ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে নির্ধারিত অংশ পান কারা?

ইসলামের উত্তরাধিকার আইন আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম জাতির প্রতি বিশেষ রহমত। কারণ, নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার আইন না থাকলে মুসলমানদের মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে তারা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতো। তাই ফারায়েজের জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফারায়েজ সম্পর্কে অনেক মানুষেরই সম্যক ও স্পষ্ট জ্ঞান নেই। তাই প্রায়শই সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হয়। মৃতের সম্পত্তিতে কাদের জন্য অংশ সুনির্ধারিত, তা ইসলাম নির্ধারণ করে দিয়েছে।
উত্তরাধিকার আইন নিয়ে ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ফারায়েজ সম্পর্কে ইসলামি আইন ও বিধিবিধানসহ নানা বিষয় নিয়ে ‘ফারায়েজ আইন’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন গাজী শামসুর রহমান। বইটির তৃতীয় অধ্যায়ের ২০ থেকে ২২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জাবিল ফুরুজ’ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

ইসলামি শরিয়া আইনে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বা মিরাস বণ্টনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সুসংহত। বিশেষ করে হানাফি ফিকহ শাস্ত্র মতে, ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে সুপ্রাচীন কাল থেকেই প্রামাণিক গ্রন্থাবলির অনুসরণ করা হচ্ছে। মিরাস বণ্টনের মূল ধাপে প্রবেশের আগে মৃতের সম্পদ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু দায় ও খরচ মেটানো শরিয়া অনুযায়ী আবশ্যক।
ইসলামি আইনে উত্তরাধিকার কারা
ইসলামি আইনে ওয়ারিসদের প্রধানত তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়—
জাবিল ফুরুজ (অংশীদাররা): যাদের অংশ কোরআন ও হাদিস দ্বারা নির্ধারিত।
আসাবা (অবশিষ্টাংশ ভোগীরা): অংশীদারদের নেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তির প্রাপক।
জাবিল আরহাম (দূরবর্তী আত্মীয়রা): প্রথম দুই শ্রেণির অনুপস্থিতিতে যারা সম্পত্তি পান।
মিরাস বণ্টনের আগে করণীয়
ইসলাম বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো মুসলিম মারা গেলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে স্বজনদের মধ্যে বণ্টন শুরু করার আগে তিনটি কাজ সম্পন্ন করা আবশ্যক। যথা—
- কাফন-দাফনের ব্যয়: মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে তার কাফন ও দাফনের খরচ মেটাতে হবে। এতে যেমন কৃপণতা করা যাবে না, তেমনি অপব্যয়ও বর্জনীয়। জীবিত অবস্থায় তিনি যে মানের পোশাক পরতেন, সেই দামের কাপড়ে কাফন দিতে হবে। পুরুষের জন্য তিনটি এবং নারীর জন্য পাঁচটি কাপড় নির্ধারিত, যার কম-বেশি করা নিয়মবহির্ভূত।
- ঋণ পরিশোধ ও মোহরানা আদায়: কাফন-দাফনের পর মৃতের সব ঋণ শোধ করতে হবে। বিশেষ করে স্ত্রীর অনাদায়ী মোহরানা পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। সম্পত্তি লাভের তাড়নায় অনেক সময় এই ঋণ উপেক্ষিত হলেও শরিয়া মতে এটি মৃতের সম্পদের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। পাওনাদাররা মৃতের সম্পত্তি থেকে তাদের প্রাপ্য আদায় করে নেওয়ার অধিকার রাখেন।

- ওসিয়ত পূরণ: মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর আগে কোনো বৈধ ওসিয়ত করে থাকলে, অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব দায় মেটানোর পরই শুধু অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া যাবে।
জাবিল ফুরুজ বা কোরআনি অংশীদারদের পরিচয়
জাবিল ফুরুজরা কোরআন, হাদিস ও ইজমার সমর্থনে নির্ধারিত অংশ পেয়ে থাকেন। তাদের ‘জুল কোরআন’ বা কোরআনি ওয়ারিস বলা হয়। এই শ্রেণিতে মোট ১২ জন প্রতিনিধি রয়েছেন—যার মধ্যে ৪ জন পুরুষ এবং ৮ জন নারী। সম্পর্কের ভিত্তিতে তাদের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: ‘সবব’ (বৈবাহিক সম্পর্ক) এবং ‘নসব’ (রক্তজ সম্পর্ক)।
জাবিল ফুরুজের তালিকা
| ওয়ারিসের কারণ | পুরুষ | নারী |
|---|---|---|
| সবব (বৈবাহিক সম্পর্ক) | ১. স্বামী | ১. স্ত্রী |
| নসব (রক্তজ সম্পর্ক) | ২. পিতা | ২. মাতা |
| ৩. দাদা (বাবার বাবা, পিতামহ ও উর্ধ্বক্রমের সবাই) | ৩. দাদি-নানি (দাদির মা, দাদার মাতা ও উর্ধ্বক্রমের সবাই) | |
| ৪. ভাই (বৈপিত্রেয়) | ৪. কন্যা | |
| ৫. ছেলের মেয়ে (ছেলের ছেলের মেয়ে ও নিম্নক্রমের সবাই) | ||
| ৬. সহোদর বোন | ||
| ৭. বৈমাত্রেয় বোন (বাবা এক, মা ভিন্ন) | ||
| ৮. বৈপিত্রেয় বোন (মা এক, বাবা ভিন্ন) |
এই বারোজন ছয় রকম নির্দিষ্ট অংশে মিরাস পান। যথা—এক চতুর্থাংশ, এক ষষ্ঠাংশ, এক অষ্টমাংশ, এক তৃতীয়াংশ, দুই তৃতীয়াংশ।
লেখক পরিচিতি
গাজী শামছুর রহমান (১৯২১-১৯৯৮) বাংলাদেশি আইনবিদ ও আইন সংস্কারক, বিচারক, ভাষাবিদ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলায় আইনবিষয়ক গ্রন্থ রচনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তিনি ১৯৮৫ সালে একুশে পদক পান। তিনি জেলা জজ ছিলেন। সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন কিছুদিন।



-6c3bab.jpg)