logo
Advertisement

হিন্দু উত্তরাধিকার আইন: ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী ও অন্যান্য ওয়ারিশের অধিকার

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন: ছেলে, মেয়ে,  স্ত্রী ও অন্যান্য ওয়ারিশের অধিকার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

উপমহাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে হিন্দু আইনের সম্পর্ক বহু প্রাচীন। কথিত আছে, দ্রাবিড় জাতি সিন্ধু নদীর তীরে বসতি স্থাপন করে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। পরবর্তীতে এই দ্রাবিড় জাতিই আর্য ও অনার্য নামে হিন্দু পরিচিতি লাভ করে। হিন্দু সম্প্রদায় তাদের ওপর প্রযোজ্য দেবদত্ত আইনকে ঐশ্বরিক দান ও ধর্মীয় বিধি-বিধান হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। হিন্দু সমাজের প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত— মিতাক্ষরা এবং দায়ভাগ।

Advertisement

একাদশ শতাব্দীতে পণ্ডিত বিজ্ঞানেশ্বর 'মিতাক্ষরা' আইন রচনা করেন, যা ভারতের অবাঙালি হিন্দু সমাজে প্রচলিত। মিতাক্ষরা আইনে মৃত ব্যক্তির রক্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ণয় করা হয়। তবে বাংলাদেশে বা বাঙালি সমাজে এই আইনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, চতুর্দশ শতাব্দীতে পণ্ডিত জীমূতবাহন 'দায়ভাগ' গ্রন্থটি রচনা করেন। এই আইন অনুযায়ী, শাস্ত্র মতে মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধে যার পিণ্ডদানের অধিকার আছে, তারাই মৃত ব্যক্তির 'সপিণ্ড' এবং উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য। অত্যন্ত প্রগতিশীল এই দায়ভাগ আইনই মূলত উভয় বাংলায় প্রচলিত।

বর্ণভেদ ও হিন্দু আইনের প্রধান উৎস

দায়ভাগ আইনে বর্ণের তারতম্য অনুসারে শ্রেণীভেদে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। বর্ণভেদে হিন্দু সম্প্রদায় চার ভাগে বিভক্ত—ক্ষত্রিয় বা শাসক, ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত, বৈশ্য বা কৃষক এবং শূদ্র বা সেবক। প্রথমোক্ত তিন শ্রেণী আর্য বংশজ এবং শূদ্ররা স্থানীয় দ্রাবিড় বংশজ (উভয় বাংলার কায়স্থরাও শূদ্র শ্রেণীভুক্ত)।

হিন্দু আইনের মূল উৎস মূলত ৩টি

শ্রুতি: 'শ্রুতি' শব্দের অর্থ শ্রবণ করা। মুনি-ঋষিগণ ধ্যানযোগে ঈশ্বরের বাণী শ্রবণ করে যা চার বেদে (ঋক, যজু, সাম ও অথর্ব) সংকলন করেছেন, তাকে শ্রুতি বলা হয়। বেদে স্পষ্ট আইন না থাকলেও এটি হিন্দু আইনের মূল ভিত্তি।

স্মৃতি: 'স্মৃতি' শব্দের অর্থ মনে রাখা। ঈশ্বরের যেসব নির্দেশ ঋষিগণ স্মরণ রেখে পরবর্তীতে গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন, তাকে স্মৃতিশাস্ত্র বলা হয়।

নিবন্ধ: প্রাচীন শাস্ত্রের সাথে প্রথার বিরোধ ও অসঙ্গতি দেখা দিলে পণ্ডিতগণ তা সংশোধন করে যে ব্যাখ্যা দেন, তাই নিবন্ধ। এ ক্ষেত্রে পণ্ডিত বিজ্ঞানেশ্বর ও জীমূতবাহন প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

দায়ভাগ আইনে উত্তরাধিকার ও 'সপিণ্ড' ব্যবস্থা

আমাদের দেশের হিন্দুগণ দায়ভাগ আইনে পরিচালিত হন। এই আইনে জীবিত অবস্থায় একজন হিন্দু তার অর্জিত সম্পত্তির প্রকৃত মালিক এবং তার মৃত্যুর পরই কেবল উত্তরাধিকারগণ মালিক হন। পিতার বর্তমানে পুত্র ছাড়া অন্য কেউ সম্পত্তি পায় না।

দায়ভাগ আইনে উত্তরাধিকারীদের ৩টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে-

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সপিণ্ড

এরা সবচেয়ে নিকটবর্তী (প্রথম শ্রেণীর) উত্তরাধিকারী। একই দেহ থেকে উদ্ভূত বা পিণ্ডদানের সম্পর্কের ভিত্তিতে সপিণ্ড নির্ধারিত হয়। পিতৃকুলের ৩ পুরুষ ও মাতৃকুলের ৩ পুরুষ এবং পুত্রের দিকে ৩ পুরুষ ও দৌহিত্র ৩ পুরুষ মিলে মোট ১২ জন মৌলিক সপিণ্ড। এছাড়া পিণ্ডদানের সম্পর্কের ভিত্তিতে সপিণ্ডের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৩ জন (যার মধ্যে নারী সপিণ্ড ৫ জন—বিধবা স্ত্রী, কন্যা, মাতা, পিতামহী ও প্রপিতামহী)।

সাধারণত যে ২০ জন সপিণ্ডের উত্তরাধিকার কার্যকর হয়, তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো-

পুত্র (Son): মৃত ব্যক্তির প্রাথমিক ও নিকটতম প্রথম উত্তরাধিকারী হলেন তাঁর পুত্র।

পুত্রের পুত্র (Son's Son): যদি পুত্র জীবিত না থাকেন, তবে তাঁর সরাসরি বংশধর হিসেবে পৌত্র বা পুত্রের পুত্র উত্তরাধিকার স্বত্ব লাভ করেন।

পুত্রের পুত্রের পুত্র (Son's Son's Son): পুত্র ও পৌত্রের অনুপস্থিতিতে প্রপৌত্র অর্থাৎ পুত্রের পুত্রের পুত্র উত্তরাধিকারী হন।

বিধবা স্ত্রী / পুত্রের স্ত্রী / প্রপৌত্রের স্ত্রী: মৃত ব্যক্তির বিধবা স্ত্রী অথবা তাঁর মৃত পুত্রের বিধবা স্ত্রী কিংবা মৃত প্রপৌত্রের বিধবা স্ত্রী সম্পত্তির জীবনস্বত্ব বা নির্দিষ্ট অধিকার পান।

কন্যা (Daughter): পুরুষ বংশধরদের অনুপস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির গর্ভজাত কন্যা উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হন।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কন্যার পুত্র / দৌহিত্র (Daughter's Son): কন্যার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির দৌহিত্র সপিণ্ড হিসেবে উত্তরাধিকারী হন।

পিতা (Father): প্রথম সারির নিম্নমুখী ওয়ারিশগণ অনুপস্থিত থাকলে মৃত ব্যক্তির পিতা উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বত্ব লাভ করেন।

মাতা (Mother): পিতার অবর্তমানে মৃত ব্যক্তির মাতা সপিণ্ড হিসেবে সম্পত্তি ভোগাধিকার প্রাপ্ত হন।

ভ্রাতা (Brother): পিতামাতা জীবিত না থাকলে মৃত ব্যক্তির ভাই বা ভ্রাতা উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হন।

সহোদর ভ্রাতা / বৈমাত্রেয় ভ্রাতা: উত্তরাধিকারের ক্রমে নিজের আপন সহোদর ভাই অথবা সৎ ভাই (বৈমাত্রেয় ভ্রাতা) পর্যায়ক্রমে স্থান পান।

ভ্রাতুষ্পুত্র / বৈমাত্রেয় ভ্রাতুষ্পুত্র: ভাইদের অবর্তমানে তাঁদের পুত্র অর্থাৎ ভ্রাতুষ্পুত্র বা বৈমাত্রেয় ভ্রাতুষ্পুত্র সপিণ্ডের তালিকাভুক্ত হন।

ভাগিনেয় / বোনের পুত্র (Sister's Son): ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রদের অনুপস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির বোনের পুত্র বা ভাগিনেয় উত্তরাধিকারী হন।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পিতামহ (Paternal Grandfather): নিকটবর্তী আত্মীযদের অবর্তমানে পিতৃকুলের উর্ধ্বতন পুরুষ হিসেবে ঠাকুরদা বা পিতামহ সম্পত্তিতে স্বত্ব পান।

পিতামহী (Paternal Grandmother): পিতামহের অবর্তমানে পিতৃকুলের উর্ধ্বতন নারী হিসেবে ঠাকুরমা বা পিতামহী উত্তরাধিকারী হন।

জ্যেষ্ঠ / খুড়ো (Paternal Uncle): পিতামহ ও পিতামহীর অবর্তমানে মৃত ব্যক্তির কাকা, জেঠা বা খুড়ো উত্তরাধিকার লাভ করেন।

জ্যেষ্ঠ / খুড়োর পুত্র: কাকা বা জেঠার অবর্তমানে তাঁদের পুত্রগণ (জ্যাঠাতো বা খুড়তুত ভাই) উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হন।

জ্যেষ্ঠ / খুড়োর পুত্রের পুত্র: জ্যাঠাতো বা খুড়তুত ভাইদের অবর্তমানে তাঁদের পরবর্তী পুরুষ বংশধরগণ এই তালিকায় যুক্ত হন।

পিসতুত ভ্রাতা (Father's Sister's Son): পিতৃকুলের উক্ত সদস্যদের অনুপস্থিতিতে পিসির পুত্র বা পিসতুত ভাই সপিণ্ড হিসেবে অধিকার পান।

প্রপিতামহ (Paternal Great-Grandfather): পিতৃকুলের আরও উর্ধ্বতন ধারায় মৃত ব্যক্তির প্রপিতামহ (দাদার পিতা) উত্তরাধিকারী হতে পারেন।

প্রপিতামহী (Paternal Great-Grandmother): প্রপিতামহের অবর্তমানে পিতৃকুলের উর্ধ্বতন নারী সদস্য হিসেবে প্রপিতামহী (দাদার মাতা) সপিণ্ডের শেষ কার্যকর ক্রমে স্থান পান।

নারী সপিণ্ডের অধিকার ও শর্ত সাপেক্ষে হস্তান্তর

উল্লেখিত ৫ জন নারী সপিণ্ড সম্পত্তির কেবল 'জীবনস্বত্ব' (ভোগাধিকার) পান, তবে স্বাভাবিক অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রি করতে পারেন না। নারী সপিণ্ডের মৃত্যুর পর সম্পত্তি মূল মালিকের প্রকৃত ওয়ারিশদের কাছে ফিরে যায়। তবে বিশেষ কিছু দরকারে তারা সীমিত সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন-

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মৃত ব্যক্তির দাহ ও শ্রাদ্ধের খরচ জোগাতে।

পরিবারের জীবনধারণ ও নাবালক সন্তানদের পড়াশোনার খরচে।

দূরের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব হলে বা আয় অপেক্ষা ব্যয় বেশি হলে।

প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে। তবে পারিবারিক সম্পদ প্রচুর থাকলে এসব অজুহাতেও স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করা অবৈধ সাব্যস্ত হবে।

উত্তরাধিকারের অন্যান্য শ্রেণী ও দায়ভাগের সাধারণ নিয়ম

সাকুল্য

এরা দ্বিতীয় শ্রেণীর দূরবর্তী ওয়ারিশ (সংখ্যায় ৩৩ জন)। পিতামহের ঊর্ধ্বতন তিন পুরুষের সদস্যগণ এর অন্তর্ভুক্ত।

সমানোদক

এরা তৃতীয় শ্রেণীর দূরবর্তী ওয়ারিশ (সংখ্যায় ১৪৭ জন)। ঊর্ধ্বতন ৭ পুরুষের সদস্যরা এর অন্তর্ভুক্ত। সপিণ্ড না থাকলে সাকুল্য এবং সাকুল্য না থাকলে সমানোদক সম্পত্তির দাবি করতে পারেন; তবে বাস্তবে এদের কার্যকারিতা নেই।

অন্যান্য বিশেষ নিয়মাবলী

যৌথ পরিবার ও হস্তান্তর: পিতার মৃত্যুর পর পুত্রগণ যৌথ পরিবার গঠন করতে পারেন এবং পরিবারের কর্তা প্রয়োজনে সম্পত্তি হস্তান্তর বা বন্ধক রাখতে পারেন। মালিকের মৃত্যুর মুহূর্ত থেকেই উত্তরাধিকার কার্যকর হয়; পরবর্তীতে কেউ জন্মাবে—এই আশায় তা স্থগিত রাখা যায় না।

অযোগ্যতা ও প্রতিবন্ধকতা: অন্ধ, বধির, মূক, অঙ্গহীন, পুরুষত্বহীন, কুষ্ঠরোগী বা হাবাগোবা ব্যক্তি এবং সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীরা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বৈধ সন্তানগণ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে না।

দত্তক গ্রহণ (Adoption): পিণ্ডদান বা বংশধারা রক্ষার জন্য কেবল সন্তানহীন বাবা-মা ৯ বছরের কম বয়সী পুত্রকে দত্তক নিতে পারেন। দত্তক পুত্র বাতিল করা যায় না এবং সে স্বাভাবিক পুত্রের ১/৩ অংশ সম্পত্তি পায় (তবে শূদ্রদের ক্ষেত্রে সমান অংশ পায়)।

দাসী পুত্র ও অন্যান্য: শূদ্র বর্ণের ক্ষেত্রে দাসীপুত্র পিতার ইচ্ছানুযায়ী অংশ পায় এবং বৈমাত্রেয় ভাইরা তা দিতে বাধ্য থাকে। গর্ভজাত দৌহিত্রগণ নানার ত্যাজ্য সম্পত্তি সরাসরি সমান অংশে পায়, যাকে মাথাপিছু উত্তরাধিকার (Succession per Capita) বলে। এছাড়া উত্তরাধিকারের কেবল সম্ভাবনাকে হস্তান্তরিত করা যায় না, একে সম্ভাব্য উত্তরাধিকার (Spes Succession) বলা হয়।

ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এই দায়ভাগ আইন প্রাচীনকাল থেকেই উভয় বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বণ্টন ও পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষায় মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। সময়ের সাথে সাথে কিছু সংস্কার ও আইনি জটিলতা তৈরি হলেও, শাস্ত্রীয় বিধানের এই প্রয়োগ আজও হিন্দু সমাজব্যবস্থায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সম্পাদনা ও পরিকল্পনা

এডভোকেট এম. এম. রহমান

বি.কম (অনার্স) এম কম, এল. এল. বি

জমি বা ভূমির পূর্ণাঙ্গ মাপজোখ ও ভাগবন্টন বিইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
জমি বা ভূমির পূর্ণাঙ্গ মাপজোখ ও ভাগবন্টন বিইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রচনায়

আনিছুর রহমান (এম. এ ঢাবি)