Advertisement

৪২ বছর টিভির সামনে পড়ে ছিল মরদেহ, জানতেন না কেউ

৪২ বছর টিভির সামনে পড়ে ছিল মরদেহ, জানতেন না কেউ
ছবি : এআই

খবরের কাগজে কিংবা মোবাইলের নিউজফিডে এমন খবর আমরা দেখেছি ইদানীং। কোনো একজন মানুষ, নিজের ঘরেই মৃত অবস্থায় ছিলেন বেশ কয়েক দিন, কেউ কোনো খোঁজখবর পায়নি। হয়তো হঠাৎ অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা আপনজনের অবহেলায় মৃত্যুর সময় পাশে কেউ ছিল না, তারপর বেশ কয়েক দিন পর উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ। তবে এই না জানার সময়টা যদি যদি হয় প্রায় অর্ধশতাব্দী? একটা মানুষ, তার খবর যদি পাওয়া যায় ৪২ বছর পর?

ঘটনা আমাদের দেশের সীমানা পেরিয়ে হাজার হাজার মাইল দূর দেশের। ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবের একটি আবাসিক এলাকা। বিশাল এক বিল্ডিংয়ে অনেক অনেক অ্যাপার্টমেন্ট। যদিও এক বাড়ির খবর জানে না অন্য কেউ। কাছে কাছে থেকেও সবাই যেন আরেক সীমান্তের বাসিন্দা। যাকে নিয়ে এই করুণ গল্প, হেডভিগা গোলিক নামের সেই নারীর ফ্ল্যাটটিও তারই একটি। বাইরে থেকে দেখলে আর পাঁচটা সাধারণ ফ্ল্যাটের মতোই। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটের দরজার ওপাশে লুকিয়ে ছিল এমন এক রহস্য, যা শুনলে আজও গা শিউরে উঠবে সবার।

১৯৬৬ সালে হেডভিগা গোলিক হঠাৎ করেই যেন পৃথিবী থেকে হারিয়ে যান। একটা মানুষ কীভাবে হারিয়ে যান, সেটি ভাবলে অবাক লাগলেও বিষয়টা এত বিস্ময়কর নয়। প্রত্যেকে যে যার কাজে ব্যস্ত। এর মধ্যে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো মানুষ চোখের সামনে না এলে দু-এক দিন ব্যাপারটা ভাবলেও পরে প্রায় সবাই ভুলেই যায়। এখানেও ঘটনা কমবেশি তেমনই ছিল।

প্রতিবেশীরা তাকে আর দেখতে পাননি। প্রথম দিকে কেউ বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দেয়নি। কারণ হেডভিগা ছিলেন একা থাকা, চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। তিনি কারও সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। তাই কয়েক দিন না দেখা গেলে সেটাকে অস্বাভাবিক মনে হয়নি কারোরই।

এরপর সময় গড়াতে থাকে। দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার খোঁজে কেউ তেমনভাবে এগিয়েও আসেনি। কেউ ভেবেছেন হয়তো আত্মীয়দের কাছে চলে গেছেন, কেউ ধারণা করেছেন অন্য কোথাও নতুন জীবন শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে সবাই তাকে ভুলেই গেলেন। আর এভাবে হেডভিগা গোলিক স্রেফ হারিয়ে গেলেন, যেন তার কোনো অস্তিত্বই দুনিয়ায় ছিল না। কিন্তু সত্যিটা ছিল ভয়ংকর।

বছরের পর বছর ধরে হেডভিগার অ্যাপার্টমেন্টের দরজা বন্ধই ছিল। ভেতরে কী আছে, তা জানার প্রয়োজনও যেন কেউ অনুভব করেনি। অবশেষে ২০০৮ সালে ভবন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় ফ্ল্যাটটি খুলে দেখা হবে। কারণ, বহু বছর ধরে বাড়ির মালিকের কোনো যোগাযোগ যে ছিল না, সেটা হয়তো বা তাদের অবশেষে বোধোদয় হয়। দরজা খুলতেই সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

ঘরের ভেতরে টেলিভিশনের সামনে বসে ছিল একটি মানুষের কঙ্কাল। সেটিই ছিল হেডভিগা গোলিকের দেহাবশেষ। ধারণা করা হয়, তিনি টিভি দেখতে দেখতেই মারা গিয়েছিলেন। তার সামনে তখনও একটি চায়ের কাপ রাখা ছিল। ঘরের আসবাবপত্রও প্রায় আগের মতোই ছিল। যেন সময় সেখানে থমকে গেছে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, প্রায় ৪২ বছর ধরে কেউ বুঝতেই পারেনি যে ওই ফ্ল্যাটের ভেতরে একজন মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন।

এই ঘটনার পর পুরো ইউরোপজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। একটি মানুষ দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকলেও কেউ খোঁজ নিলেন না? কীভাবে একটি মরদেহ দশকের পর দশক একটি অ্যাপার্টমেন্টে পড়ে থাকতে পারে?

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

অনেকে বলেন, এটি শুধু একটি রহস্যময় ঘটনা নয়, বরং আধুনিক শহুরে জীবনের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বড় শহরে মানুষ একে অপরের এত কাছাকাছি থেকেও কতটা দূরে থাকতে পারে, সেই প্রশ্নই যেন সামনে এনে দেয় হেডভিগার গল্প।

হেডভিগা গোলিকের জীবন সম্পর্কে বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। জানা যায়, একটা সময় তিনি নার্স হিসেবে কাজ করতেন। শান্ত, নিরিবিলি জীবন পছন্দ করতেন। আপনজন অন্তত এমন কেউই ছিল না যে তার খোঁজখবর নিতে আসবে। স্মলটাউন থেকে উঠে আসা অনেক মানুষই তো বড় শহরের কোলাহলে একা হয়ে যান। হেডভিগার ব্যাপারটাও তেমনই ছিল। আর তিনি সেটাকেই জীবন হিসেবে পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলেন। হয়তো সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল হিসেবে চূড়ান্ত নিঃসঙ্গতাই একসময় তাকে পৃথিবী থেকে অদৃশ্য করে দেয়, অথচ কেউ তা টেরও পায়নি।

এই ঘটনার আরও একটি দিকও ভাবার আছে। মানুষকে ভাবায়। একটি সমাজে যদি কেউ বছরের পর বছর নিখোঁজ থাকেন এবং কেউ তার খোঁজ না নেয়, তাহলে সেটি কি শুধু ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, নাকি সামাজিক ব্যর্থতা? আমাদের অনেক পরিচিত মানুষেরও কিন্তু খোঁজখবর আমাদের কাছে একেবারেই নেই।

আপনি কি কখনো ভাবেন—কোথায়, কেমন আছেন তারা?