logo

জমি ক্রয়-বিক্রয়ে মিউটেশন ও খাজনা দাখিলার গুরুত্ব

জমি ক্রয়-বিক্রয়ে মিউটেশন ও খাজনা দাখিলার গুরুত্ব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

জমির বেচাকেনায় আইনি জটিলতা এড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভূমি প্রশাসন ও সরকার নানা সময়ে নানা নিয়ম ও পরিপত্র জারি করেছে। বর্তমান যুগে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কেবল মৌখিক চুক্তি বা সাধারণ দলিলের ওপর নির্ভর করার কোনো সুযোগ নেই; বরং এর আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে হলে মিউটেশন বা নামজারি এবং হালনাগাদ খাজনা পরিশোধ থাকা অত্যন্ত জরুরি একটি শর্ত।

সাধারণ মানুষ ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের অজ্ঞতা কিংবা অসচেতনতার কারণে অনেক সময়ই তারা নানা ধরনের আইনি ঝামেলা বা হয়রানির শিকার হন। এই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে জমি রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত আইনি বিধান, নামজারি প্রক্রিয়া এবং সঠিক করণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

আপনি অর্থনৈতিক বা অন্য যেকোনো কারণেই জমি বিক্রি করতে চান না কেন, এর জন্য অবশ্যই ওই জমি আপনার নামে মিউটেশন এবং হালনাগাদ খাজনা পরিশোধ করা থাকতে হবে। অন্যথায় জমি বিক্রি করা যাবে না, আর বিক্রি করলেও তা আইনগতভাবে অবৈধ বলে গণ্য হবে। জমি বিক্রির পূর্ব প্রস্তুতি, মিউটেশন কেস ও খাজনা দাখিলা বিষয়ে আইনি বিধানগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির চতুর্থদশ অধ্যায়ের ৩৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়ে মিউটেশন ও খাজনা দাখিলার গুরুত্ব অপরিসীম’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ৫২(ক) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে—বিক্রয় দলিলে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য সন্নিবেশ করা না হলে নিবন্ধকারী কর্মকর্তা সেই জমি রেজিস্ট্রি করবেন না। আপনি যদি উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পেয়ে থাকেন, তবে ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০’-এর অধীন আপনার বা আপনার পূর্বসূরির নামে প্রস্তুতকৃত সর্বশেষ খতিয়ান লাগবে। উত্তরাধিকার ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সম্পত্তির মালিক হয়ে থাকলেও একই আইনের অধীন আপনার নামে প্রস্তুতকৃত সর্বশেষ খতিয়ান প্রয়োজন হবে। এছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারির পরিপত্র অনুযায়ী, খাজনা খারিজ বা নামজারি ছাড়া কোনো জমি, এমনকি আমমোক্তারনামা দলিলও রেজিস্ট্রি করা যাবে না।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ৫৩(সি) ধারায়ও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। নিজ নামে বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমির পূর্ববর্তী মালিকের নামে খতিয়ান না থাকলে সেই জমি বিক্রি করা সম্ভব নয়। অনেকেরই মিউটেশন বা নামজারি কেসের কপি হারিয়ে যায় বা খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো—প্রথমে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন দাখিল করা। এরপর তিনি বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন। যাচাই-বাছাই শেষে ডুপ্লিকেট পর্চা প্রস্তুত করে তা সরবরাহের নির্দেশ দেবেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। আবেদনপত্রের সঙ্গে অবশ্যই ২০ টাকার কোর্ট ফি সংযুক্ত করতে হবে। কোনো কারণে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এটি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে প্রতিকার চেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর নিকট আবেদন করা যেতে পারে।

অন্যদিকে, ক্রেতারা সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রেশন অফিসে তল্লাশি চালিয়ে সম্পত্তিটির পূর্ব ইতিহাস যাচাই করে নিতে পারেন। এর মাধ্যমে জানা সম্ভব জমিটি পূর্বে বিক্রি হয়েছে কি না, হলে কতবার, কার দ্বারা এবং বর্তমানে কার নামে রয়েছে। যেকোনো বছরের জন্য তল্লাশি করা গেলেও স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে অনধিক বারো বছরের তল্লাশি করা সবচেয়ে উত্তম।

জমির ক্রয়-বিক্রয় এবং আইনি মালিকানা হস্তান্তরে একটু অসচেতনতাই ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের আইনি জটিলতা। তাই যেকোনো লেনদেন বা রেজিস্ট্রি করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, মিউটেশন ও হালনাগাদ খাজনা দাখিলা নিশ্চিত করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল নিরাপদ ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।