logo

খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার নিয়ম কী, জানুন আইনি প্রক্রিয়া

খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার নিয়ম কী, জানুন আইনি প্রক্রিয়া
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশের প্রান্তিক ও গৃহহীন মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারি খাস জমি বণ্টন সরকারের একটি অন্যতম কল্যাণমুখী পদক্ষেপ।

কিন্তু প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রয়োজনীয় তথ্যের অপ্রতুলতা এবং সঠিক আবেদন পদ্ধতির বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলো তাদের এই আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। আবার অন্যদিকে সুযোগসন্ধানী ও ভুয়া ভূমিহীনদের অনুপ্রবেশের কারণে এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগটি ব্যাহত হয়।

খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস বা এসিল্যান্ড অফিসের নির্দিষ্ট নিয়মকানুন অনুসরণ করে সঠিক তথ্যাদিসহ আবেদন জমা দেওয়া এবং প্রতিটি প্রশাসনিক ধাপে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। কীভাবে সঠিকভাবে আবেদন তৈরি করবেন, প্রশাসনিক বাছাই প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয় এবং ভুয়া ভূমিহীন প্রতিরোধে সাধারণ নাগরিক হিসেবে কী ধরনের আইনি ভূমিকা রাখবেন—তার বিস্তারিত ও ধাপে ধাপে নির্দেশনা নিচে আলোচনা করা হলো।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ষোড়শ অধ্যায়ের ৩৪২ ও ৩৪৩ পৃষ্ঠায় ‘খাস জমি বন্দোবস্ত পেতে যেভাবে দরখাস্ত করতে হয়’ ও ‘ভূমিহীন নির্বাচন পদ্ধতি যেভাবে অনুসৃত হয়’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

আবেদনপত্র সংগ্রহের নিয়ম ও জমা দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি

উপজেলা খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দ কমিটির পক্ষে সদস্য সচিব অর্থাৎ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভূমিহীনদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করে থাকেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা হাট-বাজারে মাইকিং ও ঢোল-সহরতের মাধ্যমে দরখাস্ত আহ্বানের বিষয়টি প্রচার করা হয়। আগ্রহী প্রার্থীরা স্থানীয় উপজেলা ভূমি অফিস থেকে নির্ধারিত আবেদন ফরম ও সরকারি নীতিমালা সংগ্রহ করতে পারবেন।

দরখাস্ত সঠিকভাবে পূরণের পূর্বে নীতিমালার শর্তগুলো ভালোভাবে পড়ে নেওয়া আবশ্যক। দরখাস্তে আবেদনকারীর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা স্পষ্ট করে লিখতে হবে। অন্যের বাড়িতে বাস করলে 'প্রযত্নে' স্থানে বাড়িওয়ালার নাম ও ঠিকানা দেওয়া নিয়ম। আবেদনপত্রের সাথে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নাগরিকত্ব সনদ এবং চেয়ারম্যান বা মেম্বার কর্তৃক সত্যায়িত স্বামী-স্ত্রীর ১ কপি যুগল ছবি যুক্ত করতে হবে। কোনো কারণে তৎক্ষণাৎ ছবি দেওয়া সম্ভব না হলে, পরবর্তীতে নির্বাচনের পর ছবি জমা দেওয়া হবে মর্মে অঙ্গীকারনামা দেওয়া যায়।

উল্লেখ্য, একটি পরিবারে মাত্র একজন সদস্যই খাস জমি পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। একই পরিবারে ভাই বা প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে আলাদা দরখাস্ত করলেও পরিবারের যৌথ অবস্থানের বিষয়টি আবেদনপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ করতে হবে।

আবেদনের প্রমাণ সংরক্ষণ

আবেদনপত্রটি পূরণ করার পর সেটির একটি ফটোকপি নিজের কাছে রেখে মূল কপিটি এসিল্যান্ড অফিসে জমা দিয়ে রসিদ গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, জমাকৃত ফটোকপির ওপর প্রাপ্তি স্বীকারের স্মারক নম্বর, তারিখ, সিল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া। এতে আবেদন হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না এবং ভাইভা বা সাক্ষাৎকারের সময় উপস্থাপিত তথ্য মনে রাখা সহজ হয়।

ভূমিহীন নির্বাচন ও সরেজমিন বাছাই প্রক্রিয়া

উপজেলা কমিটি প্রাপ্ত দরখাস্তগুলো ইউনিয়নভিত্তিক বিন্যাস করে সরাসরি সরেজমিনে তদন্ত পরিচালনা করে। উপজেলা সদরে না ডেকে মাঠপর্যায়ে আবেদনকারীদের সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ভুয়া ভূমিহীন চিহ্নিত করা সহজ হয়। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে তালিকা তৈরি করে তা সর্বসাধারণের দেখার জন্য টানিয়ে দেওয়া হয়, যেন কোনো অ-ভূমিহীন ব্যক্তি এতে স্থান না পায়। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর ২১ দিনের মধ্যে এসিল্যান্ড বন্দোবস্ত কেস সৃজন করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে সুপারিশ পাঠাবেন। এরপর ইউএনও পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে সেটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বাধীন জেলা কমিটির নিকট প্রেরণ করেন।


ভুয়া ভূমিহীন রোধ ও সাধারণ নাগরিকদের করণীয়

অনেক সময় তাড়াহুড়া করে তালিকা করায় অ-ভূমিহীন ব্যক্তিদের নাম তালিকায় উঠে আসে। যদি কেউ ভূমিহীন না হয়েও ভুয়া তথ্যে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে সাধারণ নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে থাকা জমির দলিলের তথ্য ও প্রমাণসহ এসিল্যান্ড অফিসে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন। কারণ, একবার জমি রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে তা বাতিল করা বেশ জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সঠিক নিয়মে আবেদন ও কড়া নজরদারি বজায় রাখলে ভূয়া ভূমিহীনদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব। সঠিক নিয়ম অনুসরণ করে আবেদন জমা দেওয়া এবং প্রতিটি ধাপে সজাগ দৃষ্টিভঙ্গি রাখলে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলো তাদের আইনের অধিকার ও মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে খাস জমি বন্দোবস্ত পেতে পারেন।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।