শরিক বা প্রতিবেশীর জমি বিক্রির আইনি অধিকার ও অগ্রক্রয় মামলার নিয়মাবলী

বাংলাদেশে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমার বড় একটি বড় অংশ তৈরি হয় সহ-শরিক বা পাশের জমির মালিককে অগোচরে রেখে বহিরাগত বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করে দেওয়ার কারণে। এতে করে অনেক ক্ষেত্রে পৈতৃক ভিটা বা যৌথ সম্পত্তিতে অপরিচিত মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং নানাবিধ সামাজিক ও পারিবারিক জটিলতার সৃষ্টি হয়। তবে দেশের প্রচলিত আইনে সহ-শরিক ও পার্শ্ববর্তী জমির মালিকদের অধিকার সুরক্ষায় একটি বিশেষ আইনি বিধান রাখা হয়েছে, যাকে ‘অগ্রক্রয়’ বা ‘প্রিয়েমশন’ (Right of Pre-emption) বলা হয়।
এই আইনের মূল কথা হলো—যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথম কেনার সুযোগ পাবেন সংশ্লিষ্ট জমির শরিক বা প্রতিবেশী। যদি কোনো মালিক অন্য শরিকদের না জানিয়ে গোপনে অন্যের কাছে জমি বিক্রি করে দেন, তবে সংক্ষুব্ধ শরিক আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সেই বিক্রি বাতিল করতে পারেন এবং নির্ধারিত মূল্যে জমিটি নিজের নামে হস্তান্তরের আইনি আদেশ লাভ করতে পারেন।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ঊনবিংশ অধ্যায়ের ৪০০, ৪০১ ও ৪০২ পৃষ্ঠায় ‘শরিক, ক্রয়সূত্রে শরিক ও পার্শ্ববর্তী জমি মালিকের জমি ক্রয়ের আইনি অধিকার ও বাস্তবতা’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
আইনি অধিকারের মূল কথা
জমির মালিক তার মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে প্রথমেই তাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহ-শরিকদের জানাতে হবে। ওয়ারিশ সূত্রে এবং ক্রয়সূত্রে সহ-শরিকগণ এই অধিকার ভোগ করেন। তারা যদি ক্রয়ে অনাগ্রহ দেখান, কেবল তখনই তৃতীয় পক্ষের কাছে জমি বিক্রির আইনি বৈধতা তৈরি হয়।
কেন প্রণীত হয়েছিল এই আইন?
ভূমি বিভাজন রোধ, পারিবারিক যৌথ সম্পত্তি সংরক্ষণ, বহিরাগতদের অনুপ্রবেশজনিত সামাজিক দ্বন্দ্ব হ্রাস এবং ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যেই মূলত অগ্রক্রয়াধিকার আইনের উৎপত্তি।
কৃষি ও অকৃষি জমির ক্ষেত্রে সময়সীমা
কৃষিজমি: ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০’ (ধারা ৯৬) অনুযায়ী শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সহ-শরিকরা এই মামলা করতে পারেন। জমি বিক্রির নোটিশ পাওয়ার ২ মাসের মধ্যে অথবা নোটিশ না পেলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
অকৃষিজমি: ‘অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯’ (ধারা ২৪) অনুসারে যৌথ মালিক ও প্রতিবেশী মামলা করার যোগ্য। নোটিশ পেলে ৪ মাস এবং না পেলে বিষয়টি জানতে পারার তারিখ থেকে ৪ মাসের মধ্যে (সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত) মামলা করার বিধান রয়েছে।
মুসলিম আইন ও পারিবারিক বাটোয়ারা
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী শরিক ও সুবিধাপ্রাপ্তরা এ সুবিধা পান (প্রতিবেশীর অধিকারটি বর্তমানে অসাংবিধানিক)। মুসলিম আইনে মামলা দায়েরের সময় তৎক্ষণাৎ টাকা জমা দিতে হয় না, রায়ের পর তা জমা দিলেই চলে। তবে ১ বছরের মধ্যে মামলা করা আবশ্যক। এছাড়া ‘বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩’ অনুযায়ী অবিভক্ত বসতবাড়ির অংশ বহিরাগতদের কাছে বিক্রি করলে অন্য অংশীদারেরা তা পুনরুদ্ধারে মামলা করতে পারেন।
বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্ট ধারণা
ধরুন, রহিম ও সুমি যৌথভাবে ৩০ শতক জমির মালিক। সুমি তার অংশ রহিমের অগোচরে বহিরাগত কারও কাছে বিক্রি করে দিলে, সহ-শরিক হিসেবে রহিম আদালতের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মামলা করে পুরো জমির স্বত্ব নিজের নামে ফিরিয়ে নিতে পারবেন।
মামলা করার শর্ত ও আর্থিক হিসাব
শর্ত: মামলা অবশ্যই বিক্রির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পর করতে হবে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই মামলায় বিবাদী করতে হবে।
খরচ: কৃষিজমির ক্ষেত্রে মূল বিক্রয়মূল্যের সাথে ২৫% ক্ষতিপূরণ ও ৮% সরল সুদ জমা দিতে হয়। অকৃষি জমির ক্ষেত্রে মূল মূল্যের সাথে ৫% ক্ষতিপূরণ এবং ৬.২৫% উন্নয়ন ফি বা আদালতের নির্দেশিত অর্থ জমা দিতে হবে।
কখন অগ্রক্রয় মামলা চলবে না?
বসতবাড়ি বিক্রি করা হলে, রেজিস্ট্রি সম্পন্নের আগেই জমি বিক্রেতাকে ফিরিয়ে দেওয়া হলে, নামমাত্র বা জাল দলিল হলে, বিনিময়-ভাগবাটোয়ারা হলে, রক্তসম্পর্কীয়দের মাঝে হেবা/দান বা উইল হলে কিংবা ওয়াকফ ও দাতব্য কাজের জমিতে এই প্রিয়েমশন নিয়ম কার্যকর হয় না। এছাড়া মামলা করার আগেই নালিশী খতিয়ান পৃথক হয়ে গেলেও প্রিয়েমশন মোকদ্দমা অচল হয়ে যায়।
আদালতের রায় ও দলিল সম্পাদন
আদালত আবেদন মঞ্জুর করলে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে নতুন দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রির নির্দেশ দেন, যার জন্য কোনো বাড়তি ট্যাক্স বা ফি লাগে না। এতে ব্যর্থ হলে আদালত নিজ দায়িত্বে পরবর্তী ৬০ দিনে সাফ কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ একবার আপিল এবং প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে রিভিশন দায়ের করতে পারেন।
জমি বিক্রির ক্ষেত্রে শরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা আইনি জটিলতার বড় কারণ হতে পারে। তাই জমি কেনার আগে বা বিক্রি করার সময় সংশ্লিষ্ট সহ-শরিকদের অধিকার ও আইনি সময়সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি, যা অযাচিত মামলা-মোকদ্দমা ও আর্থিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।