logo

মূল দলিল হারিয়ে গেলে কী করবেন, মালিকানা রক্ষায় যা জানা জরুরি

মূল দলিল হারিয়ে গেলে কী করবেন, মালিকানা রক্ষায় যা জানা জরুরি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশে ভূমিসংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও বিরোধ বাস্তবেই নিত্যদিনের ঘটনা। সঠিক দিকনির্দেশনা ও আইনি তথ্যের অভাবে জমি কিনেও কিংবা মূল দলিল হারিয়ে অনেক মালিকই চরম ভোগান্তির শিকার হন রোজ।

খতিয়ান বা দলিলে উল্লিখিত জমির পরিমাণের সাথে বাস্তব দখলের অমিল এবং বালাম বই বিনষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজের মালিকানা রক্ষা রাখবেন, তা জানা জরুরি। আজকের এই প্রতিবেদনে জমি কেনাবেচা, নামজারি এবং দলিল হারালে তার আইনি সমাধান তুলে ধরা হলো।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ঊনবিংশ অধ্যায়ের ৩৯৬, ৩৯৭ ও ৩৯৮ পৃষ্ঠায় তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

দাগে দাগে জমি ক্রয় এবং নামজারির আইনি নিয়ম

কোনো ক্রেতা একাধিক দাগ থেকে জমি ক্রয় করলেও অনেক সময় দেখা যায় তিনি বাস্তব সুবিধার্থে একটি নির্দিষ্ট দাগেই ভোগদখলে থাকেন। তবে আইনের দৃষ্টিতে প্রতিটি দাগের জন্য আলাদাভাবে নামজারি করা বাধ্যতামূলক।

নামজারির বাধ্যবাধকতা: দলিলে পৃথক পৃথক দাগের কথা উল্লেখ থাকলে নামজারিও প্রতিটি দাগ অনুযায়ী পৃথকভাবে করতে হবে। সব অংশ মিলিয়ে একটিমাত্র দাগে নামজারি করা আইনসম্মত নয়।

দখল ও আইনি ঝুঁকি: ক্রেতা সুবিধাজনক একটি দাগে পুরোপুরি অবস্থান করলেও, আইনগত নামজারি দাগভিত্তিক না হলে ভবিষ্যতে তা বাতিলের ঝুঁকিতে থাকে এবং আদালতে অবৈধ প্রমাণিত হতে পারে।

শরিকি বিরোধের আশঙ্কা: বিক্রেতার অংশ সীমিত থাকা সত্ত্বেও যদি দলিলে অতিরিক্ত জমি দেখানো হয়, তবে শরিক বা বঞ্চিত ওয়ারিশদের করা মামলায় দলিল ও নামজারি দুটোই বাতিল হতে পারে।

আইনি সমাধান: বাস্তবে এক দাগে জমি ব্যবহারের জন্য অন্য শরিকদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এওয়াজ বদল’ (বিনিময় দলিল) করে তা রেজিস্ট্রি করে নিতে হবে। এতে করে দখলের আইনি ভিত্তি তৈরি হয় এবং বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো যায়।

আপোষ বণ্টননামা ও যৌথ সম্পত্তির সুরক্ষা

ওয়ারিশি বা যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে কেবল ওয়ারিশান সনদের ওপর নির্ভর করে নামজারি করা ঝুঁকিপূর্ণ।

বণ্টননামার গুরুত্ব: সহশরিকদের সর্বসম্মত সম্মতিতে ‘আপোষ বণ্টননামা’ দলিল রেজিস্ট্রি করা অত্যন্ত জরুরি।

নির্দিষ্ট দাগের সুবিধা: আপোষ বণ্টননামার মাধ্যমে যার যার নির্দিষ্ট অংশ ও দাগ নির্ধারিত হলে, ভূমির মালিক সেই অংশ থেকেই নামজারি ও ক্রয়-বিক্রয়সহ সব ধরনের আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।

সরকারি নির্দেশনা: ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনানুসারে, আপোষ বণ্টননামা ছাড়া একক দাগ থেকে অংশবিশেষ বিক্রি করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

মূল দলিল হারিয়ে গেলে করণীয়

প্রয়োজনীয় দলিল হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।

জিডি ও বিজ্ঞপ্তি: নিকটস্থ থানায় দলিলের বিবরণসহ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে এবং স্থানীয় বা জাতীয় পত্রিকায় ‘হারানো বিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করতে হবে।

সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ: সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করে দলিলের নকল বা সার্টিফাইড কপি উত্তোলন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী ফি প্রদান করে এই কপি নেওয়া যায়, যা মূল দলিলের মতোই সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হয়।

সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ: অপব্যবহার রোধে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘দলিল স্থগিতকরণ’-এর লিখিত আবেদন দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রয়োজনে আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মামলা (টাইটেল স্যুট) করে নতুন মালিকানা দলিল নেওয়া যায়।

বালাম বই ধ্বংস হলে আইনি প্রতিকার

হঠাৎ অগ্নিকাণ্ড বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বই (ভলিউম) নষ্ট হলেও মালিকানা পুরোপুরি হারায় না।

সূচিপত্র ও বিকল্প রেকর্ড: বালাম বই নষ্ট হলেও এসিল্যান্ড অফিস থেকে নামজারির রেকর্ড কিংবা ইনডেক্স/সূচিপত্র থেকে দাতা-গ্রহীতার নাম ও দাগ নম্বর সংগ্রহ করা সম্ভব।

আদালতের অবস্থান: উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নামজারি, খাজনা রসিদ ও দখল স্বপক্ষে থাকলে কেবল দলিলের অভাবে মালিকানা নষ্ট হয় না।

গেজেট ও হলফনামা: সরকার সাধারণত গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নষ্ট হওয়া দলিলের তালিকাভুক্তির সুযোগ দেয়। এছাড়া ফার্স্ট ক্লাসে ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বালাম বই ধ্বংসের প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে রাখলে তা ভবিষ্যতের আইনি লড়াইয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

জমিসংক্রান্ত বিষয়ে সামান্য অবহেলা পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই জমি কেনাবেচা, বণ্টন কিংবা দলিল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আবেগ বা শিথিলতার সুযোগ না দিয়ে শুরু থেকেই যথাযথ আইনি পথ অনুসরণ করা উচিত। প্রতিটি পদক্ষেপে সঠিক দলিলপত্র প্রস্তুত ও সরকারি বিধিবিধান মেনে চললে ভূসম্পত্তির স্বত্ব ও ভোগদখল চিরতরে নিরাপদ রাখা সম্ভব।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।