logo

বণ্টননামা দলিল ছাড়া জমি বিক্রি নিয়ে আইন যা বলে

বণ্টননামা দলিল ছাড়া জমি বিক্রি নিয়ে আইন যা বলে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

পারিবারিক জমিজমা বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের সামাজিক ও আইনি অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত চিত্র। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া স্থাবর সম্পত্তি সকল ওয়ারিশের মধ্যে আইন অনুযায়ী বন্টিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র প্রায়শই ভিন্ন রূপ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো আনুষ্ঠানিক বা নিবন্ধিত বণ্টননামা (বাটোয়ারা) দলিল না থাকা সত্ত্বেও কোনো এক চতুর ওয়ারিশ এককভাবে স্বউদ্যোগে জমির সবচেয়ে লাভজনক অংশ, প্রধান সড়কের পাশের দামি পজিশন কিংবা উর্বর অংশটি বিক্রি করে দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, কম মূল্যের বা সুবিধাহীন অংশগুলো বাকি অংশীদারদের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে। এমন একপাক্ষিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবারগুলোর অভ্যন্তরে তীব্র পারিবারিক কোন্দল সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে মারামারি এবং দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা-মোকদ্দমায় গড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আইনি ভিত্তি ও আনুষ্ঠানিক বণ্টননামা ছাড়া হস্তান্তরিত হওয়া এমন বিক্রয় দলিলের আসল বৈধতা কতটুকু? প্রচলিত ভূমি ও রেজিস্ট্রেশন আইন মেনে না চললে কীভাবে একজন ক্রেতা বা সহ-ওয়ারিশ চরম প্রতারণার শিকার হতে পারেন এবং এর আইনি প্রতিকারই বা কী, তা জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ঊনবিংশ অধ্যায়ের ৩৯৫ ও ৩৯৬ পৃষ্ঠায় ‘ওয়ারিশান সম্পত্তি বণ্টননামা দলিল ছাড়া যেকোনো দিক থেকে বিক্রি করতে পারবে কি?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

আইনি বাধ্যবাধকতা ও বর্তমান পরিস্থিতি

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ (খ) ধারা অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে খতিয়ান সংশোধন করতে হলে মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটি আনুষ্ঠানিক বণ্টননামা দলিল সম্পাদন করতে হবে। পরবর্তীতে ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী সেই দলিলটি অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে। এই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা খতিয়ান সংশোধন ও নামজারি করে দেন।

আইনবিদদের মতে, আইনটি পালন করা বাধ্যবাধক হলেও এতে নির্দিষ্ট কোনো শাস্তির কঠোর বিধান না থাকায় অনেকে এই আইনি বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে অন্য অংশীদারদের বঞ্চিত করে আসছেন। তবে বণ্টননামা ছাড়া পছন্দের সুবিধাজনক অংশ বিক্রি করে দিলে তা আইনত ও বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধতা পায় না। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য ওয়ারিশরা চাইলে উক্ত অবৈধ বিক্রয় দলিল বাতিলের জন্য আদালতে মামলা করতে পারেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আইনি প্রতিকার

কোনো ওয়ারিশ গোপনে বা একপাক্ষিকভাবে তার সুবিধাজনক অংশ বিক্রি করে দিলে ভুক্তভোগী অংশীদাররা বেশ কিছু আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন-

বাটোয়ারা মামলা: আদালতে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য বাটোয়ারা (বণ্টন) মামলা দায়ের করা যায়।

অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন): ক্রেতা যাতে জমিতে অবৈধভাবে দখল নিতে না পারেন, সেজন্য আদালতে দলিল ও দখলের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করা যায়।

দলিল বাতিলের মামলা: ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো লিখিত দলিল কারো গুরুতর আইনি বা আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তি দলিলটি বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণার জন্য মামলা করতে পারেন।

আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত আপোষ বণ্টননামা ছাড়া জমি ক্রয় করলে ক্রেতার জন্যও ভবিষ্যতে সেই সম্পত্তি হারানোর মারাত্মক ঝুঁকি থেকে যায়।

আমাদের দেশে অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা মারা যাওয়ার ৩০-৪০ বছর পার হয়ে গেলেও সন্তানেরা কেবল মৌখিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে জমি ভোগদখল করছেন। আইনি জটিলতা ও ভবিষ্যৎ পারিবারিক বিরোধ এড়াতে এখনই লিখিত আপোষ বণ্টননামা দলিল সম্পাদন করে সরকারিভাবে নামজারি বা খতিয়ান সংশোধন করে নেওয়া জরুরি। এতে করে নিজের স্বত্ব যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সম্পত্তি সংক্রান্ত স্থায়ী আইনি সুরক্ষা তৈরি হয়।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।