একবার বানানো চা বারবার গরম করে খাচ্ছেন, যে ঝুঁকিগুলো জানা জরুরি

সকালে এক কাপ চা বানিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর চা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ায় আবার গরম করে খেলেন। এমন ঘটনা অনেকেরই প্রতিদিনের অভ্যাস। বিশেষ করে দুধ-চা হলে ঠান্ডা চা ফেলে না দিয়ে আবার চুলায় বসিয়ে গরম করার প্রবণতা রয়েছে।
কিন্তু ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা আবার গরম করে খেলেই কি শরীরের ক্ষতি হয়? বিষয়টি নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে। আসলে ঝুঁকিটা শুধু চা পুনরায় গরম করার মধ্যে নয়। কতক্ষণ চা ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে ছিল, তাতে দুধ ছিল কি না এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
চা বারবার গরম করলে কী হয়?
চা পুনরায় গরম করলে এর স্বাদ, গন্ধ ও কিছু উপকারী যৌগের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় রেখে দেওয়া চা আবার গরম করলে চায়ের স্বাদ তেতো হয়ে যেতে পারে। চায়ের ট্যানিনসহ বিভিন্ন যৌগের পরিবর্তনের কারণে এমনটা হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে একবার চা ঠান্ডা হয়ে গেলেই সেটি স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যায়। কয়েক মিনিট ঠান্ডা থাকা চা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকা চায়ের ঝুঁকি এক নয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো কতক্ষণ চা বাইরে ছিল
চা বানানোর পর দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিলে জীবাণু বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দুধ দেওয়া চায়ে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, চার ঘণ্টার বেশি সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকা চা পুনরায় গরম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে খাদ্যনিরাপত্তার সাধারণ নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের মার্কিন কৃষি বিভাগ পরামর্শ হলো, পচনশীল খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি রাখা উচিত নয়। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এই সময়সীমা এক ঘণ্টা।
বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করলে দুধযুক্ত চা দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে পরে পান করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা ভালো।
দুধ-চায়ে ঝুঁকি বেশি কেন?
দুধযুক্ত চা সাধারণ চায়ের তুলনায় দ্রুত নষ্ট হতে পারে। চা যদি দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকে, তাহলে দুধসহ অন্যান্য উপাদানে জীবাণু বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরে চা আবার গরম করলেই সেটি নিশ্চিতভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না। কারণ খাবার দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় থাকলে কিছু জীবাণু এমন উপাদান তৈরি করতে পারে, যা পরে গরম করলেও পুরোপুরি নষ্ট নাও হতে পারে। মার্কিন কৃষি বিভাগও জানায়, অনিরাপদভাবে দীর্ঘ সময় রাখা খাবার শুধু পরে গরম করলেই সব ধরনের ঝুঁকি দূর হয় না।
তাই কয়েক ঘণ্টা বাইরে পড়ে থাকা দুধ-চা আবার গরম করে পান করার চেয়ে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
বারবার গরম করলে স্বাদ তেতো হতে পারে
চায়ের স্বাদ ও রঙের সঙ্গে ট্যানিন নামের পলিফেনল যৌগের সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সময় চা রেখে দেওয়া বা আবার গরম করার ফলে ট্যানিনের প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে। এতে চায়ের স্বাদ তেতো বা কষা লাগতে পারে।
এ কারণে তাজা বানানো চায়ের মতো স্বাদ ও গন্ধ পুনরায় গরম করা চায়ে নাও পাওয়া যেতে পারে।
পুষ্টিগুণ কি একেবারে নষ্ট হয়ে যায়?
এখানে কিছুটা সতর্ক থাকা দরকার। চা গরম করলে এর সব পুষ্টিগুণ একেবারে নষ্ট হয়ে যায়, এমন কথা বলা ঠিক নয়। তবে অতিরিক্ত বা বারবার তাপ প্রয়োগ করলে চায়ের কিছু সংবেদনশীল যৌগের পরিমাণ ও গুণাগুণে পরিবর্তন আসতে পারে। পুনরায় গরম করার ফলে চায়ের কিছু উপকারী বৈশিষ্ট্য ও সুগন্ধ কমে যেতে পারে।
তাই চায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অভ্যাস হলো প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ করে তাজা চা বানিয়ে পান করা।
কতক্ষণ পরের চা খাওয়া নিরাপদ?
চা যদি মাত্র কয়েক মিনিট পড়ে থাকে এবং পরিষ্কার কাপ বা পাত্রে রাখা হয়, সেটিকে দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা চায়ের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
অন্যদিকে দুধযুক্ত চা ঘরের তাপমাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেখে দিলে ঝুঁকি বাড়ে। মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী পচনশীল খাবার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা উচিত। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে সময়সীমা এক ঘণ্টা।
তাই সকালে বানানো দুধ-চা দুপুরে বা বিকেলে রেখে দিয়ে আবার গরম করে খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভালো।
চা গরম রাখার নিরাপদ উপায় কী?
চা অনেকক্ষণ পরে খাবেন বলে বানিয়ে রেখে দেওয়ার বদলে প্রয়োজনমতো অল্প পরিমাণে বানানো সবচেয়ে সহজ উপায়।
আর যদি কিছুক্ষণ পর পান করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে পরিষ্কার ও উপযুক্ত ইনসুলেটেড ফ্লাস্ক বা থার্মোসে চা গরম অবস্থায় রাখা যেতে পারে। এতে ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয় না।
চা সংরক্ষণ করতেই হলে দ্রুত ঠান্ডা করে পরিষ্কার পাত্রে ফ্রিজে রাখা উচিত। পরে প্রয়োজনমতো গরম করে পান করা যায়। খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা এবং ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় না রাখার পরামর্শ দেয় মার্কিন কৃষি বিভাগ।
শুধু ঠান্ডা হয়েছে বলেই চা ফেলে দিতে হবে?
না। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে মানেই সেটি নষ্ট হয়ে গেছে, এমন নয়। মূল বিষয় হলো কতক্ষণ এবং কীভাবে রাখা হয়েছে।
১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এক কাপ চা এবং পাঁচ-ছয় ঘণ্টা টেবিলে পড়ে থাকা এক কাপ চায়ের ঝুঁকি এক নয়। একইভাবে কালো চা, গ্রিন টি বা হার্বাল চা এবং দুধ-চায়ের সংরক্ষণ পরিস্থিতিও একভাবে বিচার করা উচিত নয়।
তবে চায়ে অস্বাভাবিক গন্ধ, স্বাদ, দুধ কেটে যাওয়া, অস্বাভাবিক স্তর বা ছত্রাকের মতো কিছু দেখা গেলে সেটি না খাওয়াই নিরাপদ।
তাহলে কী করবেন?
প্রতিদিনের অভ্যাসে কয়েকটি বিষয় মেনে চলতে পারেন
- যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু চা বানান।
- দুধ-চা দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেবেন না।
- পচনশীল খাবারের ক্ষেত্রে দুই ঘণ্টার নিরাপত্তা নিয়মটি মনে রাখুন। গরম আবহাওয়ায় সময়সীমা আরও কমে যায়।
- পরে খেতে হলে দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখুন।
- বারবার গরম করার বদলে প্রয়োজনমতো নতুন করে চা বানানো ভালো।
- দীর্ঘ সময় বাইরে পড়ে থাকা চা শুধু আবার ফুটিয়ে নিরাপদ করার চেষ্টা করবেন না।
সবশেষে বলা যায়, একবার চা গরম করলেই সেটি বিষাক্ত হয়ে যায়, এমন ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। আসল উদ্বেগ হলো দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় পড়ে থাকা চা, বিশেষ করে দুধযুক্ত চা। তাই চা যতটা সম্ভব তাজা পান করা এবং দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকা চা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ অভ্যাস।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


