জমির দলিল কত প্রকার ও কোন দলিলের রেজিস্ট্রি খরচ কত

স্থাবর সম্পত্তি বা জমি-জমা কেনাবেচা, দান কিংবা স্বত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি। আমাদের দেশে অগণিত মানুষ জমিজমা সংক্রান্ত সঠিক তথ্যের অভাব ও আইনি জটিলতার কারণে প্রতিনিয়ত নানা ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। জমি হস্তান্তরের প্রকৃতিভেদে দলিলের ধরণ ভিন্ন হয় এবং প্রতিটি দলিলের ক্ষেত্রে সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক, আয়কর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের সুনির্দিষ্ট হিসাব রয়েছে।
অনেক সময় সঠিক নিয়ম ও খরচের ধারণা না থাকায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অযাচিত বাড়তি টাকা গুনতে হয় কিংবা ভুল দলিলে সম্পত্তি হস্তান্তর করে ভবিষ্যতে আইনি বা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। আপনি কিভাবে নিজের বা পরিবারের সম্পত্তি হস্তান্তর করবেন, আইনগতভাবে কোনো দলিলের গুরুত্ব কতটুকু এবং রেজিস্ট্রি করতে কত টাকা খরচ হবে—সে সম্পর্কে স্পষ্ট ও সঠিক ধারণা রাখা প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। জমি হস্তান্তরের প্রধান প্রধান দলিলের প্রকারভেদ ও সেগুলোর সর্বশেষ সরকারি রেজিস্ট্রেশন খরচের বিস্তারিত তথ্য নিচে আলোচনা করা হলো।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির চতুর্থদশ অধ্যায়ের ৩৩০,৩৩১ ও ৩৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দলিলের প্রকারভেদ ও রেজিস্ট্রি খরচসমূহ’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সাফ কবলা বা বিক্রয় কবলা দলিল
অর্থের বিনিময়ে জমি বিক্রি করে রেজিস্ট্রি করে দিলে তাকে সাফ কবলা, বিক্রয় কবলা বা খরিদা কবলা দলিল বলা হয়। এক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে হাজির হয়ে বিক্রেতা দলিলে স্বাক্ষর করে ক্রেতাকে রেজিস্ট্রি বুঝিয়ে দেন। এই দলিলের রেজিস্ট্রি খরচ নির্ভর করে সম্পত্তির মূল্যমানের ওপর।
খরচের বিবরণ (১ লাখ টাকা মূল্যের গ্রামীণ জমির ক্ষেত্রে): রেজিস্ট্রেশন ফি ১% (১,০০০ টাকা), স্ট্যাম্প শুল্ক ১.৫% (১,৫০০ টাকা), স্থানীয় সরকার কর ৩% (৩,০০০ টাকা) এবং উৎসে আয়কর ১% (১,০০০ টাকা)। এছাড়া ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে হলফনামা, ১০০ টাকা ই-ফি, ১৬০ টাকা এন-ফি (লেখা খরচ), ২৪০ টাকা এনএন-ফি (নকলনবীশদের ফি) এবং ১০ টাকা কোর্ট ফি। অর্থাৎ ১ লাখ টাকার জমির জন্য সর্বমোট খরচ ৭,২১০ টাকা।
নিয়ম: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ (বর্তমানে আয়কর আইন) অনুযায়ী যেকোনো ধরনের আয়কর বা ভ্যাট প্রদান করবেন বিক্রেতা, আর বাকি খরচ বহন করবেন ক্রেতা।
দানপত্র দলিল
সম্পত্তির মালিক কোনো শর্ত বা বিনিময় ছাড়া যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সম্পত্তি দান করলে তাকে দানপত্র দলিল বলে। যেমন— রহিম সাহেব তার সম্পত্তির ১০ শতাংশ ধর্মীয় বা পুণ্যির কাজে মসজিদের নামে দান করলেন।
খরচের বিবরণ (৩ লাখ টাকা মূল্যের জমির ক্ষেত্রে): রেজিস্ট্রেশন ফি ২% (৬,০০০ টাকা), স্ট্যাম্প শুল্ক ৩% (৯,০০০ টাকা), স্থানীয় সরকার কর ৩% (৯,০০০ টাকা)। এর সাথে হলফনামা স্ট্যাম্প ২০০ টাকা, ই-ফি ১০০ টাকা, এন-ফি ১৬০ টাকা, এনএন-ফি ২৪০ টাকা এবং কোর্ট ফি ১০ টাকা। সব মিলিয়ে মোট খরচ প্রায় ২৪,৯১০ টাকা।
হেবা দলিল
নিকটাত্মীয়দের (যেমন: বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী, দাদা-দাদি, নানা-নানি, নাতি-নাতনি) মধ্যে কোনো বিনিময় ছাড়া ভালোবেসে বা সন্তুষ্ট হয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর করা হলে তা হেবা দলিল নামে পরিচিত।
রেজিস্ট্রি খরচ: রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৭৮ ই (বি) ধারা অনুযায়ী এর রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ১০০ টাকা। সাথে স্ট্যাম্প শুল্ক ২০০ টাকা, ২০০ টাকার হলফনামা স্ট্যাম্প, ই-ফি ১০০ টাকা, নিয়ম অনুযায়ী এন-ফি ও এনএন-ফি এবং ১০ টাকার কোর্ট ফি প্রযোজ্য।
হেবা বিল এওয়াজ দলিল
মুসলিম পারিবারিক আইনে কোনো কিছুর বিনিময়ে (যেমন— পবিত্র কুরআন, জায়নামাজ, তসবিহ বা মোহরানার টাকা) সন্তুষ্ট হয়ে দান করা হলে তাকে হেবা বিল এওয়াজ দলিল বলা হয়। যেমন— রহিম সাহেব তার স্ত্রীকে মোহরানার বিনিময়ে ১০ শতাংশ জমি লিখে দিলেন। এর রেজিস্ট্রি খরচ সাধারণ হেবা দলিলের মতোই।

এওয়াজ বা বিনিময় দলিল
দুই ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে স্থাবর সম্পত্তি অদল-বদল করলে তাকে এওয়াজ, বিনিময় বা বদল দলিল বলা হয়।
রেজিস্ট্রি খরচ: দলিলে উল্লিখিত মোট মূল্যের ২% রেজিস্ট্রেশন ফি, ৩% স্ট্যাম্প শুল্ক, স্থানভেদে স্থানীয় সরকার কর ২% বা ৩% এবং পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় উৎসে কর ১% থেকে ৩% পর্যন্ত হতে পারে।
বণ্টননামা দলিল
সহ-শরিক বা হকদারদের মধ্যে প্রাপ্ত সম্পত্তি নিজ নিজ নামে ভাগ করে নেওয়ার জন্য যে দলিল করা হয়, তাকে বণ্টননামা দলিল বলে। রেজিস্ট্রি অফিসের নির্ধারিত ‘মৌজা রেট’ অনুযায়ী দলিলে সবার অংশের দাম উল্লেখ করে সেটির ওপর ভিত্তি করে নিয়ম অনুযায়ী ফি পরিশোধ করতে হয়।
উইল ও অছিয়ত দলিল
হিন্দু ধর্মে নিজ সম্পত্তি ইচ্ছানুযায়ী কাউকে দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাকে উইল বলে। একজন ব্যক্তি একাধিক উইল করলে সর্বশেষটি কার্যকর হবে। মুসলিম ধর্মে এ জাতীয় দলিলকে অছিয়ত বলা হয় (যেখানে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি অছিয়ত করা যায়)।
রেজিস্ট্রি খরচ: রেজিস্ট্রেশন ফি ২০০ টাকা, ২০০ টাকার হলফনামা স্ট্যাম্প, ১০০ টাকা ই-ফি এবং নির্ধারিত এন-ফি ও এনএন-ফি। এতে স্ট্যাম্প শুল্ক প্রযোজ্য নয়।
না-দাবি বা মুক্তিপত্র দলিল
কোনো সম্পত্তিতে অধিকার না থাকলে বা অধিকার থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করার মর্মে যে দলিল সম্পাদন করা হয়, তাকে না-দাবি বা মুক্তিপত্র দলিল বলা হয়।
রেজিস্ট্রি খরচ: মোট মূল্যের ২% ফি পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। দাবি বা সম্পত্তির মূল্য ২,০০০ টাকার বেশি হলে ২০০ টাকার স্ট্যাম্প, অন্যথায় ৫০ টাকার স্ট্যাম্পসহ নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় কর ও ফি দিতে হবে।
বায়নাপত্র ও আদালতযোগে সাফ কবলা দলিল
সম্পত্তি বিক্রির প্রাথমিক চুক্তিপত্রকে বায়নাপত্র দলিল বলে।
বায়না দলিলের খরচ: সম্পত্তির মূল্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে ফি ৫০০ টাকা; ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে ১,০২০ টাকা; এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ২,০০০ টাকা। সাথে স্ট্যাম্প শুল্ক ৩০০ টাকা।
আদালতযোগে সাফ কবলা: বায়না করার পর বিক্রেতা দলিল না করে দিলে বা মারা গেলে (যেমন— রহিম মিয়ার মৃত্যুর পর খালেক মিয়া) আদালতের শরণাপন্ন হয়ে আদালত কর্তৃক স্বাক্ষর ও রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়া যায়, একে আদালতযোগে সাফ কবলা দলিল বলে।
আদালত সম্পর্কিত অন্যান্য দলিল
দখলনামা দলিল: আদালত কর্তৃক জারিকৃত দখলসংক্রান্ত নথি।
রায় ও ডিক্রি দলিল: আরজি, জবাব ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক লিখিত যে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন তা রায় দলিল এবং তদানুযায়ী জারিকৃত আদেশ ডিক্রি দলিল।
বেনামী দলিল: আইনি বা ব্যক্তিগত কারণে নিজ নামে না কিনে অন্য বিশ্বাসী ব্যক্তি বা আত্মীয়ের নামে জমি ক্রয় বা হস্তান্তর করলে তা বেনামী দলিল বলে।
বন্ধকী ও অন্যান্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সম্পত্তি বন্ধক রেখে যে দলিল হয় তা বন্ধকী দলিল। এছাড়া বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি রহিতকরণ পত্র, ভ্রম সংশোধন, বহালকরণ, ওয়াকফনামা, পুনঃসমর্পণ এবং ট্রাস্টনামা দলিল উল্লেখযোগ্য।
ট্রাস্টনামা দলিলের খরচ: সম্পত্তির মান ৪,০০০ টাকার বেশি হলে ২,৫০০ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। এতে স্ট্যাম্প শুল্ক মওকুফ থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য কর ও ফি দিতে হয়।
জমি কেনাবেচা কিংবা হস্তান্তরের পূর্বে দলিলের ধরণ এবং সরকারি ফি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক নিয়মে দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি না করলে পরবর্তীতে আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে পারে। তাই যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় সরকারের নির্ধারিত আইন ও নির্দেশিকা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।