জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে উদ্ধারের আইনি উপায়

বহু বছর ধরে নিজস্ব জমি ভোগদখল করে আসার পরও অনেক সময় অসাবধানতাবশত জরিপের সময় তা ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে যায়। মূলত জমি অনাবাদি থাকলে, ওয়ারিশরা সময়মতো নামজারি না করলে, জরিপের সময় দখলদার অনুপস্থিত থাকলে কিংবা ভুল তথ্য প্রদান করা হলে জমি খাস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

খাস জমি উদ্ধারের আইনি উপায় নিয়ে ‘রেকর্ড সংশোধন মামলা ও খতিয়ানে ভুল সংশোধন পদ্ধতি’ শীর্ষক বইতে উল্লেখ করেছেন সাইফুল ইসলাম ফকির। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৭১ থেকে ১৭৩ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখক এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
বইটিতে লেখক কয়েকটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—
ভুল সংশোধন আবেদন
জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে শুরুতেই মামলা না করে এসিল্যান্ড অফিসে ভুল সংশোধনের আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ। আবেদনপত্রের বিষয় হতে হবে ‘বিএস বা আরএস রেকর্ডে খাস খতিয়ান সংশোধন করে পূর্ববর্তী সিএস বা এসএ মালিকানা অনুযায়ী নাম অন্তর্ভুক্তি’।
এজন্য প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হবে। আবেদনের সঙ্গে সিএস/এসএ খতিয়ান, রেজিস্ট্রেশন/হেবানামা/ওয়ারিশান দলিল, খাজনার রসিদ, জমিতে দখলের প্রমাণ (ঘরবাড়ি, গাছপালা বা ফসলের ছবি), প্রতিবেশীর সাক্ষ্য ও ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়রের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে।
আইনি পদক্ষেপ ও ডিক্লারেটরি মোকদ্দমা
এসিল্যান্ড অফিস থেকে রেকর্ড সংশোধন করা না হলে পরবর্তী ধাপ হলো দেওয়ানি আদালতে ডিক্লারেটরি (ঘোষণামূলক) মোকদ্দমা করা। মামলার রায় পক্ষে আসলে রায়ের আলোকেই জমি আবার নিজ নামে রেকর্ডভুক্ত করা যায়। এছাড়া বেআইনিভাবে দখলচ্যুত হলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করা সম্ভব। তবে ৯ ধারায় প্রতিকার পেতে হলে দখলচ্যুত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে মামলা করতে হয়।

আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে যে সব ঝুঁকি থাকে
সরকারের বিরুদ্ধে স্বত্ব ঘোষণার মামলা অত্যন্ত জটিল। শুধু দখল থাকলেই সরকারের বিরুদ্ধে মালিকানা প্রমাণ করা কঠিন, এর জন্য দলিলের ধারাবাহিকতা (সিএস থেকে শুরু করে পরবর্তী হস্তান্তর দলিল) থাকা জরুরি। এছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে ‘বিরুদ্ধ দখল’ দাবি করতে হলে অন্তত ৬০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন দখলের প্রমাণ দিতে হয়।
বন্দোবস্ত বা লিজ নেয়ার বিষয়ে সতর্কতা
অনেক সময় মামলা না করে কালেক্টর বা ডিসির কাছে খাস জমি বন্দোবস্ত চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এতে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। বন্দোবস্তের আবেদন করার অর্থ হলো আইনিভাবে জমিটিকে সরকারের বলে স্বীকার করে নেওয়া। পরবর্তীতে বন্দোবস্ত না পেলেও আদালতে আর ওই জমির মালিকানা দাবি করা যায় না। তাছাড়া কৃষি খাস জমি কেবল ‘ভূমিহীন’ কৃষকদের মাঝেই বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এসব ক্ষেত্রে লেখকের পরামর্শ
কোনো কারণ ছাড়া বা সরকারি কোনো চাপ না থাকলে স্বপ্রণোদিত হয়ে হুট করে আবেদন না করাই ভালো, এতে প্রশাসন জবরদখল মনে করে উচ্ছেদ নোটিশ দিতে পারে। জেলা রেকর্ড রুম বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পুরোনো দলিল (যেমন— সিএস রেকর্ডের পত্তন দলিল) ভালোভাবে খুঁজে বের করে প্রস্তুতি নিয়ে এগোনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
লেখকের পরিচয়
সাইফুল ইসলাম ফকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি এলএলবি ও এলএলএম পাস করেন।


