জমির দলিল হারালে বা নষ্ট হলে সার্টিফাইড কপি তোলার আইনি নিয়ম

জমির মালিকানার অন্যতম প্রধান আইনি প্রমাণপত্র হলো 'দলিল'। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দলিল নষ্ট হয়ে যেতে পারে, কিংবা চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। অনেকে মনে করেন মূল দলিল হারিয়ে গেলে জমির মালিকানা সংকটে পড়ে যায়। তবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই দলিলের হুবহু নকল বা সার্টিফাইড কপি (Certified Copy) তোলা সম্ভব। এটি কীভাবে তুলবেন, কোথায় আবেদন করবেন এবং কী কী তথ্য প্রয়োজন হবে- চলুন জেনে নিই।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ষষ্ঠ অধ্যায়ের ১৮৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দলিল হারিয়ে গেলে কী করবেন?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্রথম পদক্ষেপ: থানা জিডি ও পুলিশি ছাড়পত্র
যেকোনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে গেলে শুরুতেই সংশ্লিষ্ট নিকটস্থ থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হয়। জিডি সম্পন্ন হলে পুলিশ অভিযোগকারীকে জিডির একটি অফিশিয়াল কপি ও একটি নির্দিষ্ট ট্র্যাকিং/জিডি নম্বর প্রদান করবে। এই কপিটি সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করতে হবে। জিডির ভিত্তিতে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করবে এবং হারিয়ে যাওয়া কাগজ খোঁজার পাশাপাশি নতুন/নকল দলিল সংগ্রহের জন্য অনুমতিপত্র বা ছাড়পত্র প্রদান করবে।
খতিয়ান ও দলিলের সার্টিফাইড কপি পাওয়ার উপায়
ধরা যাক, পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত কোনো জমির সি.এস (CS) খতিয়ান, আর.এস (RS) খতিয়ান এবং মূল দলিলের ফটোকপি আপনার কাছে রয়েছে, কিন্তু মূল কাগজপত্র কোনো কারণে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত উপায়ে সার্টিফাইড কপি তুলতে পারবেন-
খতিয়ান সংগ্রহ: সি.এস ও আর.এস খতিয়ানের জাবেদা নকল বা সার্টিফাইড কপি পেতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কালেক্টরেট অফিস (রেকর্ড রুম) হতে নির্ধারিত আবেদনপত্রের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।
দলিলের কপি সংগ্রহ: ফটোকপিতে থাকা দলিলের নম্বর উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্টার অফিস (District Register Office) হতে সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করা যাবে।
দলিল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য চিহ্নিতকরণ
যদি আপনার কাছে মূল দলিলের কোনো ফটোকপি থেকে থাকে, তবে দলিলের শেষ পৃষ্ঠার উল্টো দিকে নজর দিন। সেখানে দেখতে পাবেন-
দলিলটি কত সালের, কত নম্বর বালাম বইয়ের এবং বালাম বইয়ের কত নম্বর পৃষ্ঠা থেকে কত নম্বর পৃষ্ঠায় নকল করা হয়েছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক স্বাক্ষরিত সার্টিফাইড কপি বের করা খুব সহজ হয়ে যায়।

কোনো কাগজপত্র না থাকলেও খোঁজার উপায়
যদি দলিলের কোনো ফটোকপি বা তথ্যই হাতের কাছে না থাকে, তাহলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সে ক্ষেত্রে-
জমির দাতা (বিক্রেতা) বা গ্রহীতার (ক্রেতা) নাম, কিংবা অন্য কোনো পক্ষের নাম এবং জমির নির্দিষ্ট মৌজার নাম ব্যবহার করে রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি বালামে 'সার্চিং' (Search) দিয়ে কাঙ্ক্ষিত দলিলের তথ্য খুঁজে বের করা সম্ভব।
দলিল বা খতিয়ান হারিয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রথমে থানায় জিডি করে পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম এবং জেলা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে নিলে ভবিষ্যতে ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতা ও আইনি ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা যায়।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।

