logo
Advertisement

জমির অগ্রক্রয় মামলায় আইনি জটিলতা ও হাইকোর্টের নির্দেশনা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমির অগ্রক্রয় মামলায় আইনি জটিলতা ও হাইকোর্টের নির্দেশনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর জীবনের জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রিয়েমশন বা অগ্রক্রয় মামলা। শরিক বা প্রতিবেশীর অজান্তে জমি বিক্রির পর সেই জমি পুনরুদ্ধারে আইনি অধিকার প্রয়োগই হলো প্রিয়েমশন। তবে জমিটি 'কৃষি' নাকি 'অকৃষি'—এই পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে মামলার নিয়ম ও ধারায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন এবং ১৯৪৯ সালের অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইনের বিভিন্ন জটিল ধারা ও উচ্চ আদালতের নজিরভিত্তিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে অগ্রক্রয় মামলার সঠিক রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে অগ্রক্রয় মামলার আইনি বিধান প্রধানত দুটি আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। যথা- ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬ ধারা এবং ১৯৪৯ সালের অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইনের ২৪ ধারা। ২০০৬ সালে ৯৬ ধারায় সংশোধনী আনার ফলে কৃষি জমির ক্ষেত্রে অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের সুযোগ আগের চেয়ে অনেক সংকুচিত হয়েছে। তবে অকৃষি জমির ক্ষেত্রে ২৪ ধারার প্রয়োগ ও বিধান এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ২৬৮ ও ২৬৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘প্রিয়েমশন মামলায় আইনের কিছু মারপ্যাচ ও প্রাসঙ্গিকতা’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আইনগত দিক থেকে ৯৬ ধারা কৃষি জমির জন্য এবং ২৪ ধারা অকৃষি জমির জন্য প্রযোজ্য। ১৯৪৯ সালের অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইনের ২(৪) ধারায় অকৃষি জমির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কৃষি বা বাগানের সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং অকৃষি উদ্দেশ্যে ইজারা সূত্রে দখলে রাখা জমিই অকৃষি জমি। তবে এর কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন—জমিদারের সম্মতি ছাড়া ১২ বছরের কম সময় কৃষি বা বাগানে ব্যবহৃত জমি কিংবা চা বাগানকে অকৃষি বলা যাবে না। অন্যদিকে, জমিদারের অনুমতি নিয়ে ১২ বছরের বেশি সময় ধরে অকৃষি কাজে ব্যবহৃত হলে তবেই তা অকৃষি জমি হিসেবে গণ্য হবে।

আইনে 'বাস্তুভিটা' বলতে বসবাসের ঘরের নিচের মাটি এবং তৎসংলগ্ন উঠান, বাগান, পুকুর, প্রার্থনালয় বা পারিবারিক কবরস্থানকে বোঝানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ১৯৫০ সালের আইনে কৃষি জমির পরিধি বেশ ব্যাপক।


সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত

২০০৯ সালে প্রকাশিত আব্দুল মজিদ প্রামাণিক বনাম মো. সোহরাব আলী ও অন্যান্য (১৬ এমএলআর এডি ১-৪) ঐতিহাসিক মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেন যে, গ্রামে অকৃষি জমি হস্তান্তর নিয়ে অগ্রক্রয় মামলা হলে আদালত মূল প্রজাস্বত্বের উদ্দেশ্য পরীক্ষা করবেন। যদি প্রমাণিত হয় যে প্রজাস্বত্ব মূলত অকৃষি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, তবেই ২৪ ধারা প্রযোজ্য হবে। তবে কোনো অকৃষি জমি যদি মূল কৃষি জোতের অংশ হয়, তবে সেখানে ২৪ ধারায় মামলা চলবে না।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অপর এক মামলায় (আব্দুল খালেক বনাম আব্দুল নুর ও অন্যান্য, ২৫ বিসিআর এডি ২২২-২২৪) আপিল বিভাগ উল্লেখ করেন, বাস্তুবাড়ির সঙ্গে যুক্ত কৃষি প্রজার কৃষি জোতকে অকৃষি বলা যাবে না। জমি হস্তান্তরের সময় বন্দোবস্তের মূল শর্ত কী ছিল, তা বিবেচনা করেই জমিটি কৃষি নাকি অকৃষি—সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

হাইকোর্ট বিভাগের রায় ও স্ট্যান্ডার্ড বিঘার নিয়ম:আবুল কাশেম গাজী ও অন্যান্য বনাম শেখ নজরুল ইসলাম (২২ বিএলডি, হাইকোর্ট বিভাগ, পৃ. ২৪৪-২৪৯) মামলায় বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ১৯৯২ সালের একটি দলিলের প্রেক্ষাপটে রায় দেন। এতে দেখা যায়, জমি কেনার আগে সেখানে বাড়িঘর ছিল—ক্রেতা বা তার পক্ষ তা প্রমাণ করতে পারেননি; বরং কেনার পরই তারা ঘরবাড়ি তোলেন। এছাড়া ১৯৮৪ সালের আইনি বিধান অনুযায়ী, কোনো বাস্তুবাড়ির আয়তন ১ স্ট্যান্ডার্ড বিঘার বেশি হলে অতিরিক্ত অংশ বাস্তুবাড়ি হিসেবে গণ্য হবে না। এই নীতি প্রয়োগ করে আদালত অগ্রক্রয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন।

জমি কেনাবেচায় প্রিয়েমশন আইনের সঠিক ধারণা না থাকলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। উচ্চ আদালতের রায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলার সফলতা নির্ভর করে জমির প্রাথমিক ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং প্রামাণ্য দলিলের ওপর। সঠিক আইনি প্রক্রিয়া ও নজির অনুসরণ করলে জমি সংক্রান্ত অযথা হয়রানি ও মামলা-মোকদ্দমা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।