logo
Advertisement

জমির দলিল কোথায় রেজিস্ট্রেশন করবেন, জেনে নিন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমির দলিল কোথায় রেজিস্ট্রেশন করবেন, জেনে নিন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
জমির প্রতীকী ছবি।

জমি কেনাবেচা, বন্ধক কিংবা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল রেজিস্ট্রেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু অনেকেরই প্রশ্ন—জমির দলিল কোন অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হয়, যেকোনো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল করা যায় কি না, অফিসের বাইরে দলিল রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ আছে কি না, কিংবা বিদেশে সম্পাদিত দলিল দেশে কীভাবে নিবন্ধন করতে হয়। এসব বিষয়ে প্রচলিত নিয়ম ও প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরা হলো।

Advertisement

জমি ক্রয়ের দলিল কোথায় রেজিস্ট্রেশন করা হয়

যে অফিসে জমি ক্রয়ের দলিল অথবা অন্যান্য ধরনের দলিল রেজিস্ট্রেশন হয়, সেই অফিসকে সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিস বলা হয়। যে অফিসে দলিল রেজিস্ট্রেশন হয় সে অফিসের নাম সাব রেজিস্ট্রি অফিস না হয়ে রেজিস্ট্রি অফিস হওয়াই সঙ্গত হতো। সাব রেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান কর্মকর্তার পদবী সাব-রেজিস্ট্রার। রেজিস্ট্রার শব্দ নয়। এ কারণেই হয়ত এই রেজিস্ট্রেশন অফিসকে সাব রেজিস্ট্রি অফিস বলা হয়।

রেজিস্ট্রার পদবী অন্যান্য বিভাগেও আছে। যেমন সমবায় বিভাগের প্রধান কর্মকর্তার পদবী রেজিস্ট্রার। বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান কর্মকর্তার পদবী রেজিস্ট্রার, ইত্যাদি। রেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান কর্মকর্তার পদবী রেজিস্ট্রার করা হলে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ত হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাব রেজিস্ট্রি অফিসকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে রেজিস্ট্রেশন অফিস এবং সাব-রেজিস্ট্রারের পদবীকে রেজিস্ট্রারের পদে উন্নতি করা উচিত।

বহু দফতরে শুধুই কর্মকর্তাদের উন্নতি নয়, অফিসের পদবীরও উন্নতি হয়। অতীতে ডাইরেক্টরেট এর প্রধান কর্মকর্তার পদবী ছিল ডাইরেক্টর। এখন প্রায় সব ডাইরেক্টরেট এর প্রধান কর্মকর্তার পদবী হয়েছে সেক্রেটারী জেনারেল। কোথাও কোথাও সেক্রেটারির পদবী হয়েছে সেক্রেটারি জেনারেল অথবা জেনারেল সেক্রেটারী। তেমনি সাব-রেজিস্ট্রারের পদবী রেজিস্ট্রারের পদে উন্নীত হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা প্রয়োজন।

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রেজিস্ট্রির জন্য প্রণীত দলিলের তপশিলে অন্তর্ভুক্ত জমি যদি একাধিক সাব রেজিস্ট্রারের এলাকা হয়, তবে যে সাব রেজিস্ট্রারের এলাকায় বেশি ভাগ সম্পত্তি অবস্থিত সে এলাকার সাব রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি করা যাবে।

সাবরেজিস্ট্রি অফিসের বাইরে রেজিস্ট্রেশন

যে কোনো অফিস, বাসস্থান, কর্মস্থলের ঠিকানায় দলিল রেজিস্ট্রি করা যায়, যদি যথাযথ কারণ দেখিয়ে সাব-রেজিস্ট্রারের নিকট আবেদন করা যায় এবং তা গৃহীত হয়।

বাংলাদেশের বাইরে যে দলিল স্বাক্ষরিত বা সম্পাদিত হয়েছে, ঐ দলিল বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিক বা নিকটস্থ রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। তবে দলিলদাতা বাংলাদেশে পৌঁছার চার মাসের মধ্যেই পুনরায় রেজিস্ট্রি করতে হবে।

জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প কী

মামলা মোকদ্দমার রায়ের কপি এবং নিলাম সংক্রান্ত আদেশ নামাকে স্ট্যাম্প ফরম এর মাধ্যমে প্রদান করা হয়ে থাকে—এ স্ট্যাম্পকে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বলা হয়।

নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প-ফরম এর মাধ্যমে জমি হস্তান্তর করা হয়। জমির হস্তান্তর সংক্রান্ত তথ্যাদি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প-এর গায়ে বিশেষভাবে লিখতে হয়।

নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রয় সরকারের আয়ের একটি উৎস। ১৮৯৯ সালে স্ট্যাম্প আইন অনুযায়ী জমি ক্রয়-বিক্রয়ের রেজিস্ট্রেশনের জন্য জমির মূল্যের ওপর ১০% মূল্যের স্ট্যাম্প ক্রয় করতে হয়। যেহেতু স্ট্যাম্প ক্রয় করা আইনগত বিধান, তাই স্ট্যাম্প ক্রয় করতে হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এখন জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর বহু ধরনের ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ২৫% এর বেশি। এত বিরাট মূল্যের স্ট্যাম্প ক্রয় করতে হলে স্ট্যাম্প এর কাগজের পৃষ্ঠা অনেক বেশি হয়ে যায়। বর্তমানে ১২০০ টাকার স্ট্যাম্প ক্রয় করতে হয়। স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।

নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ছাড়া কি জমি রেজিস্ট্রেশন সম্ভব

১৯৮০ সালে ব্যাপকভাবে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প জালিয়াতি শুরু হয়। তখন সরকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ছাড়াই জমির সাফ কবালা রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি দিয়েছিলেন। পরে এই জালের প্রবণতা বন্ধের পর রেফ কাগজের পরিবর্তে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এর মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক করা হয়।

রেফ কাগজ কী

যখন নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ছাড়াই দলিল রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি এক সময় দেয়া হয়েছিল তখন যে কাগজে জমি হস্তান্তর লেখার অনুমতি ছিল সে ধরনের কাগজকে বলা হয় রেফ কাগজ। রেফ কাগজ বিশেষ পদ্ধতিতে প্রস্তুত অপেক্ষাকৃত মোটা কাগজ।

ঐ সময়ে নিবন্ধনের জন্য যে পরিমাণ অর্থের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক ছিল, সে পরিমাণ টাকা সোনালী ব্যাংকের যে কোনো শাখায় জমা দেয়ার পর দলিল নিবন্ধন করা হতো।

রেফ ফরমে লেখা দলিল ভুয়া কি না, কীভাবে যাচাই করবেন

রেফ ফরমের উপরে লিখিত দলিলের সঠিকতা যাচাই এর জন্য সোনালী ব্যাংকে গৃহীত টাকার চালান নং-ও জমার তারিখ যা দলিলের ডান পাশে উপরের কোণে লিখিত আছে—তা পরীক্ষা করে সঠিকতা যাচাই করা যাবে।

১৯৮০-এর দশকে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যাপকভাবে জাল হওয়ার প্রেক্ষাপটে রেফ কাগজের উপরে ক্রয়-বিক্রয় দলিলের তথ্যাদি লিখে দলিলের রেজিস্ট্রেশন হতো।

প্রথম পৃষ্ঠার উপরের অংশে ডান দিকে লাল কালি দিয়ে কত টাকা মূল্যের স্ট্যাম্প ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে তা লিখে সীলসহ দস্তখত দিতেন একজন কর্মকর্তা। অনেকে মনে করেন এই দলিলগুলো ভুয়া। প্রকৃতপক্ষে এগুলো ভুয়া নয়।


লেখকের পরিচয়

এ জেড এম শামসুল আলম

সাবেক চেয়ারম্যান, অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লি.

সাবেক মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

চেয়ারম্যান, আবুজর গিফারী সোসাইটি