জমির দলিলে ভুল থাকলে সংশোধন করার আইনি উপায়

জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে একটি ভুল দলিল ডেকে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদি নানা আইনি জটিলতা। অনেক সময় জমি রেজিস্ট্রেশনের পর দেখা যায় দাগ বা খতিয়ান নম্বর, মৌজা, সীমানা (চৌহদ্দি), কিংবা নাম ও বানানে মারাত্মক ভুল রয়ে গেছে। আবার কখনো বা দলিল রচনার বিবরণে তারিখ, দলিল নম্বর বা তথ্যে বিভ্রান্তি ঘটে। অজান্তে বা প্রতারণামূলকভাবে হওয়া এসব ভুলের কারণে প্রকৃত মালিককে আইনি বিপাকে পড়তে হয়। তবে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ভুল সংশোধন করা সম্ভব। মূল তথ্য অপরিবর্তিত রেখে জমির দলিল সংশোধনের সহজ নিয়ম, মামলা করার সময়সীমা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৭৯, ১৮০ ও ১৮১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমির দলিলে ভুল হলে সেই দলিল সংশোধনের উপায় কী?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

আদালতে দেওয়ানি মোকদ্দমা
অশুদ্ধ দলিল তৈরি হলে, যে ব্যক্তি জমি বিক্রি করেছেন তিনি অথবা তার মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত ওয়ারেশগণ যদি আপনার দাবি অনুযায়ী উক্ত দলিল সংশোধনে অনিচ্ছুক হন, তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে দলিল সংশোধনের মোকদ্দমা করতে হয়।
মামলার সময়সীমা ও তামাদি আইন
দলিল সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি-
দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করতে হয়।
তবে ওই সময়ের মধ্যে ভুল উদঘাটিত না হলে, তামাদি আইনের ৯১ ও ৯৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভুলের বিষয় উদঘাটনের তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করা যায়।
৩ বছর পার হয়ে গেলে মামলা তামাদির কারণে বারিত হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে সরাসরি দলিল সংশোধনের মামলা না করে ঘোষণামূলক মোকদ্দমা করা যায়।
আদালত কর্তৃক মামলার যে রায় দেওয়া হয়, তার একটি সার্টিফাইড কপি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো হলে তিনি ভলিউম সংশোধন করে নেন। ফলে নতুন করে আলাদা দলিল করার প্রয়োজন হয় না।
অন্যান্য দেওয়ানি মামলা
সিভিল বা দেওয়ানি আদালতের অধিকাংশ মামলা ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন অনুসারে পরিচালিত হয়। যেমন— স্বত্বের মামলা, দখল উদ্ধারের মামলা, চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের মামলা, দলিল সংশোধনের মামলা, চুক্তি বাতিলের মামলা, দলিল বাতিলের মামলা, ঘোষণামূলক মামলা এবং নিষেধাজ্ঞার মামলা ইত্যাদি।

সংশোধনের আইনি শর্তাবলি (৩১ ধারা)
১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী, যে ক্ষেত্রে প্রতারণা অথবা পক্ষগণের পারস্পরিক ভুলের জন্য কোনো লিখিত দলিল হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে দলিলের যেকোনো পক্ষ অথবা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি দলিল সংশোধনের জন্য মামলা দায়ের করতে পারেন। তবে জালিয়াতি বা প্রতারণা এবং পারস্পরিক ভুলের বিষয়টি আদালতে প্রমাণ করতে হবে। শুধু এক পক্ষের ভুল থাকলে সংশোধন গ্রহণযোগ্য হয় না।
বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বিষয় বিশ্লেষণ
প্রতারণার মাধ্যমে দলিল হলে-
ধরুন, এক ব্যক্তি তিনটি দাগের জমির মধ্যে একটি দাগের জমি বিক্রি করতে চাইলেন। কিন্তু ক্রেতা কৌশল করে দলিল লেখকের মাধ্যমে বাকি দুটি দাগের জমিও দলিলে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে নিলেন। পরবর্তীতে মূল মালিক ওই জমির একটি অংশ অন্য কাউকে দান করলেন এবং অন্য অংশটি আরেকজনের কাছে বিক্রি করলেন। এখন প্রথম ক্রেতা নতুন মালিকদের কাজে বাধা দিলে প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ পায়।
এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী মামলা করলে, যে অংশটি দান করা হয়েছিল সেই অংশের দলিল সংশোধন করা যাবে। কারণ সেখানে কোনো তৃতীয় পক্ষের সরল বিশ্বাসের অধিকার তৈরি হয়নি। কিন্তু যে অংশটি অন্য একজন ব্যক্তি সরল বিশ্বাসে অর্থ দিয়ে কিনে নিয়েছেন, সেই অংশের দলিল বাতিল বা সংশোধন করা যাবে না। তবে মূল বিক্রেতা ওই প্রতারক প্রথম ক্রেতার কাছ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন।
-209039.jpeg)
কাদের মামলা করার অধিকার আছে?
দলিলের যেকোনো পক্ষ, পক্ষগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিগণ, দলিলের যেকোনো পক্ষের উত্তরাধিকারীগণ, হস্তান্তরের গ্রহীতাগণ এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ দলিল সংশোধনের মামলা করতে পারেন।
কখন দলিল সংশোধন করা যায় না (তৃতীয় পক্ষের অধিকার)-
যখন কোনো তৃতীয় ব্যক্তি উপযুক্ত মূল্য বা অর্থ পরিশোধ করে সরল বিশ্বাসে কোনো জমি ক্রয় করে ফেলেন, তখন তার সেই অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে দলিল সংশোধন করা যায় না। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পক্ষ প্রতারণাকারীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হন।
সংশোধনযোগ্য দলিল ও আদালতের এখতিয়ার
যেসব দলিল সংশোধনযোগ্য: রেজিস্ট্রি দলিল (যেমন— কোবালা দলিল), লিখিত চুক্তিপত্র, বন্ধকী দলিল ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী সংশোধন করা যায়।
আদালতের এখতিয়ার: দেওয়ানি কার্যবিধি আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন আদালত হিসেবে সহকারী জজ আদালত থেকে মামলার মূল্যায়ন অনুযায়ী বিচারিক এখতিয়ার নির্ধারিত হয়। মূল্যমান বেশি হলে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দাখিল করতে হয়।
কোর্ট ফি ও বিবাদী: রেজিস্ট্রি অফিসের নির্ধারিত মৌজা রেটের ভিত্তিতে মামলার মূল্যায়ন তালিকা তৈরি হয় এবং তার ওপর ভিত্তি করে অ্যাডভোলোরেম কোর্ট ফি দিতে হয়। এ মামলায় যে এলাকায় সম্পত্তি অবস্থিত, সেখানকার সাব-রেজিস্ট্রারকে মোকাবেলা বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত করতে হয়।
আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা
দলিল সংশোধনের মামলা করলেও আদালত তার বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করে আদেশ প্রদান করেন। তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২২ ধারায় বলা আছে, আদালতের এই বিবেচনামূলক ক্ষমতা কোনোক্রমেই স্বেচ্ছাচারী হবে না; বরং তা আইনি নীতি ও ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
-9c1ab0.jpeg)
জমির দলিলে যেকোনো ধরনের ভুল থাকলে অবহেলা না করে তা দ্রুত সংশোধন করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। তামাদি আইনের কারণে সময় গড়িয়ে গেলে আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়ে। তাই জমি কেনার পরই দলিল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা উচিত এবং কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে কিংবা অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


