সম্পত্তি হস্তান্তর আইন: দান ও হেবার নিয়মকানুন এবং আইনি অধিকার

নিজের নামে থাকা জমি বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আইনগত সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণে অনেকেই প্রিয়জনকে সম্পত্তি দান করতে গিয়ে কিংবা ইসলামী আইন মেনে হেবা করতে গিয়ে নানা জটিলতার সম্মুখীন হন। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন অনুযায়ী কীভাবে দান বা হেবা করবেন, রেজিস্ট্রেশন ফি কেমন হবে এবং কখন এটি বাতিল হতে পারে—তা নিয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো। দান কী ও কীভাবে করতে হয়?
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিনিময় মূল্য বা প্রতিদান গ্রহণ না করে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় নিজের মালিকানাধীন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে হস্তান্তর করেন এবং সেই ব্যক্তি বা তার প্রতিনিধি তা গ্রহণ করেন, তবে তাকে ‘দান’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় যিনি জমি দেন তিনি ‘দাতা’ এবং যিনি গ্রহণ করেন তিনি ‘দানগ্রহীতা’। দান কার্যকর হতে হলে দাতার জীবদ্দশায় এবং তার দান করার পূর্ণ সক্ষমতা থাকা অবস্থায় তা সম্পন্ন করতে হবে। দান গ্রহণের আগে দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে সেই দান বাতিল বলে গণ্য হবে। আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে দানপত্রটি ১২২ ধারা অনুযায়ী অবশ্যই নিবন্ধিত (রেজিস্ট্রি) হতে হবে।
দান সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি আইনি প্রক্রিয়া। যেকোনো ধর্মের মানুষ যেকোনো ব্যক্তির অনুকূলে তার সমস্ত সম্পত্তি দান করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী একমাত্র কন্যা থাকলে সে মোট সম্পত্তির অর্ধেক পায় এবং বাকি অর্ধেক পায় অন্যান্য নিকটাত্মীয়রা। কিন্তু কোনো পিতা চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় তার সমস্ত জমি কন্যাকে দান করে যেতে পারেন।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ৩১৬ ও ৩১৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দান, হেবা, উইল, অছিয়ত সম্পর্কিত: দান কেন, কখন, কিভাবে?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
হেবা কী এবং দানের সঙ্গে এর পার্থক্য
হেবা হলো ইসলামী আইন অনুযায়ী কেবল একজন মুসলিম ব্যক্তির দ্বারা সম্পত্তি হস্তান্তরের বিশেষ বিধান। যদিও এটি এক প্রকার দান, তবুও প্রচলিত সাধারণ দানের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। হেবার ক্ষেত্রেও মৌখিক ঘোষণার পর তা আইনিভাবে নিবন্ধিত না করলে বৈধতা পায় না। ওছিয়তের ক্ষেত্রে তিন ভাগের এক ভাগের বেশি সম্পত্তি প্রদান করা না গেলেও, হেবার ক্ষেত্রে মালিক তার সম্পূর্ণ সম্পত্তি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে (যেমন: স্কুল, কলেজ, মসজিদ বা মাদ্রাসা) হস্তান্তর করতে পারেন। স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে হেবা সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে তা আর ফেরত নেওয়া যায় না। জমি ছাড়াও অন্যান্য মূল্যবান বস্তু বা অর্থ হেবা হিসেবে দেওয়া সম্ভব।
হেবা রেজিস্ট্রেশন ফি
নিকটাত্মীয় যেমন—দাদা-দাদি, নানা-নানি, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, আপন ভাই-বোন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হেবা সম্পাদনে প্রতিটি দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ১০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়দের বাইরে অন্য কাউকে হেবা করতে হলে সাধারণ হারের সম্পূর্ণ রেজিস্ট্রেশন ফি প্রদান করতে হয়, যা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে।
দান বাতিল করার নিয়ম
একবার দলিল সম্পাদন ও সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়ার পর আদালতের ডিগ্রি (আদেশ) ছাড়া সাধারণ দান বাতিল করা যায় না। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে দলিল সম্পাদিত হলেও সম্পত্তি চূড়ান্ত হস্তান্তর না হলে তা বাতিল করার অবকাশ থাকে। যেমন—স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দান, দানগ্রহীতা আগে মারা গেলে, দাতা পরবর্তীতে কোনো প্রতিদান গ্রহণ করলে কিংবা সম্পত্তি সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেলে আইনি ধারায় তা বাতিল হতে পারে।
সম্পত্তি দান বা হেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনি নিয়ম মেনে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। সঠিকভাবে দলিল রেজিস্ট্রি ও শর্তাবলি না মানলে ভবিষ্যতে তা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য জেনে এবং অভিজ্ঞ আইনি পরামর্শকের সহায়তা নিয়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই শ্রেয়।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।

