উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির মিউটেশন না করলে বড় ঝুঁকি

পৈতৃক বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমি কেবল নিজেদের দখলে রাখাই শেষ কথা নয়, সরকারি নথিতে সেই জমির মালিকানা নিজের নামে হালনাগাদ করা বা ‘মিউটেশন’ (নামজারি) করা অত্যন্ত জরুরি। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমি দীর্ঘদিন নামজারি না করে ফেলে রাখলে মালিকানা নিয়ে তৈরি হতে পারে চরম আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি।

ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, নামজারি না থাকা জমি নিয়ে পরবর্তীতে পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
এসব বিষয় নিয়ে ‘রেকর্ড সংশোধন মামলা ও খতিয়ানে ভুল সংশোধন পদ্ধতি’ শীর্ষক বইতে উল্লেখ করেছেন সাইফুল ইসলাম ফকির। বইটির প্রথম অধ্যায়ের ৬৩ ও ৬৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখক উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির মিউটেশন নিয়ে আলোচনা করেছেন।
মিউটেশন বা নামজারি না করার ঝুঁকি
আইন ও ভূমিনীতি অনুযায়ী, পুরোনো মালিকের (যেমন: বাবা বা পূর্বপুরুষ) নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম সরকারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াই হলো নামজারি বা ‘নাম খারিজ’। ভূমি অফিস থেকে মিউটেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমি নিয়ে একাধিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।
১. হস্তান্তরে বাধা: নামজারি না থাকলে ওই জমি অন্য কারও কাছে বিক্রি, দান বা হেবা করা সম্ভব নয়।
২. ঋণ গ্রহণে জটিলতা: উক্ত জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে কোনো প্রকার আর্থিক ঋণ গ্রহণ করা যায় না।
৩. মালিকানা হারানোর আশঙ্কা: দীর্ঘদিন সরকারি নথিতে নাম না থাকলে এবং খাজনা বকেয়া থাকলে ভূমি জালিয়াতি বা অবৈধ দখলের মাধ্যমে ওই জমির প্রকৃত মালিকানা হারানোর চরম ঝুঁকি থেকে যায়।
বণ্টননামা ছাড়াই নামজারির সুবিধা
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ওয়ারিশদের মধ্যে জমির আপস-বণ্টননামা (বাটোয়ারা) না থাকার কারণে এতদিন মিউটেশন আটকে থাকত। তবে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র জারি করেছে। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী:
বণ্টননামা ছাড়াই যৌথ নামজারি: যদি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমি এখনই আলাদা করে বন্টননামা করা না-ও থাকে, তবে বণ্টননামা দলিল ছাড়াই সব ওয়ারিশদের নামে যৌথভাবে নামজারি করা সম্ভব।
হিস্যা উল্লেখ: এই প্রক্রিয়ায় মৃত ব্যক্তির মোট জমির বিপরীতে সকল ওয়ারিশদের নিজ নিজ প্রাপ্য হিস্যা (অংশ) উল্লেখ করে সরকারি নথিতে বা খতিয়ানে যৌথভাবে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

নামজারির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
জমি নিজের দখলে রাখা এবং আইনগত বিরোধ মেটাতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিসে অনলাইন কিংবা অফলাইনে আবেদনের জন্য নিম্নলিখিত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হয়—
১. ওয়ারিশ সনদপত্র: স্থানভেদে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে সংগৃহীত বৈধ সনদ।
২. ছবি: আবেদনকারী এবং অন্যান্য সকল ওয়ারিশদের সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
৩. জাতীয় পরিচয়পত্র: সকল আবেদনকারী ও ওয়ারিশদের এনআইডি কার্ডের ফটোকপি।
৪. মূল দলিল ও খতিয়ান: পিতার (বা মূল মালিকের) নামে থাকা মূল দলিলের ফটোকপি এবং সর্বশেষ খতিয়ান ও তার সত্যায়িত (সার্টিফায়েড) কপি।
৫. বণ্টননামা দলিল (যদি থাকে): একাধিক ওয়ারিশ থাকলে এবং তারা পৃথক পৃথক খতিয়ান (জমাভাগ) করতে চাইলে তাদের নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামা জমা দিতে হবে।
৬. আবেদন ফি: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সর্বমোট আবেদন ফি মাত্র ১,১৭০ টাকা (যার মধ্যে রয়েছে ২০ টাকা কোর্ট ফি, ৫০ টাকা নোটিশ জারি ফি, ১,০০০ টাকা ডিসিআর/রেকর্ড সংশোধন ফি এবং ১০০ টাকা খতিয়ান ফি)।
আবেদন প্রক্রিয়া ও অনুমোদন
আবেদন দাখিলের পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ডাকবেন।
সবকিছু সঠিক ও আইনসম্মত থাকলে সাধারণত ২৮ দিনের মধ্যে নতুন খতিয়ান তৈরি বা অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সাথে একটি ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) রশিদ বা দাখিলা প্রদান করা হয়। জমি ও এলাকাভেদে বার্ষিক খাজনার পরিমাণ সাধারণত ২০০ থেকে ৫০০ টাকা (বা প্রযোজ্য হারে) হয়ে থাকে।
নিরাপদ ভূমির জন্য কর পরিশোধ
এসিল্যান্ড অফিস থেকে প্রাপ্ত খাজনার রশিদ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা স্থানীয় ভূমি অফিসে গিয়ে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করতে হবে। খাজনা পরিশোধের রশিদ এবং নিজস্ব নামে নামজারি সম্পন্ন থাকলে ওই সম্পত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ বৈধ ও নিরাপদ মালিকানায় স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে যে কোনো সময় জমি বিক্রি, হস্তান্তর বা মর্গেজ দেওয়া আইনগতভাবে সহজ হয়। তাই ঝুঁকি এড়াতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির মিউটেশন দ্রুত সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
লেখকের পরিচয়
সাইফুল ইসলাম ফকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি এলএলবি ও এলএলএম পাস করেন।




