logo
Advertisement

স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হলে আইনিভাবে জমি উদ্ধার করার নিয়ম

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হলে আইনিভাবে জমি উদ্ধার করার নিয়ম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

নিজের কষ্টার্জিত স্থাবর সম্পত্তি বা জমিজমা হঠাৎ করে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া কিংবা প্রভাবশালী কারও জবরদখলে চলে যাওয়া আমাদের সমাজে একটি অতি পরিচিত চিত্র। এমন পরিস্থিতিতে অনেক মালিকই দিকবিদিক হারিয়ে ফেলেন এবং সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার অভাবে নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তবে আইন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে জবরদখলকারীকে আইনি পথেই উচ্ছেদ করে নিজের সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বেদখল হওয়া সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার উপায়, আইনি সময়সীমা ও মামলা দায়েরের নানা দিক নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

স্থাবর সম্পত্তি থেকে জোরপূর্বক বেদখল বা জবরদখলের শিকার হলে আইনের মাধ্যমে কীভাবে সেই জমি বা সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করবেন, মামলা দায়েরের নিয়মাবলি কী, কত দিনের মধ্যে কোথায় যেতে হবে - এসব বিষয়ে স্পষ্ট আইনি দিকনির্দেশনা রয়েছে।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির নবম অধ্যায়ের ২৫৪ ও ২৫৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘স্থাবর সম্পত্তি থেকে জোরপূর্বক বেদখল হলে কি করবেন?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমির ওপর যার দখল রয়েছে, তিনিই দখলে থাকবেন - এটিই সাধারণ নীতি। তবে কেউ যদি অন্যায় ও বেআইনিভাবে বেদখল হন, তবে সেই দখলদারকে জমি থেকে সমূলে উচ্ছেদ করে নিজের জমি ফেরত পেতে ‘খাস দখলের’ মামলা করতে হয়। এই মামলাটি জমি বেদখল হওয়ার তারিখ থেকে ১২ বছরের মধ্যে দায়ের করতে হবে।

অন্যদিকে, ২০ বছর ধরে অর্জিত কোনো ব্যবহারসিদ্ধ অধিকারে (যেমন চলাচলের পথ) কেউ যদি বাধা দেয়, তবে সেই অধিকার ফিরে পেতে বাধা দেওয়ার দিন থেকে ২ বছরের মধ্যে মামলা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ২০ বছর ধরে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে যাতায়াত করেন এবং তা যদি প্রকাশ্যে ও শান্তিপূর্ণ হয়, তবে হঠাৎ সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হলে ভুক্তভোগী আগামী ২ বছরের মধ্যে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময়ে মামলা না করলে এই পথাধিকার নষ্ট হতে পারে।

খাস দখল ও সরকারি সম্পত্তি

বেসরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষেত্রে খাস দখলের মামলা ১২ বছরের মধ্যে করতে হলেও সরকারি সম্পত্তির ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ৬০ বছর। অর্থাৎ, সরকারি জমিতে কেউ একটানা ৬০ বছর জবরদখল বজায় রাখতে পারলে তার স্বত্ব দাবির সুযোগ তৈরি হয়। তাই সরকারকে তা উচ্ছেদে ৬০ বছরের মধ্যে মামলা করতে হয়।

আইনে দখলের বিভিন্ন ধরণ-

বৈধ দখলদার বা মালিক: যিনি প্রকৃত মালিক বা আইনি দখলে আছেন।

মধ্যবর্তী দখল: অন্য কারও পক্ষে প্রতিনিধিস্বরূপ দখল (যেমন: এজেন্ট)।

অমূর্ত দখল: আইনি অধিকার বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম।

গঠনমূলক দখল: সরাসরি উপস্থিত না থেকেও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।

প্রতিকূল বা বিরুদ্ধে দখল: কোনো ব্যক্তি অন্য কারও জমি ১২ বছর ধরে দখলে রেখে মালিকানা দাবি করা।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট


বেদখল হলে প্রাথমিক করণীয় ও আইনি প্রতিকার

জমি বেদখল হলে শুরুতেই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বা সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা যেতে পারে। সালিশ ব্যর্থ হলে সরাসরি দেওয়ানি আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে।

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী ভুক্তভোগী প্রতিকার পেতে পারেন-

৮ ও ৪২ ধারা: বেদখল হওয়া জমিতে যদি মালিকের বৈধ স্বত্ব (মালিকানা) থাকে, তবে বেদখল হওয়ার ১২ বছরের মধ্যে দখল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি 'স্বত্ব ঘোষণার' মামলা করা যায়।

৯ ধারা: কোনো ব্যক্তি হঠাৎ বেদখল হলে, তার স্বত্ব থাকুক বা না থাকুক, বেদখলের ৬ মাসের মধ্যে সরাসরি দেওয়ানি আদালতে 'দখল পুনরুদ্ধারের' মামলা করতে পারেন। এই ধারার আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিউ করা যায় না, তবে হাইকোর্টে রিভিশন করা সম্ভব।

অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও কোর্ট ফি: মামলা চলাকালে বিবাদী যাতে জমির কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করা যায়। মালিকানাসহ দখল চাইলে সম্পত্তির মূল্যানুপাতে (অ্যাড-ভ্যালোরেম) পূর্ণ কোর্ট ফি এবং ৯ ধারা অনুযায়ী শুধু দখলের প্রতিকার চাইলে অর্ধেক কোর্ট ফি দিতে হয়।

একসনা লিজ ও বিরুদ্ধে দখল (Adverse Possession)

চরের জমি, খাস জমি বা অর্পিত সম্পত্তি 'একসনা লিজ' নিয়ে অনেকেই দীর্ঘ দিন ব্যবহারের পর মালিকানা দাবি করে মামলা করেন। কিন্তু আইনিভাবে একসনা লিজ কোনো স্থায়ী অধিকার বা স্বত্ব সৃষ্টি করে না।

১৯০৮ সালের তামাদি আইনের ২৮ ধারায় 'বিরুদ্ধে দখল' বা জবরদখল সম্পর্কে বলা হয়েছে। জবরদখলের মাধ্যমে আইনি সুবিধা পেতে হলে নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হতে হয়-

  • জবরদখলকারীকে বাস্তবে জমিতে উপস্থিত থেকে দখলদার হতে হবে, শুধু কাগজপত্রে বা খতিয়ানে নাম থাকলে চলবে না।
  • দখল হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন, প্রকাশ্য এবং প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধে।
  • দখল বজায় রাখার স্পষ্ট ইচ্ছা থাকতে হবে।
  • জবরদখল প্রকৃত মালিকের জ্ঞাতসারে হতে হবে।
  • প্রথম থেকেই আইনিভাবে দখল শুরু হলে পরবর্তীতে জবরদখলের দাবি করা যাবে না।
  • প্রকৃত মালিকের স্বত্ব অস্বীকার করে নিজের শান্তিতে জমিটি দখলে রাখতে হবে এবং এই জবরদখলের কারণেই বেদখল ঘটাতে হবে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হওয়া অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল একটি বিষয়। অযথা সময় ক্ষেপণ না করে আইনি সময়সীমার (যেমন ৬ মাস বা ১২ বছর) মধ্যে সঠিক আদালতে মামলা দায়ের করা অত্যন্ত জরুরি। আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য খতিয়ান, দখলের প্রমাণাদি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই সম্পত্তি সুরক্ষার সর্বোত্তম উপায়।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।