জমির দলিলে ভুল বা নাম সংশোধন করার নিয়ম

জমি কেনাবেচা বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি নথি। তবে জমি রেজিস্ট্রির পর অনেক সময়ই দলিলে দাগ, খতিয়ান, মৌজা, চৌহদ্দি কিংবা নামের বানানে নানাবিধ ভুল ধরা পড়ে। অনেকে এসব ভুল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন।
তবে দলিলের মূল কাঠামো বা স্বত্বের কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়ে এ ধরনের ছোটখাটো ভুল সংশোধনের আইনি উপায় রয়েছে, যাকে পরিভাষায় ‘ভ্রম সংশোধনী দলিল’ বলা হয়।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৮২ ও ১৮৩ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমির দলিলে ভুল হলে সেই দলিল সংশোধনের উপায় কী?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
নাম সংশোধন ও হলফনামা সম্পাদ
শুধু জমির দলিলই নয়, যেকোনো কারণে ব্যক্তিজীবনে নাম পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। সনদপত্র, পাসপোর্ট কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম পরিবর্তনের জন্য প্রথম ও বাধ্যতামূলক ধাপ হলো নোটারি পাবলিক আইনজীবীর মাধ্যমে একটি হলফনামা সম্পাদন করা। ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পন্ন করা এই হলফনামায় আবেদনকারীর পূর্ণ নাম, ঠিকানা, বাবা-মায়ের নাম, জাতীয়তা, বয়স, পেশা ও ধর্মের স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া পূর্বের নাম কী ছিল এবং সংশোধিত নাম কী হবে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে দিতে হয়।
হলফনামার সাথে হলফকারীর পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি ও স্বাক্ষর যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। একই সাথে এটি কার্যকরের জন্য দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল হলফনামা বা পত্রিকা প্রকাশই নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বরং এটি একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে আবেদন করে হলফনামার কপি জমা দিতে হয়।

ভ্রম সংশোধনী দলিলের আইনি প্রক্রিয়
রেজিস্ট্রেশন বিধিমালার ৭৪ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে, কোনো রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে ছোটখাটো ভুল ধরা পড়লে এবং তা প্রমাণের জন্য মূল দলিল বা অবিকল নকলসহ জমা দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার তা সংশোধন করতে পারেন। এই ক্ষেত্রে যে রেজিস্টার বহিতে মূল দলিলটি সংরক্ষিত আছে, তার মার্জিনে সাব-রেজিস্ট্রার একটি বিশেষ টীকা লিখে দেন যে— ‘এই দলিলটি অমুক কার্যালয়ের এত সনের এত নম্বর দলিল মূলে সংশোধন করা হয়েছে।’
রেজিস্ট্রেশন বিধিমালার ৭৪ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মূল রেজিস্টার বইটি যদি ইতোমধ্যে জেলা সদর রেকর্ড রুমে পাঠানো হয়ে থাকে, তবে যে সাব-রেজিস্ট্রার ভ্রম সংশোধনী দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন, তিনি জেলা রেজিস্টারকে স্বহস্তে টীকাটি লেখার অনুরোধ জানিয়ে সরকারি পত্র পাঠাবেন।
রেজিস্ট্রেশন ও আনুষঙ্গিক খরচ
ভ্রম সংশোধনী দলিল সম্পাদনে খরচ অত্যন্ত সীমিত। এতে রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ১০০ টাকা এবং স্ট্যাম্প শুল্ক ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে হলফনামা যুক্ত করতে হয়। এছাড়া এন-ফি বাবদ বাংলায় প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠার জন্য ১৬ টাকা এবং ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রে ২৪ টাকা দিতে হয়। কেউ যদি স্ট্যাম্প শুল্ক মওকুফ চান, তবে ১৮৯৯ সনের স্ট্যাম্প আইনের ১৬ ধারা মোতাবেক ২০ টাকার কোর্টফিসহ আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
-cc1977.jpeg)
জমির দলিলে কোনো ভুল পরিলক্ষিত হলে তা এড়িয়ে যাওয়া একেবারেই উচিত নয়। সময়মতো ভ্রম সংশোধনী দলিল করে নিলে ভবিষ্যতে সম্পত্তি হস্তান্তর বা আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। তাই সঠিক আইনি পথ অনুসরণ করে দ্রুত এ সংক্রান্ত ভুল শুধরে নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


