logo

আজ বিশ্ব হার্ট দিবস: হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে যে অভ্যাসগুলো জরুরি

আজ বিশ্ব হার্ট দিবস: হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে যে অভ্যাসগুলো জরুরি
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হৃদযন্ত্র। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এটি কোনো বিরতি ছাড়াই কাজ করে যায়। আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও হৃদযন্ত্র রক্ত সঞ্চালনের কাজ চালিয়ে যায়। অথচ ব্যস্ত জীবনে নিজের হৃদযন্ত্রের যত্ন নেওয়ার কথা অনেক সময়ই মনে থাকে না।

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব হার্ট দিবস। প্রতি বছর এই দিনে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের ২০২৬ সালের প্রচারের মূল বার্তা হলো ‘Don’t Miss a Beat’। এবারের প্রচারে হৃদরোগের লক্ষণ ও ঝুঁকির বিষয়গুলো বুঝে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য?

হৃদযন্ত্রের রোগ শুধু বয়স্ক মানুষের সমস্যা নয়। বয়স, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো বিভিন্ন বিষয় হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির রোগ বা হৃদরোগজনিত অসুখ বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২২ সালে এসব রোগে আনুমানিক ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। হৃদরোগ ও স্ট্রোক মিলে এসব মৃত্যুর বড় একটি অংশের জন্য দায়ী।

এ কারণেই হৃদযন্ত্রের যত্ন শুধু অসুস্থ হওয়ার পর নয়, সুস্থ থাকতেই শুরু করা দরকার।

হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব অভ্যাস

প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস ধীরে ধীরে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কম করা এবং তামাকজাত পণ্য ব্যবহার করা। অতিরিক্ত মদ্যপানও একটি ঝুঁকির কারণ।

এসব কারণে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া, রক্তে ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ওজনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এগুলো আবার হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

তাই হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে বড় কোনো পরিবর্তনের অপেক্ষা না করে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস বদলানো গুরুত্বপূর্ণ।

হাঁটুন, শরীরকে সক্রিয় রাখুন

সারাদিন বসে থাকা শরীরের জন্য ভালো নয়। নিয়মিত হাঁটা বা অন্য কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ড শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।

বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনও প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। যেমন লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, কাজের মাঝে কিছুক্ষণ হাঁটা বা কাছের দূরত্বে সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়া।

ব্যায়াম শুরু করার ক্ষেত্রে নিজের বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করলে হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করা ভালো।

খাবারের দিকেও নজর দিন

হৃদযন্ত্রের যত্নে খাবারের ভূমিকা অনেক। অতিরিক্ত লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে লবণ কম খাওয়া, বেশি ফল ও সবজি খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরামর্শ দেয়।

তবে শুধু একটি খাবার খেলেই হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান থেকে দূরে থাকুন

ধূমপান হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। তামাক ব্যবহারের কারণে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

যারা ধূমপান করেন, তাদের জন্য ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা হৃদযন্ত্রের যত্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শুধু সক্রিয় ধূমপান নয়, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ থেকেও যতটা সম্ভব দূরে থাকা ভালো।

রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা জানুন

উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই নিজেকে সুস্থ মনে হলেও নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই শুধু অসুস্থ বোধ করার সময় চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অভ্যাস তৈরি করা ভালো।

সবসময় কি বুকে ব্যথা হলেই হৃদরোগ বোঝা যায়?

হৃদরোগের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে একই রকম নাও হতে পারে। বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ঠান্ডা ঘাম বা শরীরের অন্য অংশে অস্বস্তির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণ খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের ২০২৬ সালের প্রচারেও হৃদরোগের কিছু সতর্কসংকেত উপেক্ষিত বা অচেনা থেকে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

তাই হঠাৎ বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে তীব্র বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

শুধু আজ নয়, প্রতিদিন হোক হৃদযন্ত্রের যত্ন

বিশ্ব হার্ট দিবস মূলত একটি দিনের সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই দিনটি নিজের জীবনযাপনের দিকে নতুন করে তাকানোর একটি সুযোগ।

প্রতিদিন একটু হাঁটা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো, ধূমপান থেকে দূরে থাকা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো ঝুঁকির বিষয়গুলো পরীক্ষা করা হৃদযন্ত্রের যত্নের অংশ হতে পারে।

হৃদযন্ত্র আমাদের জন্য প্রতিদিন কাজ করে। তাই তার যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও প্রতিদিনের। বিশ্ব হার্ট দিবসের বার্তাটিও সহজ, হৃদযন্ত্রের কোনো সতর্কসংকেত যেন চোখ এড়িয়ে না যায়।

আজ বিশ্ব হার্ট দিবসে নিজের হৃদযন্ত্রের যত্নের জন্য অন্তত একটি ভালো অভ্যাস শুরু করা যেতে পারে।