্য', 'পত্রমিদং'-এর মতো মান্ধাতা আমলের ও দুর্বোধ্য শব্দ পরিহার করে হালনাগাদ আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হয়। একজন দক্ষ দলিল লেখকের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ভূমি আইন, চুক্তি আইন, দান আইন ও রেজিস্ট্রেশন আইন সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা জরুরি।
রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি ও খরচপাতি
দলিল প্রস্তুতের পর রেজিস্ট্রেশন আইন, অর্থ আইন ও স্ট্যাম্প আইন অনুযায়ী তা রেজিস্ট্রি করতে হয়। বর্তমানে স্ট্যাম্প ফি, ভূমি উন্নয়ন কর, উৎস কর ও জমির মূল্যের ওপর নির্ধারিত রেজিস্ট্রি ফি পরিশোধ করতে হয়। হেবা ঘোষণাপত্রের রেজিস্ট্রেশন ফি ১০০ টাকা এবং স্ট্যাম্প ফি ৫০ টাকা। অসুস্থতা বা অন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে দাতা অফিসে আসতে অপারগ হলে রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী কমিশনে বাড়িতে, হাসপাতালে বা জেলখানায় গিয়ে রেজিস্ট্রি করানোর বিধান রয়েছে।
তবে রেকর্ডে ভুল থাকলে বা গ্রহীতার টিপসই/স্বাক্ষর না থাকলে দলিল রেজিস্ট্রি না করে সাব-রেজিস্ট্রার লিখিত কারণ দর্শিয়ে তা ফেরত দেবেন। এছাড়া, হস্তান্তরিত জমির নকশা দলিলে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক।
জাল দলিল চেনার ও সচেতন থাকার কিছু উপায়
অসাধু চক্র নানা কৌশলে সহ-শরিকদের না জানিয়ে, ভুয়া মালিক সাজিয়ে বা মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে জাল দলিল তৈরি করে। আবার ঘষামাজা করে কিংবা তারিখ ঠিক রেখে বিষয়বস্তু বদলে জালিয়াতি করা হয়। জমি কেনার আগে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি-
রেজিস্ট্রি অফিসে যাচাই: সন্দেহ হলে নির্দিষ্ট আবেদন করে ভলিউমে থাকা আসল দলিলের সঙ্গে সিল ও তথ্য মিলিয়ে দেখুন।

ভায়া দলিল পরীক্ষা: বিক্রেতার কাছ থেকে মূল দলিলের পাশাপাশি সব ভায়া দলিল চেয়ে নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ক্রমিক নম্বর যাচাই করুন।
নামজারি ও জরিপ: সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে নামজারির ধারাবাহিকতা এবং সিএস জরিপের সঙ্গে খতিয়ানের মিল আছে কি না পরীক্ষা করুন।
স্ট্যাম্প বিক্রেতার তথ্য: স্ট্যাম্পের পেছনের ভেন্ডারের নাম ও ক্রমিক নম্বর সঠিক কি না যাচাই করে নিন।
সরেজমিন অনুসন্ধান: একাধিক মালিক বা অংশীদার থাকলে এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের মাধ্যমে প্রকৃত মালিক চিহ্নিত করুন।
সিল ও স্বাক্ষর পরীক্ষা: প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ দিয়ে স্বাক্ষর ও অফিসের সিল পরীক্ষা করিয়ে নিন।
কাগজপত্র ও তারিখের সঙ্গতি: অসংলগ্নতা দূর করতে দলিলের কাগজ, তারিখ, দাগ নম্বর ও ঠিকানা ভালোভাবে খতিয়ে দেখুন।
বিশেষ দলিল যাচাই: আমমোক্তারনামায় উভয় পক্ষের ছবি রয়েছে কি না এবং দানকৃত জমির ক্ষেত্রে দখলের তারিখ ও গ্রহীতার সম্পর্ক স্পষ্ট কি না তা নিশ্চিত হন। এছাড়া সাম্প্রতিক বিক্রিত দলিলের লেখকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বললেও জালিয়াতি এড়ানো সম্ভব।

আইনি সুরক্ষায় আগাম প্রস্তুতি
জমির মালিকানা নিশ্চিত না হয়ে বা আইনি দিকগুলো ভালো করে যাচাই না করে আর্থিক লেনদেন করলে পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তাই সামান্য সতর্কতাই পারে আপনাকে বড় ধরনের জালিয়াতি ও আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।
লেখকের পরিচিতি
মোঃ শহিদুল ইসলাম (শাহীন) জামালপুর জেলার সদর থানাধীন দাপুনিয়া গ্রামে নানার বাড়ি আতাহের আলী সাধু মাস্টারের বাড়ীতে ১৯৭১ সালে ২৬শে মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। দাদা বাজিতুল্লাহ্ সরকার টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার মুতণ্ডী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কর্ত্তাঁ ছিলেন। পিতা- মরহুম মোকাদ্দেছ আলী বাংলাদেশ রেলওয়েতে মেডিকেল বিভাগে ফার্মাসিষ্ট হিসেবে দেশের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে চাকুরী করে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে অবসর গ্রহণ করেন। মাতা- মোছাঃ ফিরোজা বেওয়া।
তিনি দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানার রিয়াজনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার মুতণ্ডী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিনাজপুর জেলার সেবাতগঞ্জ থানার সেবাতগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি, দিনাজপুর সঙ্গীত ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি, জামালপুর আশেক মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বি.এ পাশ করে জামালপুর আইন কলেজে অধ্যয়ন করেন। কম্পিউটার সাইন্স ও মেডিক্যাল সাইন্সে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ময়নামতি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে আমিন-সার্ভেয়ার ডিপ্লোমা করেন। ধানসিঁড়ি মডেল টাউনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট ও ফ্ল্যাটের ব্যবসার সাথে জড়িত। জামালপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয় পরিষদ, অপরাধ সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি এবং রোগী কল্যাণ সমিতির আজীবন সদস্য সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি বাজিতুল্লাহ্-সাধু মাষ্টার স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক। জামালপুর জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তার লেখা অনেক কবিতা, গল্প, নাটক দেশের বহু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পায়। তার লেখা উপন্যাস বড় প্রেম, ফারায়েজ শিক্ষার সহজ উপায়, জমির হিসাব আইন-বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান, ভূমি আইন মামলা ও রায়, কম্পিউটার শিক্ষার সহজ উপায়, সূত্রের পকেট ডায়রি, ভূমি নামজারি, দলিল লিখন পদ্ধতি ও রেজিস্ট্রেশন আইন, এফিডেবিট চুক্তিপত্র লিখন পদ্ধতি, ডিজিটাল ভূমি জরিপ, বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া আইন ও বিধি, কড়া ক্রান্তি বা ব্রিটিশ পদ্ধতি শিক্ষার সহজ উপায় এবং চেক ডিসঅনার আইন ও বিধি বই আকারে প্রকাশ করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে বই লেখার বিশেষ অবদানের জন্য তাকে ছায়ানীত পদক ২০১৪ প্রদান করা হয়।


