সরকার জমি অধিগ্রহণ করলে ক্ষতিপূরণ কত পাবেন, জানুন আইনের হিসাব

জাতীয় উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ভৌত অবকাঠামো সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে থাকে। তবে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভূমিমালিকদের অধিকার রক্ষা, আবেদনের সময়সীমা, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের অনুপাত এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে স্পষ্ট নিয়মাবলি রয়েছে ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭’-এ।
আইনগত সুরক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে সঠিক তথ্যের অভাব এবং কিছু অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্যে প্রায়শই হয়রানির শিকার হন সাধারণ মানুষ। অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন আইনি দিক, নোটিশের মেয়াদ, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার উপায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের আইনগত অধিকারের বিস্তারিত নিয়ে এশিয়া পোস্টের বিশেষ প্রতিবেদন।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ষোড়শ অধ্যায়ের ৩৪৭, ৩৪৮ ও ৩৪৯ পৃষ্ঠায় ‘ভূমি অধিগ্রহণ কি,কেন, কখন, কিভাবে?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

অধিগ্রহণের ক্ষেত্র ও ব্যতিক্রম
সরকার দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন, যেমন—ঘরবাড়ি, দালানকোঠা, অফিস-আদালত, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, সড়ক কিংবা সেতুর প্রবেশপথ নির্মাণের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারে। তবে ২০১৭ সালের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী—ধর্মীয় উপাসনালয়, কবরস্থান ও শ্মশান সাধারণ নিয়মে অধিগ্রহণ করা যায় না। কেবল জনস্বার্থে একান্ত অপরিহার্য হলে সরকারি বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার খরচে স্থানান্তর ও পুনর্নির্মাণের শর্তে তা অধিগ্রহণ করা সম্ভব।
নোটিশ ও আপত্তি দাখিলের প্রক্রিয়া
জমি অধিগ্রহণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৪ ধারার নোটিশ জারির পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে আপত্তি দাখিল করা যায়। সম্পত্তির পরিমাণ ৫০ বিঘার বেশি হলে আপত্তি সংক্রান্ত মতামত ও নথি সিদ্ধান্তের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
জমির পরিমাণ ৫০ বিঘার কম হলে প্রতিবেদন জেলা কমিশনার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
জনস্বার্থে গৃহীত এসব সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয় এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ থাকে না। এরপর ৭ ধারার নোটিশ জারির মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শেষ হয়; ৭ ধারার নোটিশের পর আর কোনো অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হয় না।
ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও হিসাব
নোটিশ জারির পূর্ববর্তী ১২ মাসের গড় বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে জমির মূল্য ও অন্যান্য ক্ষতির হিসাব করা হয়।
সরকারি প্রয়োজনে অধিগ্রহণ: বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত ২০০ শতাংশ (অর্থাৎ ৩ গুণ) ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিগ্রহণ: বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত ৩০০ শতাংশ (অর্থাৎ ৪ গুণ) ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়।
অন্যান্য আনুষঙ্গিক ক্ষতি: অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়।
অন্যান্য সুবিধা: আবাসন বা ব্যবসা কেন্দ্র স্থানান্তরের যুক্তিসংগত খরচ এবং বর্গাদারদের আবাদের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চিত্র
অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পরিশোধের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়। উক্ত আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বা আবেদন করার এখতিয়ার রহিত করা হয়েছে। সংবিধানেও (৪২-২ অনুচ্ছেদ) বাধ্যতামূলক অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সীমিত রাখা হয়েছে।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, নোটিশ জারির পর কিছু অসাধু চক্র বা স্বার্থান্বেষী মহল জাল নথি বা আপত্তি তৈরি করে ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে রাখার চেষ্টা করে। ফলে প্রকৃত ভূমিমালিকরা হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থে ভূমি অধিগ্রহণ একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া হলেও মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য কমিয়ে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের দ্রুত সঠিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলেই আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।