logo
Advertisement

জমির মূল খতিয়ান ও সার্টিফাইড কপি পাওয়ার নিয়ম জানুন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমির মূল খতিয়ান ও সার্টিফাইড কপি পাওয়ার নিয়ম জানুন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

জমির মালিকানা প্রমাণ, হস্তান্তর কিংবা যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ায় ‘খতিয়ান’ একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিন্তু অনেক সময় প্রয়োজন অনুযায়ী খতিয়ানের মূল কপি বা জাবেদা নকল (Certified Copy) সংগ্রহ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানাবিধ ভোগান্তি ও অজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। কোন অফিস থেকে খতিয়ান সরবরাহ করা হয়, আবেদনের নিয়ম কী এবং আইনি মানদণ্ডে কোন কপির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু তা জানা থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই সুবিধা হয়।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ে ‘কোনো জমির মূল খতিয়ান ও খতিয়ানের নকল কিভাবে পাবেন’ (পৃষ্ঠা নম্বর ২৩৮) শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

মূল খতিয়ান

মূল খতিয়ান হলো ভূমি জরিপ বা নামজারির পর সরকার কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রথম ও অফিশিয়াল মালিকানার রেকর্ড। এতে জমির মূল মালিকের নাম, দাগ নম্বর, মৌজা, খতিয়ান নম্বর, জমির শ্রেণি, পরিমাণ এবং খাজনার বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত থাকে। জরিপ শেষে সরকার এই ১ নম্বর রেজিস্টার বা মূল খতিয়ান সংরক্ষণ করে, যা জমির স্বত্ব ও সত্যতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়।

নকল খতিয়ান

নকল খতিয়ান (বা সার্টিফাইড কপি) হলো সরকারি রেকর্ড রুমে রক্ষিত মূল খতিয়ানের একটি অফিশিয়াল ও সার্টিফাইড অনুলিপি। মূল খতিয়ান সাধারণ মানুষের হাতে দেওয়া হয় না বলে জমি বেচাকেনা, নামজারি, কিংবা দেওয়ানি আদালতে মামলা-মোকদ্দমার কাজে ব্যবহারের জন্য জেলা রেকর্ড রুম বা সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিস হতে নির্দিষ্ট কোর্ট ফি দিয়ে এই নকল সংগ্রহ করতে হয়। এটি আইনিভাবে মূল খতিয়ানের সমতুল্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

খতিয়ানের কপি পাওয়ার প্রাপ্তিস্থান ও আইনি বাধ্যবাধকতা

খতিয়ান বা খতিয়ানের নকল পাওয়ার জন্য নিজ নিজ জেলার ‘রেকর্ড রুমের’ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট দরখাস্ত করতে হয়। সাধারণত জরিপের সময় খতিয়ান ১ নম্বর রেজিস্টার আকারে বাঁধাই করা হয় এবং বিক্রি খতিয়ান হিসেবে ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত কপি রেকর্ড রুমে পাঠানো হয়। তবে জরিপের অনেক দিন পার হয়ে গেলে তা কেনাবেচার জন্য আর সচরাচর পাওয়া যায় না; সে ক্ষেত্রে রেকর্ড রুম থেকে সার্টিফাইড কপি বা নকল সংগ্রহ করতে হয়।

নামজারি বা মিউটেশন খতিয়ান: এটি দেওয়ার এখতিয়ার কেবল সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসের। তহসিল অফিস বা উপজেলা ভূমি অফিসে রেকর্ড থাকলেও সেখান থেকে সরাসরি নকল দেওয়ার আইনি ক্ষমতা নেই।

রেকর্ড রুমে কপি না থাকলে: কাঙ্ক্ষিত খতিয়ান জেলা রেকর্ড রুমে না থাকলে, আবেদনের ভিত্তিতে তহসিল বা উপজেলা ভূমি অফিস থেকে খসড়া বা নথি চেয়ে পাঠিয়ে রেকর্ড রুম থেকে নকল তৈরি করে দেওয়া হয় (যদিও এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় বেশি লাগে)।

আদালতে গ্রহণযোগ্যতা: সম্প্রতি উপজেলা ভূমি অফিস থেকেও সরাসরি নকল দিতে দেখা যায়, তবে দেওয়ানি আদালতে এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আইনি বা আদালতের কাজের জন্য জেলা রেকর্ড রুম থেকেই প্রত্যায়িত নকল সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আবেদনের নিয়ম, ফি ও নির্ধারিত সময়

খতিয়ানের নকল তোলার জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে দরখাস্ত জমা দিতে হয়-

আবেদনের সীমা: একটি দরখাস্তে একের অধিক মৌজা বা একের অধিক জরিপের নকল চাওয়া যাবে না। এছাড়া একটি আবেদনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪টি খতিয়ানের নকল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সাধারণ আবেদন: সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে ৫ টাকার কোর্ট ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নকল দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে।

জরুরি আবেদন: দ্রুত পেতে হলে ১০ টাকার কোর্ট ফি দিয়ে জরুরি আবেদন করতে হয়, যার আইনি সময়সীমা ২৪ ঘণ্টা।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের ভূমিকা

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ দপ্তরে আর.এস এবং এস.এ খতিয়ান সুরক্ষিত রাখা হয়। এই অধিদপ্তর থেকে খতিয়ান তৈরির চূড়ান্ত প্রকাশনা পর্যায়ের সময়কাল থেকে প্রায় দুই মাস পর্যন্ত সরাসরি খতিয়ানের নকল সংগ্রহ করা যায়।

জমির সঠিক মালিকানা বজায় রাখতে এবং যেকোনো আইনি জটিলতা এড়াতে সঠিক স্থান থেকে অনুমোদিত খতিয়ানের কপি সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি। উপজেলা ভূমি অফিস থেকে অনানুষ্ঠানিক কপি সংগ্রহ না করে আদালতের গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থে জেলা রেকর্ড রুম থেকেই নির্ধারিত ফি দিয়ে সার্টিফাইড কপি তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।