logo

একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন দেখা যায়

একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন দেখা যায়
ছবি: গাল্ফ নিউজ

একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি কিংবা আরও কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় সহজেই চলে যান। বাইরে থেকে বিষয়টি যতটা স্বাভাবিক মনে হয়, মস্তিষ্কের জন্য কাজটি কিন্তু ততটা সহজ নয়।

কারণ একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্কে শুধু প্রয়োজনের ভাষাটিই সক্রিয় থাকে না। জানা অন্য ভাষাগুলোও কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে কথা বলার সময় কখনো ভুল করে অন্য ভাষার কোনো শব্দ চলে আসে, কখনো উচ্চারণে অন্য ভাষার প্রভাব পড়ে, আবার কখনো পরিচিত একটি শব্দ মনে পড়তে একটু বেশি সময় লাগে।

ভাষাবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, এই বিষয়গুলো আসলে মস্তিষ্ক কীভাবে একাধিক ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারই একটি অংশ। নিয়মিত একাধিক ভাষা ব্যবহার মস্তিষ্কের কিছু নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে এবং ভাষা ব্যবহারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কের কাজের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

কথা বলার সময় অন্য ভাষার শব্দ চলে আসে কেন?

ধরুন, আপনি বাংলায় কথা বলছেন। হঠাৎ ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষার একটি শব্দ মনে চলে এল। অনেকেই এটিকে ভুলে যাওয়া বা ভাষাজ্ঞান কমে যাওয়ার লক্ষণ মনে করেন। কিন্তু বহুভাষী মানুষের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বহুভাষী মানুষ যখন একটি ভাষা ব্যবহার করেন, তখন তার জানা অন্য ভাষাগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। মস্তিষ্ককে প্রয়োজনীয় ভাষাটি বেছে নিতে হয় এবং একই সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দ বা গঠন যেন কথার মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে ঢুকে না পড়ে, সেটিও সামলাতে হয়।

এ কারণেই কখনো শব্দ, ব্যাকরণ এমনকি উচ্চারণেও অন্য ভাষার প্রভাব দেখা যেতে পারে।

মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয়

একাধিক ভাষা ব্যবহার করা অনেকটা মস্তিষ্কের জন্য নিয়মিত বাছাইয়ের কাজের মতো। কোন ভাষায় কথা বলতে হবে, কোন শব্দটি ব্যবহার করতে হবে এবং কোন শব্দটি এখন ব্যবহার করা যাবে না, মস্তিষ্ককে দ্রুত এসব সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মনোযোগ, বাধা নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক নমনীয়তার মতো কিছু দক্ষতার সম্পর্ক রয়েছে।

কিছু গবেষণায় বহুভাষী মানুষের জ্ঞানীয় নিয়ন্ত্রণ বা কগনিটিভ কন্ট্রোলে সুবিধার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সব ফলাফল এক নয়। কিছু গবেষণায় সুবিধা পাওয়া গেলেও অন্য গবেষণায় স্পষ্ট পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তাই একাধিক ভাষা জানলেই যে প্রত্যেক মানুষের চিন্তাশক্তি বা স্মৃতিশক্তি একইভাবে বেড়ে যাবে, এমন দাবি করা ঠিক নয়।

ভাষা বদলানোর অভ্যাস মস্তিষ্ককে কী শেখায়?

অনেক বহুভাষী মানুষ একই কথোপকথনে ভাষা বদলান। কখনো একটি বাক্য বাংলায় শুরু করে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ভাষায় চলে যান। একে ভাষা পরিবর্তন বা কোড-সুইচিং বলা হয়।

এই কাজের সময় মস্তিষ্ককে দ্রুত বুঝতে হয় কখন কোন ভাষা ব্যবহার করতে হবে। নিয়মিত এমন অভিজ্ঞতা ভাষা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানসিক প্রক্রিয়াকে অনুশীলনের সুযোগ দিতে পারে।

তবে সব বহুভাষী মানুষের অভিজ্ঞতা এক নয়। কোন বয়সে দ্বিতীয় ভাষা শেখা হয়েছে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে ভাষাটি ব্যবহার করা হয়, প্রতিদিন কতটা ব্যবহার করা হয় এবং কোন পরিবেশে ভাষাটি শেখা হয়েছে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ছোটবেলা থেকে ভাষা শেখা কি বেশি কার্যকর?

ছোটবেলায় নতুন ভাষার সঙ্গে পরিচিত হলে মস্তিষ্কের ভাষা শেখার ক্ষমতা বিশেষভাবে সক্রিয় থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বড় বয়সে নতুন ভাষা শেখা যায় না।

প্রাপ্তবয়স্করাও নতুন ভাষা শিখতে পারেন এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ভাষাটিতে দক্ষ হতে পারেন। বরং নতুন ভাষা শেখার সময় শব্দ মনে রাখা, বাক্য তৈরি করা, উচ্চারণ অনুশীলন এবং নিয়ম বুঝে ব্যবহার করার মতো নানা মানসিক কাজ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।

তবে বয়স, পূর্বের ভাষাজ্ঞান এবং শেখার পরিবেশ অনুযায়ী শেখার গতি আলাদা হতে পারে।

একাধিক ভাষা জানলে মস্তিষ্কের গঠনও বদলাতে পারে?

গবেষণায় বহুভাষী মানুষের মস্তিষ্কে গঠনগত ও কার্যগত কিছু পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নিয়মিত একাধিক ভাষা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের কার্যক্রম ও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

একে মস্তিষ্কের নমনীয়তা বা নিউরোপ্লাস্টিসিটির অংশ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ মানুষের অভিজ্ঞতা ও নিয়মিত মানসিক কাজের সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। মস্তিষ্কে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলেই সেটিকে সরাসরি ভালো বা খারাপ বলা যায় না। গবেষকেরা সাধারণত এসব পরিবর্তনকে ভাষা শেখা ও ব্যবহারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেন।

ভুল করে অন্য ভাষার শব্দ বলা কি খারাপ লক্ষণ?

সব সময় নয়। আপনি যদি একাধিক ভাষায় কথা বলেন, তাহলে কখনো একটি ভাষার শব্দের বদলে অন্য ভাষার শব্দ বলে ফেলা স্বাভাবিক হতে পারে।

একইভাবে, কোনো একটি ভাষার শব্দ হঠাৎ মনে না পড়া বা অন্য ভাষার শব্দ আগে মনে আসাও বহুভাষী মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়। কারণ মস্তিষ্ককে একই সময়ে একাধিক ভাষার তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

তবে কোনো ব্যক্তির নিজের মাতৃভাষায় হঠাৎ ব্যাপকভাবে কথা বলার সমস্যা তৈরি হলে, পরিচিত শব্দ বারবার ভুলে গেলে বা এর সঙ্গে স্মৃতি, আচরণ কিংবা দৈনন্দিন কাজের অন্য পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধু ভাষা শেখার স্বাভাবিক প্রভাব ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

একাধিক ভাষা শেখার আরেকটি বড় সুবিধা

ভাষা শেখা শুধু শব্দ ও ব্যাকরণ শেখার বিষয় নয়। নতুন একটি ভাষার সঙ্গে নতুন সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন, যোগাযোগের ধরন এবং চিন্তার ভিন্ন প্রকাশের সঙ্গেও পরিচিত হওয়া যায়।

ফলে ভাষা শেখা সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতাও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত একাধিক ভাষা ব্যবহার করেন, তাদের প্রতিদিনের জীবনে ভাষা পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।

তাহলে নতুন ভাষা শেখা কি মস্তিষ্কের জন্য ভালো?

নতুন ভাষা শেখা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার একটি কার্যকর মানসিক অনুশীলন হতে পারে। এতে নতুন শব্দ শেখা, তথ্য মনে রাখা, নিয়ম বোঝা, মনোযোগ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভাষা বেছে নেওয়ার মতো কাজ করতে হয়।

তবে একাধিক ভাষা জানলেই স্মৃতিশক্তি অনেক বেড়ে যাবে বা ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের সব ধরনের সমস্যা প্রতিরোধ হবে, এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া যায় না। বহুভাষিকতা ও জ্ঞানীয় সুবিধা নিয়ে গবেষণার ফলাফল এখনও পুরোপুরি একমত নয়।

বরং বলা যায়, নিয়মিত ভাষা শেখা ও ব্যবহার মস্তিষ্কের জন্য একটি জটিল এবং সক্রিয় মানসিক কাজ। দীর্ঘদিনের ভাষা ব্যবহারের সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়া ও কিছু স্নায়বিক পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।

একাধিক ভাষায় কথা বলা বাইরে থেকে শুধু যোগাযোগের একটি দক্ষতা মনে হলেও এর পেছনে মস্তিষ্ককে বেশ জটিল কাজ করতে হয়। প্রয়োজনীয় ভাষা বেছে নেওয়া, অন্য ভাষার হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং কথার সঙ্গে সঠিক শব্দ ও ব্যাকরণ মিলিয়ে নেওয়া, সবকিছুই দ্রুত ঘটে।

এই কারণেই বহুভাষী মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। গবেষণায় ভাষা ব্যবহারের সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও গঠনের বিভিন্ন পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বহুভাষিকতার সব সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

তাই নতুন একটি ভাষা শেখার সবচেয়ে বড় কারণ শুধু মস্তিষ্কের উপকার নয়। এর মাধ্যমে নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নতুন সংস্কৃতি বোঝা এবং নিজের যোগাযোগের পরিসর বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়।

সূত্র: বিবিসি