জমি-জমার খতিয়ান, মৌজা ও পর্চা চেনার উপায়

জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়া কিংবা পুরোনো জমির মালিকানা যাচাই করতে গেলেই সামনে আসে খতিয়ান, দাগ, মৌজা, প্লট ও পর্চার মতো নানা শব্দ। জমির কাগজপত্রে এসব তথ্য নিয়মিত দেখা গেলেও কোনটি কী, কোন খতিয়ানে কী ধরনের তথ্য থাকে এবং এক খতিয়ানের সঙ্গে অন্য খতিয়ানের পার্থক্য কোথায়, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে পুরোনো জমির কাগজপত্র হাতে নিয়ে অনেকেই বুঝতে পারেন না সেটি সি.এস, এস.এ, আর.এস নাকি মিউটেশন খতিয়ান।
জমির মালিকানা ও পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে খতিয়ানের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে জমির মালিকানা, দখল, প্লটের অবস্থান ও জমির পরিমাণে পরিবর্তন এসেছে। কখনো জমি বিক্রি হয়েছে, কখনো দান, হেবা বা অধিগ্রহণের মাধ্যমে মালিকানা বদলেছে। আবার মালিকের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যেও মালিকানা পরিবর্তিত হয়েছে। এসব পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন সময়ে নতুন করে জরিপ ও খতিয়ান তৈরির প্রয়োজন হয়েছে। ফলে একই জমির ক্ষেত্রে ভিন্ন সময়ে তৈরি একাধিক খতিয়ানও দেখা যেতে পারে।
জমির নথি বুঝতে হলে তাই শুধু মালিকের নাম জানলেই হয় না। কোন মৌজায় জমিটি অবস্থিত, তার দাগ বা প্লট নম্বর কী, কোন জরিপে সেটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে মালিকানা ও জমির পরিমাণ কীভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেসব তথ্যও জানা প্রয়োজন। আবার পুরোনো খতিয়ানের নকল কোথা থেকে পাওয়া যায় এবং এর জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয়, সেটিও জমির মালিক বা ক্রেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে সব খতিয়ানের ইতিহাস ও ধরন এক নয়। সি.এস খতিয়ানের সঙ্গে এস.এ খতিয়ানের পার্থক্য যেমন রয়েছে, তেমনি আর.এস খতিয়ানও পরবর্তী সময়ের জমির পরিবর্তিত মালিকানা ও প্লটের তথ্য তুলে ধরে। অন্যদিকে, জরিপের মধ্যবর্তী সময়ে মালিকানা পরিবর্তন হলে তা নথিতে প্রতিফলিত করতে মিউটেশন খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই জমির কাগজপত্র বুঝতে হলে খতিয়ানের ধরন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা জরুরি।
খতিয়ান কী, মৌজা ও প্লট কীভাবে চেনা যায়, একটি খতিয়ানে সাধারণত কী কী তথ্য থাকে, সি.এস, এস.এ ও আর.এস খতিয়ানের পার্থক্য কী এবং এসব খতিয়ানের নকল কোথা থেকে পাওয়া যায়, এসব বিষয় সহজভাবে জানা যাক।
খতিয়ান কী
খতিয়ান হলো জমির পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি স্বত্বলিপি, রেকর্ড অব রাইটস ও পর্চা নামেও পরিচিত। জমির মালিকানা নির্ধারণ, জমির পরিচিতি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়সহ জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণে খতিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে খতিয়ান তৈরি করা হয়। জরিপের সময় একটি উপজেলার জমিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে জরিপ করা হয়। এসব ছোট অংশকে বলা হয় মৌজা। প্রতিটি মৌজাকে একটি নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, যা মৌজা নম্বর নামে পরিচিত। এই নম্বরকে জে এল নম্বর বা জুরিসডিকশন লিস্ট নম্বরও বলা হয়।
এরপর মৌজাকে বিভিন্ন প্লটে ভাগ করে প্রতিটি প্লটের জন্য নম্বর দেওয়া হয়। সাধারণত মৌজার উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে প্লট নম্বর দেওয়া শুরু হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে গিয়ে শেষ হয়। কোনো মালিক বা মালিকানাগণের একাধিক প্লট থাকতে পারে। একটি সম্পূর্ণ বা আংশিক এক বা একাধিক প্লট নিয়ে একটি খতিয়ান খোলা হয়।
খতিয়ানে যেসব তথ্য থাকে
একটি খতিয়ানে কোনো মৌজার এক বা একাধিক দাগ, এক বা একাধিক জমির মালিকের নাম, পিতার নাম, জমির নাম ও ঠিকানা থাকতে পারে। এ ছাড়া প্রত্যেক মালিকের প্রাপ্য অংশ, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণি, পথাধিকার ও সুখাধিকার এবং ভূমি উন্নয়ন করের পরিমাণের মতো তথ্যও খতিয়ানে উল্লেখ থাকতে পারে।
তবে ১৯৭৬ সালে ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ জারি হওয়ার আগে খতিয়ানে লেখা ভূমি উন্নয়ন করের পরিমাণ ব্যবহার করা হতো। আইনটি জারি হওয়ার পর খতিয়ানে আর ভূমি উন্নয়ন করের পরিমাণ লেখা হয় না।
খতিয়ানের ধরন
খতিয়ান প্রধানত দুই ধরনের। এগুলো হলো জরিপ খতিয়ান ও মিউটেশন খতিয়ান।
জরিপ খতিয়ানকে আবার সিএস বা ডিএস, এমআরআর বা এসএ, বিএস, আরএস, পেটি ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয়। অন্যদিকে, মিউটেশনের মাধ্যমে যে খতিয়ান তৈরি করা হয়, তাকে মিউটেশন খতিয়ান বলা হয়।

জরিপের মাধ্যমে খতিয়ান তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে জমির মালিকানায় পরিবর্তন আসতে পারে। জমি বিক্রি, এওয়াজ-বদল, দান, হেবা, ওয়াকফ, দেবোত্তর, অধিগ্রহণ কিংবা মালিকের মৃত্যুর মতো কারণে মালিকানা পরিবর্তিত হয়। এসব পরিবর্তন খতিয়ানে প্রতিফলিত করতে মিউটেশন করা হয়। অর্থাৎ দুই জরিপের মধ্যবর্তী সময়ে মালিকানায় যে পরিবর্তন ঘটে, মিউটেশনের মাধ্যমে তার প্রতিফলন খতিয়ানে আনা হয়।
সি.এস খতিয়ান কীভাবে চেনা যায়
সি.এস খতিয়ান ১৮৮২ সালের বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্টের অধীনে তৈরি করা হয়। এর আগে পরিবারভিত্তিক লিখিত খতিয়ান ছিল না এবং সি.এস-এর মতো পরিকল্পিত জরিপও ছিল না। এ কারণে সি.এস জরিপকে এখনো সর্বাধিক সঠিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সি.এস খতিয়ানে তৌজি নম্বর ও জমিদারের নাম থাকত। একই সঙ্গে জমিদারের অধীনে রায়তের নাম, জমির পরিমাণ এবং খাজনার পরিমাণও উল্লেখ থাকত।
সি.এস খতিয়ান চেনার একটি উপায় হলো এর লেখার ধরন। এটি কাগজে লম্বালম্বিভাবে লেখা থাকে। অন্যদিকে এস.এ খতিয়ান আড়াআড়িভাবে লেখা হয়।
এস.এ খতিয়ানের ইতিহাস
১৯৫০ সালের আগে দেশের জমির মালিক ছিলেন জমিদাররা। কৃষকেরা জমিদারদের কাছ থেকে লিজের মতো করে জমি বন্দোবস্ত নিয়ে চাষাবাদ করতেন।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল হলে যারা জমি চাষ করতেন, তাদের জমির মালিকানা দেওয়া হয়। ফলে খতিয়ানে জমিদারের নামের পরিবর্তে প্রজা বা চাষির নাম লেখার প্রয়োজন দেখা দেয়।
এ জন্য স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০ নামে একটি আইন জারি করা হয়, যা এস.এ অ্যান্ড টি অ্যাক্ট নামে পরিচিত। এই আইনের আওতায় জমিদারের নাম পরিবর্তন করে প্রজা বা মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করে খতিয়ান তৈরি করা হয়। এই কাজ ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলতে থাকে।
আর.এস খতিয়ান কেন তৈরি করা হয়
সি.এস জরিপের পর অনেক বছর পার হয়ে যায়। এর মধ্যে জমির মালিকানা ও প্লটে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ফলে নতুন করে জরিপের প্রয়োজন দেখা দেয়।

এ কারণে ১৯৬৫ সাল থেকে ঢাকা ও রাজশাহী জেলায় আর.এস জরিপ শুরু করা হয়।
খতিয়ানের নকল কোথায় পাবেন
জমির খতিয়ানের নকল পেতে হলে নিজ নিজ জেলার রেকর্ড রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে দরখাস্ত করতে হয়। একটি দরখাস্তে চারটির বেশি খতিয়ানের নকল পাওয়া যায় না।
নকল পাওয়ার দরখাস্তের সঙ্গে ২০ টাকার কোর্ট ফি দিতে হয়। সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টা পর নকল পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় এর চেয়ে বেশি সময় লাগে।
জমির নথি বুঝতে খতিয়ান জানা জরুরি
জমির মালিকানা ও পরিচিতি বোঝার ক্ষেত্রে খতিয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। সময়ের সঙ্গে জমির মালিকানা ও দখলে পরিবর্তন আসায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের জরিপ ও খতিয়ান তৈরি হয়েছে। তাই কোনো জমি সম্পর্কে তথ্য জানতে হলে শুধু একটি নথির ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের ধরন, দাগ, মৌজা ও মালিকানার তথ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। জমি-সংক্রান্ত নথি বুঝতে পারলে মালিকানা যাচাই ও প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংগ্রহের কাজও তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।

