logo
Advertisement

নামজারি ও জমা খারিজ, কোনটি কখন প্রয়োজন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
নামজারি ও জমা খারিজ, কোনটি কখন প্রয়োজন
জমির প্রতীকী ছবি।

জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার, দান, হেবা কিংবা অন্য কোনোভাবে মালিকানা পরিবর্তনের পর জমির সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। জমির সর্বশেষ মালিকের নামে রেকর্ড হালনাগাদ করার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নামজারি বা মিউটেশন। আবার মূল খতিয়ান থেকে কোনো মালিকের অংশ পৃথক করে নতুন মালিকের নামে আলাদা খতিয়ান খোলার প্রক্রিয়াকে বলা হয় জমা খারিজ বা জমা পৃথকীকরণ।

Advertisement

জমির মালিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে এসব প্রক্রিয়া সরাসরি সম্পর্কিত। নামজারি কখন প্রয়োজন, কোন কোন কারণে নামজারি করতে হয়, ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের ভূমিকা কী এবং জমা খারিজ বলতে কী বোঝায়—এসব বিষয়ে নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সাবেক মহাপরিচালক এ জেড এম শামসুল আলম। তার রচিত ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইটির ১৫৮, ১৫৯ ও ১৬০ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘নামজারি ও জমা খারিজ’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নামজারি কী

জমির রেকর্ড বা খতিয়ানে মূল মালিক বা বিক্রেতার নাম বাদ দিয়ে নতুন ক্রেতা বা মালিকের নাম অথবা পিতার নামের পরিবর্তে ওয়ারিশ হিসেবে পুত্র-কন্যার নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে ফারসিতে বলা হয় নামজারি, ইংরেজিতে মিউটেশন। বাংলায় নামজারির পরিবর্তে বলা যেতে পারে নামান্তরকরণ বা নাম পরিবর্তন।

নামজারির প্রয়োজনীয়তা কখন শেষ হয়ে যায়

নামজারির প্রয়োজন না থাকলেই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়। প্রয়োজন হয় জমি-জমা বিক্রয়, দান, অনুদান বা হস্তান্তরের মাধ্যমে অথবা মালিকের মৃত্যু বা দেশ ত্যাগের পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের প্রয়োজনে।

নামজারির প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না। কারণ, জমির মালিকানা চিরস্থায়ী করা যাবে না।

মিউটেশন বা নামজারির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা কী

মিউটেশন শব্দের অর্থ হলো পরিবর্তন। জমির মালিকানার ক্ষেত্রে মিউটেশন বলতে সেই প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি বা কাজকে বোঝানো হয়, যার মাধ্যমে জমির খতিয়ানে লিখিত মালিকের নাম, জমির পরিমাণ এবং জমি-সংক্রান্ত অন্যান্য বিভক্তি ও পরিবর্তন করা যায়।

বিভিন্ন প্রকারে ও কারণে ভূমির মালিকানা পরিবর্তন হয়। সর্বশেষ মালিক অথবা মালিকগণের নামে ভূমি রেকর্ডকরণের আইনানুগ সংশোধন প্রক্রিয়াকে বলা হয় নামজারি বা মিউটেশন।

নামজারির উদ্দেশ্য হলো ভূমির সর্বশেষ বা প্রকৃত মালিকের ‘নাম’ বৈধ পদ্ধতিতে পরীক্ষার পর জারি করা বা প্রচার করা। এ পদ্ধতিতে মালিকানার রেকর্ড হালনাগাদ করা হয়।

কোন আইনের কোন ধারায় রাজস্ব কর্মকর্তা বা জরিপ বিভাগের কর্মকর্তারা নামজারি করেন?

১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারা অনুসারে নামজারি পদ্ধতির মাধ্যমে রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক নতুন মালিকের নাম রেকর্ডভুক্ত করে জারি বা প্রচার করা হয়।

জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪ ধারা অনুসারে কোনো এলাকায় জরিপ চলাকালে সরেজমিনে জরিপ কর্মচারীরা মাঠে গমন করে নতুন ভূমি মালিকের নামে ভূমি রেকর্ড করেন।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কী কী কারণে নামজারি বা নতুন মালিকের নামে রেকর্ড হালনাগাদ করা প্রয়োজন হয়

যে যে কারণে বা ক্ষেত্রে নতুন মালিকের নাম জারি করে খতিয়ান শুদ্ধ করতে হয়, তা হলো—

১. জমির মালিকের মৃত্যুজনিত কারণে জমির উত্তরাধিকারীদের নামে রেকর্ডকরণ।

২. জমি ক্রয় করা হলে ক্রেতার নামে।

৩. নিলাম ক্রয় করা হলে নিলাম ক্রেতার নামে।

৪. দান করা বা হেবা করা হলে দান বা হেবা গ্রহণকারীর নামে।

৫. ওয়াকফ করা হলে ওয়াকিফের নামে।

৬. ট্রাস্ট করা হলে ট্রাস্টির নামে।

৭. অধিগ্রহণ করা হলে সরকারের নামে খাস জমি হিসেবে।

৮. বন্দোবস্ত দেওয়া হলে বন্দোবস্ত গ্রহণকারীর নামে।

৯. নানা কারণে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হলে অথবা নদী সিকস্তি হলে পানিতে ডুবে যাওয়া জমি এবং প্রজাস্বত্ব আইনের ৯০, ৯১, ৯২, ৯৩ ধারা মতে মালিকের স্বত্ব বিলোপ করে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

যদি কেউ জমি বিক্রয় করেন বা বৈধ অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করে থাকেন, তবে নামজারি বা মিউটেশন পদ্ধতির মাধ্যমে মালিকানা হালনাগাদ করা হয়ে থাকে।

নামজারি প্রক্রিয়ায় সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসের ভূমিকা কী

কোনো সাবরেজিস্ট্রি অফিসে জমি ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তর নিবন্ধন করা হলে জমি হস্তান্তরের একটি নোটিশ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে প্রেরণ করার কথা।

এরপর যিনি জমি ক্রয় করলেন, তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে জমিটি তার বা হস্তান্তর-কৃত ব্যক্তির নামে রেকর্ড করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন করেন।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় এই দরখাস্ত পাওয়ার পর নিবন্ধন অফিস থেকে প্রাপ্ত নোটিশের সঙ্গে সব তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারেন। যে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছে, সেই দলিলে দেওয়া তথ্য সঠিক আছে কি না, তাও যাচাই করতে পারেন।

এমন হতে পারে, জমিটি যার নামে রেকর্ডকৃত নয়—এমন ব্যক্তি জমি বিক্রয় করে দিলেন। তার ওই জমি বিক্রয়ের অধিকার নেই। এ ধরনের ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি) জমিটি হস্তান্তর বা মিউটেশনের দরখাস্ত প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।

সবকিছু বিধিসম্মত হলে নতুন ক্রেতার নাম মালিক হিসেবে রেকর্ড করতে পারেন বা তার নাম মালিক হিসেবে প্রচার বা জারি করতে পারেন।

‘জমা খারিজ’, জমা পৃথকীকরণ বা পৃথক খতিয়ান কী

উত্তরাধিকার সূত্রে বা অন্য কোনো কারণে মালিকানা বিভক্ত বা পরিবর্তন হলে এক মালিকের নাম হতে জমির অংশবিশেষ মূল খতিয়ান থেকে বের বা খারিজ করে অন্য নতুন মালিকের নামে রেকর্ড করার প্রক্রিয়াকে জমা খারিজ বলা হয়।

খারিজ অর্থ বের করা। পিতা বা পিতামহের বৃহৎ সংসার বা জমা বিভক্ত হয়ে গেলে বড় সংসারের জমি-জমা ছোট ছোট সংসার বা পরিবারের জন্য জমি-জমা বের বা খারিজ, অর্থাৎ মালিকানা রেকর্ড আলাদা করার প্রক্রিয়া হলো জমা খারিজ করা।

প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১১৭ ধারা মতে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে শুনানি দিয়ে প্রয়োজন হলে তদন্ত করে জমা খারিজ করা হয় এবং খতিয়ান আলাদা করা হয় বা নতুন খতিয়ান খোলা হয়।

নামজারির পর নতুন মালিক নামজারি কর্তৃপক্ষ থেকে পেয়ে থাকেন—

১. নামজারি পরচা।

২. হালনাগাদ খাজনা প্রদানের রশিদ (যদি পূর্বে না পেয়ে থাকেন) এবং সরকারি অন্যান্য পাওনা আদায়ের কার্বন ডুপ্লিকেট কপি বা রশিদ।

৩. ইত্যাদি।


লেখকের পরিচয়

এ জেড এম শামসুল আলম

সাবেক চেয়ারম্যান, অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লি.

সাবেক মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

চেয়ারম্যান, আবুজর গিফারী সোসাইটি