স্কুল, কলেজ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জমি দানে সঠিক নিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া

মানবকল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন কিংবা পরকালের সওয়াবের আশায় অনেকেই নিজেদের কষ্টে অর্জিত জমি বিভিন্ন শিক্ষা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে দান করে থাকেন। একটি স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির কিংবা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জমি দান অত্যন্ত মহৎ ও প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ। তবে কেবল সদিচ্ছা বা আবেগ দিয়ে জমি দান করলেই তা আইনিভাবে সুরক্ষিত হয় না।
উপযুক্ত আইনি নিয়ম না মেনে জমি দান করলে কিংবা দলিলে ভুল ব্যক্তির নাম বা পদবী যুক্ত হলে ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে জটিল আইনি বিরোধ, এমনকি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে উক্ত জমিটি। জমি দানের ক্ষেত্রে ঠিক কার পদের অনুকূলে দলিল করতে হয়, প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী নিয়ম কেমন বদলায়, কিংবা পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়লে সম্পত্তির মালিকানাই বা কার কাছে থাকবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ৩২০ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘প্রতিষ্ঠানের নামে কিভাবে জমি দান করবেন?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের পদের অনুকূলে হবে দান দলিল
একটি প্রতিষ্ঠানকে জমি দান করার ক্ষেত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দলিলের গ্রহীতার নাম। কোনো ব্যক্তির নাম প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে জড়িয়ে দলিল করা আইনিভাবে ভুল। দান করতে হবে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে। তবে দলিলটি প্রতিষ্ঠানের কার নামে হবে, তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ধরনের ওপর।
যেমন, স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসার ক্ষেত্রে জমি দান করার সময় জমির দলিলটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক, প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা ভাইস চেয়ারম্যানের পদের অনুকূলে সম্পাদন করতে হবে।
তবে, একটি বড় ব্যতিক্রম আছে। সেটি হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যদি আপনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জমি দান করতে চান, তবে দলিলটি নির্দিষ্টভাবে ‘মহাপরিচালক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ, ঢাকা’ অথবা ‘সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা’-এর অনুকূলে করতে হবে।
লিমিটেড কোম্পানি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়ম
যদি কোনো লিমিটেড কোম্পানি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামে জমি দান করার প্রশ্ন আসে, তবে নিয়মটি একটু ভিন্ন। সেসব ক্ষেত্রে কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), বা কোম্পানির পক্ষ থেকে আইনত ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য কোনো পদস্থ কর্মকর্তা প্রস্তাবিত জমি ক্রয় বা দানের দলিলের গ্রহীতা হতে পারেন।

জীবন স্বত্ত্বে দান (Gift with Life Interest): নিয়ম ও সুবিধা
জমি দান করার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বিধান হলো ‘জীবন স্বত্ত্বে দান’। ১৯০৮ সালের স্ট্যাম্প অ্যাক্টের ৫৮ নম্বর আর্টিকেল অনুসারে, এই নিয়মটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মসজিদ, মাদ্রাসা বা কবরস্থানের মতো ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য।
এই বিধানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, আপনি যে প্রতিষ্ঠানকে জমি দান করবেন, তারা সেই সম্পত্তি শুধুমাত্র ভোগ-দখল করতে পারবে। তারা এই সম্পত্তি অন্য কারো কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবে না।
এক্ষেত্রে জমির মালিকানা দাতার নামেই থাকে, এবং ভূমির উন্নয়ন কর (খাজনা) দাতার নামেই পরিশোধ করতে হবে। এর একটি বড় সুবিধা হলো, ভবিষ্যতে কোনো কারণে যদি ওই প্রতিষ্ঠানটি অকার্যকর বা বন্ধ হয়ে যায়, তবে দান করা জমিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাতা বা তার বৈধ উত্তরাধিকারীর মালিকানায় ফিরে আসবে। সেক্ষেত্রে দান দলিলটি বাতিল বলে গণ্য হবে।
রেজিস্ট্রেশন খরচ ও প্রয়োজনীয় ফি
এ জাতীয় দান দলিল রেজিস্ট্রির জন্য নিম্নলিখিত হারে সরকারি ফি প্রদান করতে হয়।
স্ট্যাম্প ফি: জমির দালিলিক মূল্যের ২%।
রেজিস্ট্রেশন ফি: জমির দালিলিক মূল্যের ২.৫%।
অন্যান্য: এছাড়া প্রচলিত হারে 'ই-ফি' প্রযোজ্য হবে।
পরিশেষে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে জমি দান করার আগে দাতা’কে অবশ্যই দলিলের ভাষা ও গ্রহীতার পদের সঠিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। জীবন স্বত্ত্বে দানের বিধানটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নিরাপদ বিকল্প, যা দাতার স্বার্থও রক্ষা করে। আইনি ভুল বা অস্পষ্ট দলিলের কারণে ভবিষ্যতে যাতে মহৎ দানটি আইনি প্যাঁচে না পড়ে, সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। রেজিস্ট্রি করার আগে একজন অভিজ্ঞ উকিল বা সাব-রেজিস্ট্রারের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


-7a8543.jpg)