ট্রাস্ট গঠনের আইনি নিয়মাবলী ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় আইনি কাঠামোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজ সম্পদ নিরাপদে বজায় রাখা, পরিবারের সদস্যদের সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কিংবা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে সম্পদ স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করার সবচেয়ে সুসংগঠিত আইনি পথ হলো ‘ট্রাস্ট’ গঠন। তবে সঠিক ধারণার অভাব, আইনি প্রসেস সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে আমাদের সমাজে ট্রাস্ট ব্যবস্থার সঠিক ও ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় না।
অনেক সময় অসচেতনতার কারণে অর্জিত সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক কোন্দল বা নানাবিধ আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়, যা একটি নিবন্ধিত ও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে সহজেই এড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশে প্রধানত ‘ট্রাস্ট আইন ১৮৮২’ (যা অছি আইন নামে পরিচিত) এবং রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত আইনি বিধিমালার আওতায় ট্রাস্ট ব্যবস্থা সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫ ও ৩২৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘ট্রাস্ট কি, কেন, কখন, কিভাবে? এবং ‘একটি ট্রাস্টনামা দলিলের ফরম্যাটট্রাস্টনামা দলিল’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ট্রাস্টের পেছনের ইতিহাস ও মৌলিক ধারণা
সহজ কথায়, নিজের বা অন্যের উপকারের উদ্দেশ্যে কোনো সম্পত্তির আইনি দায়িত্ব অপর কোনো ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করাই হলো ট্রাস্ট। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাস্ট ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের শাসনামলে রোমান ক্যাথলিক যাজকরা চার্চের নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি ভূসম্পত্তির মালিক হতে পারতেন না। তখন সাধারণ মানুষ তাদের ভরণপোষণের জন্য ‘বরো’ নামক একটি সম্প্রদায়ের কাছে সম্পত্তি ন্যস্ত করত, যা থেকে যাজকরা সুফল ভোগ করতেন। বর্তমান যুগের ট্রাস্ট ধারণার উৎপত্তি মূলত এই ব্যবস্থা থেকেই।
ট্রাস্ট গঠনের তিন পক্ষ ও প্রয়োজনীয় শর্তাবলি
আইন অনুযায়ী একটি ট্রাস্ট গঠনের জন্য প্রধানত তিনটি পক্ষ বা সত্তার প্রয়োজন হয়-
ট্রাস্টকর্তা: যিনি সম্পত্তি ন্যস্ত করেন।
ট্রাস্টি: যিনি বা যারা সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সুফলভোগী (বেনিফিসিয়ারি): যার বা যাদের কল্যাণে ট্রাস্টটি গঠিত হয়।
ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি বাস্তবে অস্তিত্বশীল ও রূপান্তরযোগ্য হতে হবে। কোনো অস্পষ্ট বা কাল্পনিক সম্পদ নিয়ে ট্রাস্ট গঠন করা যায় না। হস্তান্তরের জন্য দলিলে সুনির্দিষ্টভাবে সম্পত্তির বিবরণ, ট্রাস্টিদের পরিচয় এবং সুফলভোগীদের অর্পিত অধিকার উল্লেখ করতে হয়।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও রেজিস্ট্রি
১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তির যেকোনো ট্রাস্ট দলিল রেজিস্ট্রি করা আইনত বাধ্যতামূলক। আইনি চুক্তি করার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তি বা দেওয়ানি আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে নাবালকের পক্ষেও ট্রাস্ট গঠন করা সম্ভব। অন্যদিকে, যেকোনো সম্পত্তি অর্জনে আইনি বাধা নেই- এমন যেকাউকে ট্রাস্টি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায়। তবে নিয়োগের পূর্বে ট্রাস্টির সম্মতি নেওয়া আবশ্যক।
কখন ট্রাস্ট অবৈধ বা বাতিল হয়?
ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী, সম্পূর্ণ বৈধ ও আইনসম্মত উদ্দেশ্যে ট্রাস্ট গঠন করতে হয়। যদি কোনো প্রতারণা, অবৈধ কাজ সম্পাদন, অন্য কারো শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতিসাধন কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী উদ্দেশ্যে ট্রাস্ট গঠন করা হয়, তবে তা শুরুতেই অবৈধ ও বাতিল বলে গণ্য হবে।

একটি বাস্তব উদাহরণ: ‘প্রামাণিক পাঠাগার’ ট্রাস্ট দলিল
ট্রাস্ট কীভাবে সামাজিক কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে, তার চমৎকার দৃষ্টান্ত কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার মালিগ্রামের দুই ভাই মোঃ আব্দুস সোবহান ও মোঃ আব্দুস সালামের উদ্যোগ। নিজেদের শেষ বয়সে পৈতৃক সম্পত্তি মানবসেবায় উৎসর্গ করতে তারা একটি গণ-গ্রন্থাগার স্থাপনের লক্ষ্যে ট্রাস্ট গঠন করেন।
তাদের গঠিত ‘প্রামাণিক পাঠাগার’ ট্রাস্টের মূল উদ্দেশ্যে ছিল—১৫৮৬ নম্বর দাগের জমিতে দোতলা ভবন তৈরি করে দাতব্য পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, নিয়মিত পাঠচক্র ও খেলাধুলার আয়োজন, নারী ক্ষমতায়ন, বাল্যবিয়াহ ও মাদক প্রতিরোধ এবং জরুরি রক্তদানের জন্য ব্লাড ক্লাব গঠন। ট্রাস্টের দলিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ট্রাস্টিরা কেবল উক্ত সম্পত্তির দেখভাল ও জনকল্যাণে অর্জিত আয় ব্যয় করতে পারবেন; কিন্তু কখনোই এই সম্পত্তি বিক্রি বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবেন না।
আমাদের দেশে ট্রাস্ট ব্যবস্থা সম্পর্কিত ধারণা সীমিত হলেও, সম্পদ সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদী জনকল্যাণে এর ভূমিকা অপরিসীম। মৃত্যুর পরেও নিজের কষ্টার্জিত সম্পত্তি যেন সৎ ও মানবিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার সুফল পায়, তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আইনি পথ হলো সঠিক নিয়মে ট্রাস্ট গঠন করা।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।