দলিলে জমি বেশি কিন্তু নকশায় কম, কোথায় যাবেন ও কী করবেন
-78da48-720x405.webp)
জমিজমাসংক্রান্ত জটিলতা ও সীমানা বিরোধ আমাদের দেশের অত্যন্ত পরিচিত একটি সমস্যা। বিশেষ করে, ক্রয়কৃত জমি বা পৈতৃক সম্পত্তির নকশা (ম্যাপ) ও দলিলের পরিমাণের মধ্যে মিল না থাকা একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবে হয়তো জমিতে ৪০ শতক জায়গা দখল ও ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সরকারি জরিপ কিংবা বিএস/আরএস নকশায় দেখা যায় তা উল্লেখ রয়েছে মাত্র ৩০ শতক।
নকশা ও দলিলের এই স্পষ্ট অসঙ্গতির ফলে প্রতিনিয়ত প্রতিবেশী ও স্বজনদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, সামাজিক বিভ্রান্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি মামলা-মোকদ্দমা। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক ভূমিমালিক বুঝে উঠতে পারেন না কীভাবে এই ভুলের সমাধান করবেন। তবে হতাশ না হয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক সঠিক নিয়ম জানা থাকলে অতি সহজেই এ ধরনের জটিলতার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান সম্ভব।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ঊনবিংশ অধ্যায়ের ৩৯৩ ও ৩৯৪ পৃষ্ঠায় ‘খতিয়ান কিংবা দলিলে বেশি সরেজমিন ম্যাপে জমি কম-করণীয় কী?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ভূমি বিশেষজ্ঞরা জানান, নকশা বা পরিমাপের অসঙ্গতি দূর করতে ধাপে ধাপে কিছু আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন-
দলিলের তথ্য ও নথি সংগ্রহ
প্রথমে জমির মূল দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণ ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। এরপর সি.এস, এস.এ, আর.এস এবং বি.এস পর্চাসহ সংশ্লিষ্ট সব নকশা বা ম্যাপ সংগ্রহ করতে হবে। নথিপত্রে উল্লেখিত মৌজার নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং মালিকের নাম সঠিকভাবে যাচাই করে রাখতে হবে।
স্কেল দিয়ে প্রাথমিক পরিমাপ
বিভিন্ন জরিপের (সি.এস থেকে বি.এস) নকশা ও পর্চা সামঞ্জস্য রেখে স্কেলের মাধ্যমে জমির প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করতে হবে। সেই সঙ্গে জমির চৌহদ্দি, চারপাশের দাগ নম্বর ও রাস্তার অবস্থান মিলিয়ে দেখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, খতিয়ান হলো মালিকানার মূল ভিত্তি; এতে জমি কম দেখালে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি ঝুঁকি তৈরি হয়।
অভিজ্ঞ সার্ভেয়ারের পর্যবেক্ষণ
সঠিক পরিমাপের জন্য সরকারি আমিন বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত সার্ভেয়ারের সহায়তা নেওয়া উচিত। স্কেল ও নকশা নিখুঁতভাবে মিলিয়ে জমি মেপে তার একটি অফিসিয়াল পরিমাপ প্রতিবেদন (সার্ভে রিপোর্ট) সংগ্রহ করতে হবে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিসে আবেদন
সরেজমিনে জমি কম পাওয়া গেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিসে রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করতে হবে। নতুন সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী এ ধরনের ভুল সংশোধনের ক্ষমতা এসিল্যান্ডের রয়েছে। আবেদনপত্রের সঙ্গে মূল দলিল, সকল পর্চা, স্কেলযুক্ত ম্যাপ এবং সার্ভেয়ারের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
দেওয়ানি আদালতে মামলা ও দখল পুনরুদ্ধার
জমি অন্য কারো দখলে থাকলে অথবা প্রশাসনিকভাবে সমাধান না হলে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) রসিদ, জমি রেজিস্ট্রি নথি, সীমানা নকশা ও স্থানীয় সাক্ষীদের তথ্য যুক্ত করতে হবে। আদালত সঠিক কাগজপত্র ও নির্ভুল স্কেলমাপ বিবেচনা করে প্রকৃত মালিকের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন।
জমি কেবল একটি সাধারণ ভূখণ্ড নয়; এটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু নথিপত্রে সামান্য ভুল বা গরমিল থাকলে যেকোনো মুহূর্তে নিজের কষ্টার্জিত জমি হাতছাড়া হতে পারে। তাই ভূমির মালিকদের উচিত সময় থাকতেই সব কাগজপত্র যাচাই করে আইনি ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিজ সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।