logo

আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে, গবেষণায় উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে, গবেষণায় উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি : সংগৃহীত

চাচাতো বা খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে বিশ্বের অনেক সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি সামাজিক রীতি। পরিবারকে কাছাকাছি রাখা, সাংস্কৃতিক বন্ধন শক্ত করা এবং সম্পদ একসঙ্গে রাখার মতো নানা কারণে এ ধরনের বিয়ে এখনো অনেক জায়গায় দেখা যায়।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, এ ধরনের বিয়ে শুধু পারিবারিক বা সামাজিক বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত একটি গবেষণায় বিষয়টি নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যায়, নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে সন্তানদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কিছুটা বাড়তে পারে।

জেনেটিক ঝুঁকি কীভাবে তৈরি হয়

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, অনেক রোগ জিনের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যেতে পারে। যখন বাবা-মা উভয়ের শরীরে একই ধরনের ক্ষতিকর জিন থাকে, তখন সন্তানের মধ্যে সেই রোগ প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

যেহেতু চাচাতো বা খালাতো ভাইবোনদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক থাকে, তাই তাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের জিন বহনের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। এই কারণে কিছু বংশগত রোগের ঝুঁকি সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় কী দেখা গেছে

ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় হাজার হাজার শিশুকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে শুধু জন্মগত রোগ নয়, শিশুদের ভাষা বিকাশ, শিক্ষাগত অগ্রগতি এবং সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে ভাষা বিকাশে দেরি বা কিছু বিকাশগত চ্যালেঞ্জ তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে তাদের চিকিৎসা সেবা গ্রহণের প্রয়োজনও কিছুটা বেশি দেখা গেছে।

তবে গবেষকরা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, এর মানে এই নয় যে, সব ক্ষেত্রেই সমস্যা হবে। অনেক পরিবারেই এমন বিয়ের পর সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান জন্ম নেয়।

শুধু আত্মীয়তা নয়, আরও কারণও জড়িত

গবেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের কারণে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। অনেক সময় একই সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিয়ে চলতে থাকলে নির্দিষ্ট কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এন্ডোগামি বলা হয়।

এর ফলে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও একই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও কিছু জেনেটিক ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিভঙ্গি

কিছু ইউরোপীয় দেশ নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আবার কিছু দেশে এখনো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে সেখানে বিয়ের আগে জেনেটিক পরামর্শ বা কাউন্সেলিংকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে, কারণ এটি মানুষকে ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই ধারণা দেয়।

সমাজে পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি

নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা, শহরায়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অনেকেই এখন জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্কের চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ, মানসিক মিল এবং বোঝাপড়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে অনেক সমাজে একটি প্রচলিত রীতি হলেও এর সঙ্গে কিছু জেনেটিক ঝুঁকির বিষয়ও যুক্ত থাকতে পারে। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় যে এতে অবশ্যই সমস্যা হবেই। সঠিক তথ্য জানা, সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ বা জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা