logo
Advertisement

নিয়মিত খাজনা দিলেই জমির মালিকানা কি নিশ্চিত

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
নিয়মিত খাজনা দিলেই জমির মালিকানা কি নিশ্চিত
তহসিল অফিস ও জমির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

জমির মালিকানা, খাজনা আর দাখিলা নিয়ে অনেকেরই রয়েছে নানা প্রশ্ন। খাজনা আসলে কী, কেন দিতে হয়, দাখিলা ও ডিসিআর-এর মধ্যে পার্থক্য কী? নিয়মিত খাজনা দিলেই কি জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়? আবার কোন কোন কারণে ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়া বন্ধ হতে পারে?

Advertisement

গৃহ নির্মাণ প্রযুক্তির ন্যায় জমি-জমা ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয় অনেকের জন্যে সমস্যাসংকুল। তাই জমি কেনা কিংবা জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার আগে এসব বিষয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমির মালিকানা, খাজনা, খতিয়ান, পর্চা, নামজারির বিষয় নিয়ে ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম।

খাজনা কি

খাজনা একটি ফারসি শব্দ। এর অর্থ কোষাগার। সরকারি কোষাগারকেই সাধারণত খাজানা বলা হয়ে থাকে। সরকারি কোষাগার বা খাজানায় যে অর্থ ভূমিকর হিসেবে জমা হয়, তাকেই খাজনা বলা হয়। বেসরকারি ব্যক্তিবৃন্দ কর্তৃক সরকারি জমি ভোগের অধিকার প্রাপ্তির পর সরকারকে ঊর্ধ্বতন মালিক হিসেবে স্বীকার করে যে বাৎসরিক সেলামি বা উপহার অথবা কর দিতে হয়।

স্টেট একুইজিশন এবং টেনানসী এ্যাক্টে ১৯৫১-এর -২, ধারার ২২ উপধারা অনুযায়ী এই উপহার অথবা করকে খাজনা বলা হয়ে থাকে। খাজনা প্রদান বাধ্যতামূলক। খাজনার বর্তমান নাম ‘ভূমি উন্নয়ন কর’। নতুন নামটি এখনও তত চালু বা জনপ্রিয় হয়নি। তাই পুরাতন নামটির ব্যাপক ব্যবহার এখনো চলছে।

খাজনা বর্ষ কি

১৯৭৬ সালের ১৪ এপ্রিল অথবা ১৩৮৩ বাংলা সনের ১ বৈশাখ হতে প্রতি এক বছরকে খাজনা বৎসর বা ভূমি উন্নয়ন কর বর্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়।

জমির খাজনা কে কাকে দেয়

জমির ভোগদখলকারী মালিক কর্তৃক জমির খাজনা দিতে হয় সরকারি কোষাগারে। খাজনা তার থেকে নেওয়া হয় যার নামে জমির মালিকানা সরকারি রেজিস্টারে (১১ নম্বর) থাকে। পুরাতন মালিক কর্তৃক জমি বিক্রয়ের মালিকানা রেজিস্টার নং ১১ সংশোধন করে নতুন ক্রেতা মালিকের নামে হোল্ডিং বা জোত খোলা হয়। এই হোল্ডিং এর উপরেই ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ দিতে হয়।

দাখিলা ও দাখিলার গুরুত্ব

জমির জন্য সরকারকে খাজনা বা ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ দিতে হয়। দাখিলা হলো খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ। আরবি দাখিল শব্দের অর্থ অন্তর্ভুক্ত হওয়া। ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ দিয়ে একজন প্ৰজা রাষ্ট্রের ভূমির মালিকানা স্বত্ব লাভ করে এবং জমির দখল পায়। জমির খাজনা দেয়ার রসিদকে বলা হয় ‘দাখিলা’। দাখিলা একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ প্রবেশ করা বা অন্তর্ভুক্ত হওয়া।

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমির খাজনা দিয়ে কোন ব্যক্তি সরকারে প্রজাকুলে দাখিল বা অন্তর্ভুক্ত হয়। তাই হয়ত খাজনার রসিদকে বলা হয় দাখিলা।

দাখিলা হলো জমির মালিকানার অন্যতম দলিল। যার হাতে দাখিলা থাকে, সেই খাজনা দিয়েছে ধরা হয়। তাই তাকেই মালিকানা নিয়ে ঝগড়া বিবাদের ক্ষেত্রে মালিকানার কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া হয়। দাখিলা জমির দখলেরও একটা প্রমাণ।

খাজনা বা রেন্ট দিয়ে যে রসিদ অথবা দাখিলা পাওয়া যায়, তাকে ইংরেজিতে বলা হয় রেন্ট রিসিপ্ট। রেন্ট রিসিপ্ট বা দাখিলা হলো কোন জমির মালিকানার প্রাথমিক দলিল। দাখিলা হলো জমির মালিক কর্তৃক সরকারকে ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ কর প্রদানের রসিদ বা প্রমাণপত্র। প্রজাস্বত্ব আইনের ১০১৭ নম্বর ফরমে দাখিলা দেওয়া হয়।

ডিসিআর কি?

সরকারি পাওনা আদায় করার পর আদায়কারী কর্তৃক সরকারের অন্যান্য পাওনা যে রিসিপট বা আদায়ের রসিদ প্রজাকে দেয় তাকে বলা হয় ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিপট বা ডিসিআর।

ডিসিআর ও খাজনার মধ্যে পার্থক্য

ভূমি ভোগ করার জন্য সরকারকে দেওয়া বার্ষিক ভাড়া বা খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর ১০১৭ নম্বর ফরমে প্রদান করা হয়। ডিসিআর প্রদান করা হয় প্রজাস্বত্ব আইন-এর ২৪২ নম্বর ফরমে। ভূমি উন্নয়ন কর ছাড়াও সরকার বহুবিধ কর বা চার্জ অথবা পাওনা আদায় করে থাকেন।

‘ভূমি উন্নয়ন কর’ ব্যতীত যে নির্ধারিত ফরমে সরকারি পাওনা আদায় করা হয়, ওই আদায়ের প্রমাণপত্রকে ডিসিআর বলা হয়।

ডিসিআর-এর দ্বারা কর প্রদেতার মালিকানা স্বত্ব প্রমাণিত না যেমন হয় দাখিলার ক্ষেত্রে যদি তা যথাযথ হয়। ডিসিআর দ্বারা কোন নির্দিষ্ট সময়ে সরকারের প্রাপ্য আদায় করা হয়।

‘আবওয়াব’ কি

ভূমি উন্নয়ন করের উপরে নির্দিষ্ট হারে যে অতিরিক্ত সেন আদার করা হয়, তাকে ‘আবওয়াব’ বলা হয়। করের ওপর অতিরিক্ত করকে “আবওয়াব” বলা হয়।

তাকাবি ঋণ কি

সরকার কর্তৃক কৃষকদেরকে তাদের দুর্দিনে যে সুদ মুক্ত ঋণ দেওয়া হয়, তাকে ‘তাকাবি’ ঋণ বলা হয়। বন্যা, খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃষকদের আর্থিক অনটনের কারণে চাষাবাদে ব্যাহত হয়। ওই সময় কৃষকদেরকে যে সুদ-মুক্ত ঋণ দেওয়া হয়, তাই তাকাবি ঋণ।

কোন জমির জন্য খাজনা নেওয়া হয় না

জমির মালিকানা সংক্রান্ত কোনো গণ্ডগোল থাকলে তহশিল অফিসের খাজনা দেওয়া কষ্টকর। অনেক ক্ষেত্রে খাজনা দেওয়ার সময় যারা উপরি বকশিশ দেয় না, তাদেরকে পরের দিন আসার জন্য বলা হয় এবং ঘুরানো হয়। সে জন্য অনেক ক্ষেত্রে খাজনা দেওয়া হয় না।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৮৮। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৮৮। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কেন খাজনা দেওয়া হচ্ছে না অথবা খাজনা নেওয়া হচ্ছে না এটাও যাচাই করতে হবে। যার পক্ষ থেকে খাজনা নেওয়া হচ্ছে না জমিটা রেকর্ডে তার নামে আছে কি না এবং তার নামে নামজারি হয়েছে কি না—তাও যাচাই করতে হবে।

আর কোন কারণে খাজনা নেওয়া হয় না

জমির মালিকানা নিয়ে যদি আদালতে মামলা থাকে, উভয়পক্ষই খাজনা দিতে চেষ্টা করে। তখন হয়তো খাজনা নেওয়া বন্ধ থাকে। মিউটেশনটি যদি মালিকানা সংক্রান্ত কারণে বৈধভাবে না হয়ে থাকে, সে কারণেও খাজনা নেওয়া বন্ধ হতে পারে। ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে খাজনা আদায় বন্ধ হয়ে থাকে। আদালতের নির্দেশে ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়া বন্ধ হতে পারে।

কী কারণে খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়া বন্ধ—সে কারণ তহশিল কর্তৃপক্ষ অথবা সহকারি কমিশনার ভূমি অফিস হতে জানা যেতে পারে।

আরও যেসব কারণ

জমির মালিক যদি বিদেশে থাকেন অথবা বহু দূরে থাকেন অথবা বড় লোকের অলস, অকর্মণ্য সন্তান হন, তখন খাজনা দেওয়া বন্ধ থাকে। খাজনা না দেওয়া হলেই জমির মালিকানায় ত্রুটি আছে— এরূপ ধারণা বাস্তবভিত্তিক নাও হতে পারে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৯১। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৯১। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কত বছরের খাজনার রসিদ দেখা প্রয়োজন?

পাঁচ/ছয় বছরের বা তার বেশি সময়ের খাজনার রসিদের ফটোকপি রাখা প্রয়োজন। দুই এক বছরের খাজনা কিছু উপরি টাকা ব্যয় করে সহজেই দেওয়া যায়। রসিদের ফটোকপি করা তেমন ব্যয়সাধ্য ব্যাপার নয়।

নিয়মিত খাজনা দেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ

মিউটেশন যদি বৈধ বা সঠিক না হয়, তাহলে তহশিল অফিস কর্তৃক খাজনা নেওয়ার কথা নয়। যে মালিকের নাম ভূমি উন্নয়ন কর বা তলব বাকি রেজিস্টার-২ তে নেই এবং যে জমির খাজনা দেওয়া হয় না, সেই জমি গোলযোগপূর্ণ হতে পারে।

খাজনার রসিদের প্রয়োজনীয়তা

জমি ক্রয় করতে হলে অথবা জমি জামানত রেখে ব্যাংক ঋণ নিতে হলে প্রথমেই জমির মালিকের থেকে বা ঋণ প্রার্থীর নিকট থেকে জমির ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনার রসিদ দেখতে হবে অথবা ফটোকপি সংগ্রহ করে ঋণ ফাইলে রাখতে হবে। তারপর জমির মালিকানা সংক্রান্ত অন্যান্য কাগজ দেখতে হবে।

নিয়মিত খাজনা দিলেই কি জমির মালিকানা নিশ্চিত

খাজনা দেওয়া হলেই জমির মালিকানা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে, মালিকানা সম্পর্কে ত্রুটিমুক্ততার নিশ্চয়তা বেশি—এ ধারণা করা যেতে পারে। কি কি কারণে খাজনা দেওয়া হয় না, তা জমির মালিক বা তহশিল কর্তৃপক্ষ উভয়ের কাছ থেকে জানতে পারলে অধিকতর নিশ্চিত হওয়া যায়।

নিয়মিত খাজনা দিলেই জমির মালিকানা কি নিশ্চিত - Asia Post