অন্যের জমি দখল করলেই মালিকানা নয়, জানুন আইনি প্রতিকার

জমিজমা বা স্থাবর সম্পত্তি জবরদখল আমাদের সমাজের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। বহু বছর ধরে চলে আসা ভ্রান্ত ধারণা ছিল—অন্যের জমি দীর্ঘ দিন দখলে রাখলেই বুঝি তার ওপর আইনগত মালিকানা তৈরি হয়ে যায়। তবে বর্তমান আইনি কাঠামো ও প্রস্তাবিত সংস্কারে ভূমিখেকোদের এই অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার জোরদার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিজের কষ্টার্জিত জমি বা বাড়ি বেদখল হয়ে গেলে কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় তা উদ্ধার করবেন এবং প্রচলিত আইনে কী কী প্রতিকার রয়েছে, তা জানা প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির নবম অধ্যায়ের ২৫৬ ও ২৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘অন্যের জমি জোর করে দখল নিলেই মালিকানা নয়!’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

একজনের নামে থাকা জমি ১২ বছর ধরে অন্যজনের ভোগদখলে থাকলেই সেই জমি তার হয়ে যাবে—এমন পুরাতন আইন পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। দখলদার যাতে জমির মালিক না হয়ে যায়, সেজন্য 'ভূমির ব্যবহারস্বত্ব গ্রহণ আইন, ২০২০' নামে একটি নতুন আইন চালুর পথে রয়েছে। সেই সাথে সরকারি জমি অবৈধ দখলকে দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
একজনের জমি আরেকজন জোরজবরদস্তি করে দখল করে রাখা সম্পূর্ণ অন্যায় ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। তবে জোর করে ১২ বছরের অধিককাল দখলদার ব্যক্তি বড় জোর প্রতিকূল দখলের দাবিতে মামলা করতে পারেন, কিন্তু জমির স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।
অনেক সময় নিজের জমি বা বাড়ি দেখাশোনা করার জন্য আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সুযোগে অনেকে জমি বা বাড়ি নিজের বলে দাবি করে কিংবা গায়ের জোরে দখল করে নিতে চায়। এমনকি কিছু অংশ দখলও করে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে জমি বা বাড়ি ফেরত পাওয়া যাবে এবং আইনি নিয়মাবলি কী, তা জানা প্রয়োজন।
দেশে জমির ভোগদখল সংক্রান্ত যে আইনটি রয়েছে, তা ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৫ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অনেক আইনের পরিবর্তন হলেও এ আইন আগের মতোই রয়ে গেছে। এতে কারও জমি অন্যজন ১২ বছর ভোগদখল করলে সেই জমির মালিকানা পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু 'ভূমির ব্যবহারস্বত্ব গ্রহণ আইন, ২০২০' পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে ভূমিখেকোরা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চলেছে।
বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যাক- ধরুন, করিম সাহেব ঢাকায় চাকরি করেন এবং কুষ্টিয়ায় তার একটি বাড়ি রয়েছে। তিনি তার পরিচিত সুজনকে সেই বাড়িতে থাকার সুযোগ দিলেন। প্রায় ১৩ বছর ধরে সুজন ওই বাড়িতে বসবাস করছে এবং এলাকার লোকজনও মনে করে এটি সুজনের বাড়ি। এখন করিম সাহেব চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গ্রামে এসে নিজের বাড়িতে থাকতে চান। তবে তিনি আইনত সুজনকে গায়ের জোরে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারবেন না। সুজন স্বেচ্ছায় না যেতে চাইলে করিম সাহেবকে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে তাকে বেদখল করতে হবে। অন্যদিকে করিম সাহেব যদি তাকে জোর করে বের করে দেন, তবে সুজন দেওয়ানি আদালতে মামলা করে তার দখল বজায় রাখতে পারবে। এই ক্ষেত্রে দখলকারীর স্বত্ব বিবাদীর স্বত্বের চেয়ে ভালো কি না কিংবা বিবাদীর কোনো স্বত্ব আছে কি না—তা দেখার প্রয়োজন হয় না। আদালত এখানে স্বত্বের বিষয় বিবেচনা না করে শুধু দখলের বিষয় বিবেচনা করেন। তবে নতুন ভূমি ব্যবহারস্বত্ব গ্রহণ আইন চালু হলে এই সুযোগ আর থাকবে না।

আমাদের 'ভূমি সংক্রান্ত ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের ২৮ ধারা' অনুযায়ী যদি কেউ বিনা বাধায় কারও জমি একাধারে ১২ বছর দখলে রাখতে পারে বা ভোগদখল করে রাখতে পারে, তবে তিনি ভূমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করতে পারেন। দখলদার যদি আদালতে বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেন, তবে তিনি ওই জমির মালিকানা পেতে পারেন। সে কারণে দখলদার ও ভূমির মালিকের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এ আইনটি প্রশংসা দাবিদার। উচ্চ আদালতও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, অবৈধ দখলদার জমিতে মূল মালিকের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার অধিকারী নয় (৬০ ডিএলআর, ৯)।
জমি থেকে অবৈধভাবে দখলচ্যুত হলে দখল পুনরুদ্ধারের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নিতে হয়:
৮ ধারা: দখলচ্যুত ব্যক্তিকে ওই জমিতে তার স্বত্ব বা মালিকানা আছে বলে প্রমাণ দিতে হয়; নইলে এ ধারা অনুযায়ী প্রতিকার পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ এ ধারায় প্রতিকার চাইতে হলে জমির স্বত্বসহ দখল ফিরে পাওয়ার দাবি করতে হবে। বেদখল হওয়ার পর থেকে ১২ বছরের মধ্যে এই মামলা দায়ের করতে হয়।
৯ ধারা: এই ধারায় প্রতিকার পেতে হলে বাদী শুধু তিনি দখলচ্যুত হয়েছেন—এই মর্মে প্রতিকার চাইতে পারেন; স্বত্ব বা মালিকানা প্রমাণের দরকার নেই। কারণ জমিতে যার স্বত্ব রয়েছে, মাননীয় আদালত দখল তার বলেই অনুমান করবেন। তবে অবৈধ দখলদারের ক্ষেত্রে অনুরূপ অনুমানের অবকাশ নেই (৩৬ ডিএলআর, ২৬৮)। তবে সরকারের বিরুদ্ধে ৯ ধারায় মোকদ্দমা দায়ের করা যায় না।
৯ ধারায় মামলার ক্ষেত্রে আদালত কয়েকটি দিক বিবেচনা করেন— বাদী জমিটি দখল করে আসছিলেন কি না, বিবাদী তাকে জোরপূর্বক বেদখল করেছেন কি না এবং বিবাদী বেআইনিভাবে জমিতে প্রবেশ করেছেন কি না।

এসব প্রতিকারের ক্ষেত্রে জমির মূল্যমানের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট এখতিয়ারাধীন আদালতে মামলা করতে হয় এবং মূল্য অনুপাতে কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। ৯ ধারায় মোকদ্দমার ক্ষেত্রে মূল্য অনুপাতে কোর্ট ফির (অ্যাড-ভ্যালোরেম) অর্ধেক জমা দিতে হয়।
উচ্চ আদালত বলেছেন, বেআইনিভাবে সদ্য দখলচ্যুত ব্যক্তি উক্ত দখল পুনরুদ্ধারের জন্য ৯ ধারায় মোকদ্দমায় ডিগ্রিপ্রাপ্ত হয়ে ডিগ্রি জারিতে নালিশি জমিতে দখল নিতে পারেন। প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনক্রমেই ডিগ্রি জারিতে বাধা দেওয়ার জন্য নিষেধাজ্ঞার দাবি করতে পারে না (৪০ ডিএলআর (এডি), ২৫১)।
আইনি সচেতনতা ও সঠিক সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণই পারে নিজের স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা সুরক্ষিত রাখতে। জমি জমা সংক্রান্ত বিরোধে আইনি সময়সীমা ও আদালতের সঠিক ধারার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভূঁইফোড় বা অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নিজ সম্পত্তি রক্ষা করতে আইনগত অধিকার সম্পর্কে জানুন এবং প্রয়োজনে কালক্ষেপণ না করে বিজ্ঞ আদালতের শরণাপন্ন হন।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।

