logo

পাওনা টাকা আদায়ে জটিলতা? জেনে নিন আইনি প্রতিকার ও সঠিক পদক্ষেপ

পাওনা টাকা আদায়ে জটিলতা? জেনে নিন আইনি প্রতিকার ও সঠিক পদক্ষেপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

কাউকে বিশ্বাস করে টাকা ধার দেওয়া বা ব্যবসায়িক লেনদেনে বাকি রাখা আমাদের সমাজে অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখনই, যখন নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও পাওনা টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না। দেনাদার টাকা দেওয়া নিয়ে নানা তালবাহানা শুরু করে, দিনকে দিন ঘোরাতে থাকে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো হুমকিও প্রদর্শন করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ প্রায়ই হতাশ হয়ে পড়েন এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থ হন।

তবে আইনশৃঙ্খলা ও দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় থেকেই ধাপে ধাপে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাওনা অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এশিয়া পোস্টের পাঠকদের জন্য আইনি উপায়ে পাওনা টাকা আদায়ের বিভিন্ন কৌশল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, মামলা করার নিয়ম ও খরচ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা নিচে উপস্থাপন করা হলো।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ১৫ নং অধ্যায়ের ৩৬১ ও ৩৬২ পৃষ্ঠায় ‘পাওনা টাকা আদায়ে কি মামলা করবেন’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্রাথমিক পদক্ষেপ: সালিশ ও থানায় অভিযোগ

পাওনা টাকা আদায়ে শুরুতেই আদালত পর্যন্ত না গিয়ে দুটি ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া যায়:

স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসা: প্রথমে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে শালিসের মাধ্যমে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে গ্রাম আদালতের সহায়তা নেওয়াও একটি কার্যকর পথ।

থানায় ফৌজদারি মামলা: আপসে সমাধান না হলে থানায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সম্ভব (যা স্থানীয়ভাবে অর্থ আত্মসাতের মামলা হিসেবে পরিচিত)। মামলা দায়েরের সময় লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে রশিদ, হিসাবের খাতা, চুক্তিপত্র, অঙ্গীকারনামা বা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত হলফনামা জামা দিতে হবে।

কোর্টে মামলা ও সিআর নালিশ

থানায় মামলা না হলে সরাসরি আদালতে গিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে পাওনাদারকে আইনি নোটিশ (Legal Notice) পাঠানো যায়। নোটিশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধের তাগিদ দেওয়া হয়। উক্ত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে প্রতারণা ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে আদালতে 'সিআর (নালিশি) মামলা' দায়ের করা যায়।

আদালতের পদক্ষেপ: আদালত অভিযোগকারীর জবানবন্দি নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন। অথবা পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারেন।

চেক ডিজঅনার: দেনাদার যদি চেক প্রদান করেন এবং সেই চেক ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার কারণে ডিজঅনার হয়, তবে তার বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনারের পৃথক মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

লেনদেনের পূর্বে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা

টাকা ধার দেওয়ার আগেই লিখিত চুক্তি করা অত্যন্ত জরুরি:

৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি: ধার দেওয়ার আগে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিনামা তৈরি করুন। এতে কী কারণে, কত টাকা ধার দেওয়া হলো, টাকা এককালীন নাকি কিস্তিতে এবং কবে ফেরত দেওয়া হবে তা স্পষ্ট উল্লেখ রাখুন।

নোটারি ও সাক্ষী: চুক্তিপত্রটি নোটারি বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা সত্যায়িত করে নিতে হবে এবং কয়েকজনকে সাক্ষী হিসেবে রাখতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের লেনদেন: কোনো কোম্পানি, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সঠিকভাবে চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।

অর্থঋণ আদালত, দেওয়ানি আদালত ও শ্রম আদালত

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলে তারা অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে পারে। জামানতকৃত সম্পত্তি নিলামে তুলে বা বিক্রির মাধ্যমে টাকা আদায় কিংবা মালিকানার সনদ নিতে পারে। 'অর্থ ঋণ আইন'-এর ১২ ধারা মোতাবেক জামানতি স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির পরও বকেয়া থাকলে তা আদায়ে মামলা করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কর্মচারীদের পাওনা: কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী যদি তার বকেয়া মজুরি না পান, তবে তিনি 'শ্রম আইন' অনুযায়ী শ্রম আদালতে আশ্রয় নিতে পারেন। তিনি যদি শ্রমিক হিসেবে গণ্য না হন, তবে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হবে।

আপস-মীমাংসার সুযোগ: মনে রাখা প্রয়োজন, মামলার যেকোনো পর্যায়ে উভয় পক্ষের সম্মতিতে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে টাকা পরিশোধের সুযোগ খোলা থাকে।

দেওয়ানি মোকাদ্দমার এখতিয়ার ও খরচ

‘দ্য সিভিল কোর্টস (সংশোধিত) অ্যাক্ট, ২০২১’ অনুযায়ী দেওয়ানি মোকাদ্দমার আর্থিক এখতিয়ার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

সহকারী জজ: ২ লাখ টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।

সিনিয়র সহকারী জজ: ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।

জেলা জজ (আপিল শুনানি): ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত।


আদালতের ফি (Court Fee)

দেওয়ানি মানি স্যুট মামলার ক্ষেত্রে পাওনা টাকার ওপর ২.৫% হারে এ্যাডভলোরেম কোর্ট ফি এবং ১৫% ভ্যাট প্রদান করতে হয় (যা অফেরতযোগ্য)। উদাহরণস্বরূপ, ১ লাখ টাকা পাওনার জন্য মোট কোর্ট ফি আসবে ২,৫০০ টাকা। অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতি লাখে আনুমানিক ৩,০০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে। তবে সরকার চাইলে এ হার পরিবর্তন করতে পারে।

পাওনা টাকা আদায়ে আবেগ বা বিশৃঙ্খলা না করে সঠিক আইনি পথ অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। লেনদেনের শুরুতেই সঠিক কাগজপত্র তৈরি রাখা এবং প্রয়োজনে সঠিক আদালতে মামলা দায়ের করলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিজের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।