logo
Advertisement

ভাত খেয়েও ওজন কমবে, মানতে হবে এই নিয়মগুলো

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ভাত খেয়েও ওজন কমবে, মানতে হবে এই নিয়মগুলো
শুধু সাদা চাল খাওয়া নিজে থেকেই ওজন বৃদ্ধির কারণ হয় না। ছবি: এনডিটিভি

ওজন কমানোর চেষ্টা শুরু করলেই অনেকেই প্রথমে যে খাবারটি বাদ দেন, সেটি হলো সাদা চালের ভাত। বিশেষ করে রাতের ভাত নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের ভয়। ভাত খেলেই ওজন বাড়বে, কার্বোহাইড্রেট মানেই শরীরে চর্বি জমবে, কিংবা ওজন কমাতে হলে ভাত পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, এমন ধারণা বেশ প্রচলিত।

কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। সাদা ভাত ওজন কমানোর পথে বাধা হবেই, এমন কথা বলা যায় না। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সারাদিনে মোট কত ক্যালোরি গ্রহণ করছেন, খাবারের পরিমাণ কেমন, খাবারে প্রোটিন ও ফাইবার কতটা আছে এবং দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা কেমন, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক পুষ্টি নির্দেশনাতেও স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখতে খাবার থেকে পাওয়া শক্তি ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সাদা ভাত খেলেই কি ওজন বাড়ে?

না। একটি নির্দিষ্ট খাবারকে একা দায়ী করে ওজন বাড়া বা কমার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না।

সাদা ভাত মূলত কার্বোহাইড্রেটের উৎস। শরীর এই কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি করে, যা শক্তির জন্য ব্যবহার করা হয়। সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ক্যালোরি নিয়মিত গ্রহণ করা হয়।

ছবি: ইন্ডিয়ার এক্সপ্রেস
ছবি: ইন্ডিয়ার এক্সপ্রেস

অর্থাৎ এক বাটি পরিমিত ভাতের সঙ্গে মাছ, ডাল ও সবজি খাওয়া এবং বড় প্লেট ভাতের সঙ্গে ভাজাভুজি, অতিরিক্ত তেল ও মিষ্টি পানীয় খাওয়ার পুষ্টিগত প্রভাব এক নয়।

সাম্প্রতিক একটি পুষ্টিবিষয়ক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, ওজন কমানোর সময় শুধু ভাত বাদ দেওয়ার বদলে মোট খাবারের পরিমাণ এবং ভাতের সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে, সেদিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে সাদা ভাতের সমস্যা কোথায়?

সাদা চাল মূলত refined grain বা পরিশোধিত শস্য। চাল প্রক্রিয়াজাত করার সময় শস্যের ভুসি/তুষ ও অঙ্কুর (bran and germ) অংশ বাদ যায়। এর ফলে বাদামি চালের মতো whole grain বা সম্পূর্ণ শস্যের তুলনায় সাদা চালে খাদ্য আঁশ ও কিছু পুষ্টি উপাদান কম থাকে।

ফাইবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এটি পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। তাই একই পরিমাণ খাবারের মধ্যে বেশি ফাইবার থাকলে দীর্ঘ সময় তৃপ্তি অনুভব করা সহজ হতে পারে।

এ কারণে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সাদা ভাতের পরিবর্তে বা পাশাপাশি বাদামি চাল, লাল চাল, ওটস, বার্লি বা অন্যান্য whole grain রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সাদা ভাত খেলেই ওজন কমানো অসম্ভব।

ভাতের পরিমাণই হতে পারে বড় বিষয়

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো portion control বা খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ।

একই খাবার বেশি পরিমাণে খেলে মোট ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যায়। তাই ভাত খেতে চাইলে প্লেটের বড় অংশ শুধু ভাত দিয়ে ভরে না রেখে সবজি ও প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।

সহজভাবে একটি খাবারের প্লেট সাজাতে পারেন এভাবে-

  • পরিমিত পরিমাণ সাদা ভাত
  • পর্যাপ্ত সবজি
  • মাছ, ডিম, মুরগি, ডাল বা অন্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিন
  • প্রয়োজন অনুযায়ী সামান্য স্বাস্থ্যকর চর্বি

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্য নির্দেশনাতেও বেশি সবজি ও ফল, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন, পূর্ণ শস্য এবং কম প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভাতের সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

এক প্লেট ভাতের সঙ্গে কী থাকছে, তা ওজন কমানোর ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

ধরা যাক, ভাতের সঙ্গে মাছ, ডাল ও প্রচুর সবজি খাওয়া হলো। অন্যদিকে একই পরিমাণ ভাতের সঙ্গে আলুর ভাজা, অতিরিক্ত তেলযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া এবং মিষ্টি পানীয় থাকল। দ্বিতীয় খাবারে মোট ক্যালোরি অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে।

প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত খাবার যুক্ত করলে খাবার তুলনামূলক বেশি তৃপ্তিদায়ক হতে পারে। সাম্প্রতিক পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শেও সাদা ভাতের সঙ্গে ডাল, ডিম, মাছ বা অন্যান্য প্রোটিন এবং প্রচুর সবজি রাখার কথা বলা হয়েছে।

ভাতের সঙ্গে সবজি কেন রাখবেন?

সবজিতে সাধারণত খাদ্য আঁশ, ভিটামিন, খনিজ ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। একই সঙ্গে অনেক সবজির ক্যালোরি ঘনত্ব তুলনামূলক কম।

তাই প্লেটে সবজির পরিমাণ বাড়ালে খাবারের মোট পরিমাণ বজায় রেখেও ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন স্বাস্থ্যকর ওজনের জন্য খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফল রাখার পরামর্শ দেয়।

ভাতের সঙ্গে প্রোটিনও জরুরি

ওজন কমানোর সময় শুধু ভাত কমিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও জরুরি।

মাছ, ডিম, ডাল, মুরগি, ছোলা, মসুর ডাল, মটরশুঁটি ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও ডাল, মটরশুঁটি, বাদাম, মাছ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎসকে খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেয়।

বাদামি চাল কি সাদা চালের চেয়ে ভালো?

ফাইবার ও পুষ্টির দিক থেকে whole grain বা পূর্ণ শস্য সাধারণত বেশি সুবিধাজনক। বাদামি চাল পূর্ণ শস্য হওয়ায় এতে তুষ, অঙ্কুর ও শস্যমজ্জা থাকে। সাদা চাল পরিশোধনের সময় তুষ ও অঙ্কুর বাদ যায়।

ছবি: লাইভলি টেবিল
ছবি: লাইভলি টেবিল

তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় বাদামি চাল বা অন্য whole grain রাখতে পারলে তা ভালো বিকল্প হতে পারে।

কিন্তু বাদামি চাল খেতেই হবে এবং সাদা চাল খেলেই ওজন বাড়বে, এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেকের জন্য দীর্ঘদিন মেনে চলা যায় এমন খাদ্যাভ্যাস তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাতে ভাত খেলে কি ওজন বাড়ে?

শুধু রাতের বেলায় ভাত খাওয়াকে ওজন বাড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

ওজনের ওপর দিনের মোট ক্যালোরি গ্রহণ, খাবারের গুণমান, পরিমাণ এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে ভাত খেলে সেটি দিনের মোট খাবারের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

তবে রাতের খাবারে যদি খুব বেশি ভাতের সঙ্গে অতিরিক্ত তেল, ভাজাভুজি বা মিষ্টি খাবার যুক্ত হয়, তাহলে মোট ক্যালোরি বেড়ে যেতে পারে। সমস্যাটি তখন শুধু ভাতের নয়, পুরো খাবারের ধরন ও পরিমাণের।

ওজন কমাতে ভাত কীভাবে খাবেন?

ভাত পুরোপুরি বাদ না দিয়ে কয়েকটি সহজ অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে।

প্রথমত, পরিমাণ কমান। বড় প্লেট ভর্তি ভাত না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করুন।

দ্বিতীয়ত, সবজি বাড়ান। ভাতের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সবজি রাখুন।

তৃতীয়ত, প্রোটিন রাখুন। মাছ, ডিম, ডাল বা চর্বি কম থাকা মাংসের মতো উৎস বেছে নিতে পারেন।

চতুর্থত, অতিরিক্ত তেল কমান। ভাতের সঙ্গে তেল বা ঘি অতিরিক্ত যোগ করলে খাবারের ক্যালোরি বাড়তে পারে।

পঞ্চমত, মিষ্টি পানীয় এড়িয়ে চলুন। কোমল পানীয়, মিষ্টি জুস বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয় ওজন কমানোর প্রচেষ্টাকে কঠিন করতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও অতিরিক্ত চিনি কমানোর পরামর্শ দেয়।

শুধু ভাত কমালেই কি ওজন কমবে?

এটিও ঠিক নয়। অনেকে দুপুরে ভাত কমিয়ে দিলেও দিনের অন্য সময়ে বিস্কুট, মিষ্টি, চিপস, ফাস্টফুড, মিষ্টি চা-কফি বা কোমল পানীয়ের মাধ্যমে অনেক ক্যালোরি গ্রহণ করেন। ফলে শুধু ভাত কমিয়ে প্রত্যাশিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে।

ওজন কমানোর জন্য পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দিতে হয়। খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন স্বাস্থ্যকর ওজন অর্জন ও ধরে রাখতে খাবার থেকে পাওয়া শক্তি এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

কারা বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন?

ডায়াবেটিস, প্রিডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে খাদ্যতালিকা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। সেক্ষেত্রে শুধু অন্য কারও ওজন কমানোর ডায়েট অনুসরণ না করে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ওজন কমাতে ভাতের পরিমানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ছবি: আইস্টক
ওজন কমাতে ভাতের পরিমানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ছবি: আইস্টক

বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে একবারে কতটা ভাত খাওয়া হচ্ছে এবং খাবারের সঙ্গে অন্য কার্বোহাইড্রেট কতটা থাকছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে সাদা ভাত কি বাদ দিতে হবে?

না, সবার জন্য সাদা ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

সাদা চাল পরিশোধিত হওয়ায় সাধারণ পূর্ণ শস্যের তুলনায় এতে ফাইবার কম। তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় শস্য জাতীয় খাদ্য যুক্ত করা ভালো অভ্যাস। কিন্তু ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সাদা ভাতকে একমাত্র সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।

মূল বিষয় হলো কতটা খাচ্ছেন, কীসের সঙ্গে খাচ্ছেন এবং পুরো দিনের খাদ্যতালিকা কেমন।

অর্থাৎ, ভাতের প্লেট ছোট করে তার সঙ্গে সবজি ও প্রোটিন বাড়ানো, অতিরিক্ত তেল ও চিনি কমানো এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, এই পদ্ধতি অনেকের জন্য ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।

ওজন কমানোর খাদ্যতালিকা এমন হওয়াই ভালো, যা শুধু কয়েক সপ্তাহ নয়, দীর্ঘদিন ধরে মেনে চলা সম্ভব। সাদা ভাত সেই খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে, যদি পরিমাণ ও পুরো খাবারের ভারসাম্যের দিকে নজর রাখা হয়।

সূত্র: এনডিটিভি