প্রতারণার শিকার হলে কী করবেন, আইনে শাস্তির বিধান
-0a1c7a-720x405.webp)
দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে পেশাগত ক্ষেত্র - প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গ বর্তমানে আমাদের সমাজের একটি নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় না বুঝে বা আইনি জটিলতার ভয়ে বহু মানুষ বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করেও চুপ থাকেন। তবে সঠিক আইনি জ্ঞান থাকলে প্রতারক ও বিশ্বাসভঙ্গকারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা সম্ভব। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রতারণার ধরন, শাস্তির বিধান এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার উপায়গুলো তাই জানা জরুরি।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৪০ ও ১৪১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা পরিচয় সম্পর্কিত অপরাধে আইনী প্রতিকার’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

সমাজে ‘৪২০’ বা ‘ফোর টুয়েন্টি’ শব্দটি প্রতারণার সমার্থক হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। দণ্ডবিধির ৪১৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ছলনা, প্রবঞ্চনা বা অসাধু উপায়ে অন্য কাউকে সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচিত করে, তবে তা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া প্ররোচনার ফলে কারো দেহ, মন, খ্যাতি বা সম্পত্তির ক্ষতি হলে বা ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা প্রতারণার আওতাভুক্ত।
প্রতারণার ধরন ও শাস্তি
ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্য, জালিয়াতি, মিথ্যা পরিচয় প্রদান কিংবা বিয়ের নামে প্রতারণাসহ নানা ধরনের অপরাধের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় মামলা বেশি হতে দেখা যায়, যেখানে অপরাধীর সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনের আশ্রয় ও প্রমাণাদির গুরুত্ব
চাকরি বা বিয়ের নামে প্রতারণা কিংবা বিদেশে পাঠানোর চুক্ত ভঙ্গ হলে ভুক্তভোগী সহজেই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। এক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলা এবং দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ মোকদ্দমা করা যায়। তবে আইনি ব্যবস্থার জন্য লিখিত চুক্তি ও রসিদের মতো নথি সংরক্ষণ করা জরুরি।

একটি বাস্তব উদাহরণ: সুমনকে বৃত্তির মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানোর চুক্তি করে একটি প্রতিষ্ঠান। তিনটি কিস্তিতে টাকা পরিশোধের শর্ত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়। টাকা ফেরতের দাবিতে সুমনের বাবা চাপ দিলে প্রতিষ্ঠান দাবি করে, চুক্তিতে অর্থ ফেরতের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা এক কিস্তিতে দেওয়ার উল্লেখ নেই; তাই সুবিধা অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে।
চুক্তি আইন ও সচেতনতা
১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের ২(জ) ধারা অনুযায়ী, আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য সম্মতিই চুক্তি। এটি লিখিত বা মৌখিক হতে পারে। তবে মৌখিক চুক্তি প্রমাণ করা কঠিন হওয়ায় লিখিত চুক্তি করাই শ্রেয়। বিশেষ করে ভূমি সংক্রান্ত চুক্তি অবশ্যই নিবন্ধিত হতে হবে, অন্যথায় আইনি সুরক্ষার সুযোগ থাকে না। মামলা পরিচালনার ব্যয়ও আদালত অভিযুক্তের কাছ থেকে আদায় করে দিতে পারেন।
বিশ্বাসভঙ্গ ও সাজা
অঙ্গীকার ভঙ্গ, আমানতের খেয়ানত বা বিশ্বাস ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, যেখানে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে।
অফিসের কর্মচারীর বিশ্বাসভঙ্গে (ধারা ৪০৮) সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড।
সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী বা এজেন্টের বিশ্বাসভঙ্গে (ধারা ৪০৯) যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এটি একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। ভুক্তভোগী সরাসরি থানায় এজাহার দিয়ে কিংবা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করতে পারেন। প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে আসামির জামিন নাও হতে পারে। তবে কর্মচারী, ব্যাংক কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের তদন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) করে থাকে।
আইনি প্রতিকারের সুযোগ থাকলেও যেকোনো প্রতারণা এড়ানোর প্রধান উপায় হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা। আর্থিক লেনদেন, ভূমি হস্তান্তর কিংবা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে লিখিত নথি প্রস্তুত ও নিবন্ধিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে কোনো কারণে প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হলে ভেঙে না পড়ে সঠিক তথ্য প্রমাণাদিসহ দ্রুততম সময়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। সচেতনতা এবং আইনের যথোপযুক্ত প্রয়োগই পারে সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


