logo
Advertisement

নতুন চর থেকে পরিত্যক্ত জমি, কোনগুলো সরকারি খাস জমি?

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
নতুন চর থেকে পরিত্যক্ত জমি, কোনগুলো সরকারি খাস জমি?
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর এক সময়ের প্রমত্তা ধরলা নদী এখন মৃতপ্রায়। ছবি: যুগান্তর

জমি নিয়ে নানা ধরনের মালিকানা ও আইনি জটিলতার মধ্যে ‘খাস জমি’ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারের মালিকানাধীন সব জমিই কি খাস? কোন কোন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি সরকারি খাস জমিতে পরিণত হয়? নতুন চর, পরিত্যক্ত বা অনাবাদী জমির ক্ষেত্রেই বা কী নিয়ম? আবার খাস জমি কি কেনা বা জামানত হিসেবে দেওয়া যায়?

Advertisement

জমি কেনাবেচা বা মালিকানা যাচাইয়ের আগে এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। তাই খাস জমি কী, কীভাবে জমি খাস হয় এবং খাস জমি নিয়ে আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো জেনে নেওয়া যাক। জমির মালিকানা, খাজনা, খতিয়ান, পর্চা, নামজারির বিষয় নিয়ে ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম।

খাস জমি কি?

সরকারের মালিকানায় এবং সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রক্ষিত ভূ-সম্পত্তির বলা হয় খাস জমি বা খাস সম্পত্তি। যে জমি সরকার কেন প্রজাকে পত্তনী বা বন্দোবস্ত দেয়নি- ঐ জমি হলো খাস জমি। জমির মালিকানা সাধারণত সরকারের, তা সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাস বা নিজস্ব এবং তা সরকারি জমি বা খাস জমি। যে জমির স্বত্ব বা মালিকানা কালেক্টরের, তা খাস জমি।

কোন মৌজার এক নাম্বার খতিয়ানে বা রেজিস্টারে এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আট নাম্বার রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত জমি হলো খাস জমি।

নামজারির প্রয়োজনীয়তা কখন শেষ হয়ে যায়?

নামজারির প্রয়োজন না থাকলেই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়। প্রয়োজন হয় জমি-জমা বিক্রয়, দান, অনুদান বা হস্তান্তর এর মাধ্যমে অথবা মালিকের মৃত্যু বা দেশ ত্যাগের পর উত্তরাধিকারীর মধ্যে বণ্টনের প্রয়োজনে।

জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরকারের মালিকানাভুক্ত সকল জমি কি খাস জমি?

সরকারের মালিকানাভুক্ত সকল জমি খাস জমি নয়। সকল মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন সকল জমি খাস জমি নয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমি হলো খাস জমি। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মালিকাধীন জমি সরকারি জমি। কিন্তু তা সংজ্ঞানুসারে খাস জমি হিসেবে গণ্য নয়।

যে জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন সরকারের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত, তাই হলো সরকারের খাস জমি। যে জমিতে দেশের জনগণের নিজস্ব মালিকানাধীন ভোগদখলকৃত, তা খাস জমি নয়। সরকারি খাস জমিতে সরকারের অফিস, আদালত, প্রতিষ্ঠান, কারখানা, ইত্যাদি অবস্থিত।

এক অর্থে একটি দেশের সকল জমির মালিকই সরকার। এজন্য সরকার পূর্বের মালিক হিসেবে প্রজাদের থেকে খাজনা বা রাজস্ব বা কর আদায় করত। বর্তমানে একই খাতে বা একই সূত্র হতে যে অর্থ আদায় করা হয়, তাকে তৃপ্তিকর ভাষায় বলা হয় ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ এবং সরকারের প্রজাদেরকে বলা হয় মালিক। বহু কারণে ও পদ্ধতিতে দেশের জনগণের জমিও খাস জমিতে পরিণত হয়।

যেসব কারণে জনগণের বা সংস্থার জমি খাস হয়?

অনেক পদ্ধতিতে এবং কারণে দেশের বা জনগণের জমির মালিক হয় সরকার। নিম্নে প্রায় এক ডজন পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো-

খাস জমি কেনা বা ঋণ বা বিনিয়োগের জন্য জামানত দেওয়া যায়?

সরকার নিলামে বিক্রয় করলে ক্রয় করা যায়, কিন্তু বিনিয়োগ সুবিধার জন্যে জামানত দেওয়া যায় না।

পরিত্যক্ত জমি কি খাস জমি?

কোন ভূমির মালিক বাড়ি ঘর, বাড়ি ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন। তিনি তিন বছর যাবত জমি অনাবাদী রেখেছেন এবং খাজনাও দেননি। ঐ জমি খাস জমি হিসেবে গণ্য হবে।

অনাবাদী জমি কি?

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির মালিক যদি ৫ বছর পর্যন্ত তা চাষাবাদ না করেন, তা অনাবাদী জমি হিসেবে গণ্য হবে এবং ঐ জমি সরকারি খাস জমির অন্তর্ভুক্ত হবে।

ভূমি কর পরিশোধ না করলে কি অসুবিধা?

ভূমি কর পরিশোধ না করা হলে সার্টিফিকেট কেস হয়। এরূপ কেসে সরকার জমি ক্রয় করে নিতে পারেন অথবা অন্যের নিকট নিলামে বিক্রয় করতে পারেন।

বাজেয়াপ্ত জমি সম্পত্তি (Escheats Property) কি?

যে জমি অথবা সম্পত্তির মালিক বা দাবিদার নেই, তা সরকারের বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। এরূপ সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বলা হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৪। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৪। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিধি বহির্ভূত প্রজাপত্তনীর পরিণতি কি?

প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৩(১) ধারা লঙ্ঘন করে কেউ প্রজাপত্তনী দিলে ঐ জমি খাস জমি হিসেবে গণ্য হবে।

সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা জমির ধরণ কি?

জনস্বার্থে সরকার কর্তৃক ব্যক্তি মালিকানাধীন কোন জমি অধিগ্রহণ করা হলে তা খাস জমি হিসেবে গণ্য হবে।

উত্তরাধিকারবিহীন ব্যক্তির জমি কি?

কেউ কেউ নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য সূত্রে বিস্তর জমি সম্পতি মালিক হন। তিনি উত্তরাধিকারী না রেখে মৃত্যুবরণ করলেন। জীবদ্দশায় কাউকে দানের উইল করে যাননি। তার মৃত্যুর পরে এ সম্পত্তি খাস জমি হিসেবে গণ্য হবে। (প্রজাস্বত্ব আইন ৯২ ধারা)

সিলিং বহির্ভূত উত্তরাধিকার সূত্রের জমি কি?

পিতামাতা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের ইন্তেকাল হলে মরহুম থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমি সরকার নির্ধারিত সিলিং-এর ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এই জমিও সরকারি খাস জমি হয়ে যাবে।

ঊর্ধ্বসীমা বা সিলিং বহির্ভুত জমি কি?

একজন কোন প্রকারের কতটুকু জমির মালিক হতে পারে তা সরকারি আইন এবং বিধি-বিধান মতে নির্ধারিত হয়। কোন নাগরিকের সরকার নির্ধারিত জমির মালিকানার ঊর্ধ্বসীমা বা সিলিং এর বেশি মালিক হয়ে গেলে সিলিং এর অতিরিক্ত জমি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে (প্রজাস্বত্ব আইন ৯০ ধারা)।

এক জমির নামে কৃষি জমির সিলিং হলো ৬০ বিঘা। রাবার চাষ, চা বাগানের জন্যে ৯৯ বছরের লীজ পাওয়া যায়। লীজ হিসেবে গ্রহণকৃত জমি লীজ দাতার অনুমতি ভিন্ন হস্তান্তর করা যায় না।

নতুন চরের জমি কি খাস জমি?

নদী বা সাগরের মধ্যে নতুন চর সৃষ্টি হলে তা খাস জমি হিসেবে গণ্য হয়। (প্রজাস্বত্ব আইন ৮৭ ধারা)

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৩। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৩৩। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পয়স্তি জমি কি?

নদীর তীরে বা সাগরে ভাঙ্গনের ফলে অন্তত ৩০ বছর বা তার পরে পয়স্তি হলে তা হবে খাস জমি (প্রজাস্বত্ব আইন ধারা ৮৬)। কিন্তু প্রাইভেট জমি সিকস্তি হলে ঐ জায়গা ৩০ বছরের কম সময়ে পয়স্তি হলে প্রাক্তন মালিকের মালিকানাধীন হবে।

স্বস্থানে পয়স্তি (Reformation in Situ) কি?

নদীর পাড় কখনও কখনও ভেঙ্গে নদীর সাথে মিশে যায়। পরে এই ভেঙ্গে চলে যাওয়া স্থানেই (Situation) মাটি জমে চর পড়ে। নদীর যে স্থানে ( Location or Situation) ভাঙ্গনের কারণে সিকস্তি হয়েছে, ঐ একই স্থানে যদি বালি জমে চর সৃষ্টিগত কারণে পয়স্তি হয়, ঐ পয়স্তিকে স্বস্থানে পয়স্তি (Reformation in Situation) বলা হয়।

নিজস্ব জায়গায় জমির মালিক হাট বা বাজার স্থাপন করেছেন। এই জমি ক্রয় করা বা জামানত গ্রহণ করা যাবে কি?

না! শহর বা গ্রামে কোন জমিতে প্রাইভেট মালিকানাধীন হাট অথবা বাজার স্থাপনা করতে হলে কালেক্টর-এর নিকট হতে হাট ও বাজার স্থাপনের লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। বিনা লাইসেন্সে হাট ও বাজার স্থাপন করা হলে কালেক্টর উক্ত হাট অথবা বাজার এর জমি এবং অন্যান্য স্বার্থ বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। (হাট বাজার অধ্যাদেশ ১৯৫৯ ধারা ২) (প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫১ ধারা ২৯ (১) (B)


লেখকের পরিচিতি

এ জেড এম শামসুল আলম অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। এ ছাড়াও তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মহাপরিচালক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আবুজর গিফারী সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত।