জমি-জমার জাল দলিল শনাক্ত করার নিয়ম
-6c3bab-720x405.webp)
বাংলাদেশে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে সঠিক সতর্কতা না অবলম্বন করলে পরবর্তীতে বছরের পর বছর নানা আইনি জটিলতায় ভুগতে হয়। ভুয়া দলিল চিনতে না পেরে হাজারো মানুষ আদালত ও ভূমি অফিসে ঘুরতে ঘুরতে চরম ভোগান্তির শিকার হন। বিশেষ করে ২০০৫ সালের ১ জুলাইয়ের আগে রেজিস্ট্রিকৃত জমি নিয়ে জাল দলিলের বিরোধ বেশি দেখা যায়।
অসৎ কর্মচারী ও অসাধু দলিল লেখকের যোগসাজশে কাউকে ভুয়া মালিক বানিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করা, আদালতের বন্টননামা ছাড়াই এজমালি সম্পত্তি বোনদের বঞ্চিত করে নিজেদের নামে নেওয়া কিংবা মৃত বা প্রবাসীদের জমি জালিয়াতি করে হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এছাড়া ঘষামাজা, ওভাররাইটিং বা মূল তারিখ ঠিক রেখে ভিতরের তথ্য বদলে ফেলা—এমন নানা উপায়েও দলিল জাল করা হয়। তাই জমি কেনার আগেই জাল দলিল চেনার উপায়গুলো জেনে নেওয়া জরুরি।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৫৯ ও ১৬০ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমি-জমার জাল দলিল সনাক্তকরণ করবেন কিভাবে?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
জাল দলিল শনাক্তের সহজ ৯ উপায়
ভলিউমের তথ্য যাচাই: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রক্ষিত আসল দলিলের ভলিউমের সঙ্গে আপনার সন্দেহজনক দলিলের সাল মিলিয়ে দেখুন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের প্রকৃতি অনুযায়ী মোট চারটি ভলিউমে তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতার কাছ থেকে সব বায়া দলিল (পিঠ দলিল) চেয়ে নিন এবং কার্যালয় থেকে ক্রমিক নম্বর ও দলিল নম্বর মিলিয়ে দেখুন।
স্বাক্ষর পরীক্ষা: অনেকে কুচক্রী মহলের সহায়তায় অন্যের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বিক্রেতা বা গ্রহীতার ছদ্মবেশ ধরে। এমন সন্দেহ হলে হস্তরেখা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে স্বাক্ষর পরীক্ষা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ভূমি অফিসের সিলসমূহ পরীক্ষা করেও জালিয়াতি ধরা যায়।
সিল ও তারিখ পরীক্ষা: যেকোনো পুরাতন দলিলে পুরোনো ধাঁচের সিলই থাকার কথা। তবে পুরোনো দলিলে যদি নতুন সিল দৃশ্যমান হয়, তবে তা জাল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া দলিল রেজিস্ট্রি করার দিনটি কোনো সরকারি ছুটির দিন ছিল কি না, তা যাচাই করাও একটি অন্যতম বড় উপায়।
এক জমির একাধিক মালিক: একই জমির বিপরীতে একাধিক ব্যক্তি মালিকানা দাবি করলে ধরে নিতে হবে দলিলটিতে জালিয়াতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে মূল মালিক নির্ধারণের চেষ্টা করুন।

নামজারি বা মিউটেশন যাচাই: সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে নামজারির তথ্য সংগ্রহ করুন। সিএস জরিপের সঙ্গে বিক্রেতার খতিয়ানের ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রতিবার বিক্রয়ের সময় জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর ও ঠিকানার সঙ্গে মূল খতিয়ানের মিল আছে কি না তা পরখ করুন।
আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি): সাম্প্রতিক সময়ের কোনো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল হলে তাতে উভয় পক্ষের ছবি যুক্ত আছে কি না এবং এটি যথাযথভাবে রেজিস্ট্রিকৃত কি না তা পরীক্ষা করে নিন।
দান করা জমির দলিল যাচাই: জমিটি দানসূত্রে পাওয়া হলে দেখতে হবে দলিল সম্পাদনের কতদিন পর দানগ্রহীতা দখল লাভ করেছেন। দলিলটি আসল কি না এবং দলিলদাতার সঙ্গে গ্রহীতার আইনি সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি এটি পেতে পারেন কি না তা নিশ্চিত হোন।
দলিল লেখক যাচাই: দলিল সম্পর্কিত তথ্যে ধোঁয়াশা মনে হলে দলিলের গায়ে উল্লিখিত দলিল লেখকের নাম ও ঠিকানা খুঁজে বের করে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন।
স্ট্যাম্প ও ভেন্ডার তথ্য: দলিল তৈরিতে ব্যবহৃত স্ট্যাম্পের পেছনের অংশে কোন ভেন্ডার থেকে এবং কার নামে স্ট্যাম্প কেনা হয়েছিল তা লেখা থাকে। প্রতিটি স্ট্যাম্পের ক্রমিক নম্বর ঠিক আছে কি না নিশ্চিত হতে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট স্ট্যাম্প বিক্রেতার সঙ্গে দেখা করুন।

জমি কেনা শুধু অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নয়, এটি একটি জীবনের বড় সিদ্ধান্ত। জাল দলিলে হাত দিয়ে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ও শান্তি বিসর্জন না দিয়ে, সামান্য সচেতনতা ও সঠিক তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন। ক্রয়ের পূর্বেই রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিস থেকে নথি যাচাই করে নেওয়ার চর্চাই পারে আপনাকে যেকোনো জালিয়াতি ও ভবিষ্যৎ মামলা-মোকদ্দমা থেকে দূরে রাখতে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


