logo

৩-৪টি কলা খেয়েই ওজন কমানোর দাবি, কতটা সত্য এই ডায়েট

৩-৪টি কলা খেয়েই ওজন কমানোর দাবি, কতটা সত্য এই ডায়েট
ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

ওজন কমানোর জন্য অনেকেই কঠিন ডায়েট, দীর্ঘ সময় ব্যায়াম কিংবা খাবার কমিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নেন। এর মধ্যে মাঝেমধ্যেই নতুন কোনো ডায়েট পদ্ধতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে মর্নিং বানানা ডায়েট।

এই ডায়েটের নিয়ম শুনতে বেশ সহজ। সকালে ঘুম থেকে উঠে কয়েকটি কলা খেতে হবে, সঙ্গে পানি পান করতে হবে। এরপর দুপুর ও রাতে তুলনামূলক হালকা খাবার খেতে হবে। রাতের খাবারও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। দাবি করা হচ্ছে, এই পদ্ধতি মেনে চললে অল্প সময়ের মধ্যেই ওজন কমতে পারে।

কিন্তু শুধু সকালে কয়েকটি কলা খেলেই কি সত্যিই দ্রুত শরীরের মেদ কমে? নাকি ওজন কমার পেছনে অন্য কিছু কারণ রয়েছে?

কী এই মর্নিং বানানা ডায়েট?

মর্নিং বানানা ডায়েট জাপানে জনপ্রিয় হওয়া একটি খাদ্যাভ্যাস। এই পদ্ধতিতে সকালে নাশতায় তিন থেকে চারটি কলা খাওয়ার কথা বলা হয়। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করতে বলা হয়। দুপুর ও রাতে স্বাভাবিক বা তুলনামূলক হালকা খাবার খাওয়ার পরামর্শ থাকে।

এই ডায়েটের সঙ্গে আরও কিছু জীবনযাপনের নিয়ম জুড়ে দেওয়া হয়। যেমন রাত ৮টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত মিষ্টি ও ফাস্টফুড এড়িয়ে চলা। পেট পুরোপুরি ভর্তি হওয়ার আগেই খাওয়া বন্ধ করার পরামর্শও এই ডায়েটের অংশ।

অর্থাৎ বিষয়টি শুধু কলা খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দিনের মোট খাবার, ক্যালরি গ্রহণ এবং জীবনযাপনের অভ্যাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু কলা খেলেই কি ১৫ দিনে ওজন কমবে?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, শুধু কয়েকটি কলা খেলেই দ্রুত মেদ কমে যাবে, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

কোনো একটি খাবার নিজে থেকে শরীরের জমে থাকা চর্বি গলিয়ে দেয় না। ওজন কমার ক্ষেত্রে দিনের মোট ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম, খাদ্যের গুণমান এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, শুধু কলার ওপর নির্ভর করে ওজন কমানোর দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং সকালে শুধু কলা খেলে খাবারে প্রোটিনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হতে পারে।

আরেকটি ভারতীয় প্রতিবেদনে এক ধরনের খাবারকে কেন্দ্র করে তৈরি মোনোট্রপিক ডায়েট নিয়েও একই ধরনের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। এমন খাদ্যাভ্যাসে শুরুতে ওজন কমতে পারে, কিন্তু তার একটি কারণ হতে পারে মোট ক্যালরি গ্রহণ কমে যাওয়া। দীর্ঘমেয়াদে এতে পুষ্টির ঘাটতি এবং পেশির ভর কমার মতো সমস্যা হতে পারে।


তাহলে কলা কি ওজন কমানোর পথে বাধা?

না। কলাকে ওজন কমানোর শত্রু হিসেবে দেখারও কারণ নেই।

কলা পুষ্টিকর একটি ফল। এতে আঁশ, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে কাঁচা বা কম পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ থাকে, যা ধীরে হজম হয় এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর জন্য খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে।

Harvard T.H. Chan School of Public Health-এর Nutrition Source-এ উল্লেখ করা হয়েছে, কলা খাওয়ার সঙ্গে ওজন বাড়ার সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ নেই। বরং ফল ও সবজি নিয়ে বড় আকারের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় কলাসহ বিভিন্ন ফলের গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ওজন পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।

তাই সমস্যা কলায় নয়, বরং কী পরিমাণে এবং কীভাবে খাওয়া হচ্ছে, সেটিতে।

সকালে শুধু কলা খেলে সমস্যা কোথায়?

একটি স্বাস্থ্যকর নাশতায় শরীরের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কলা খেলে কার্বোহাইড্রেট ও কিছু আঁশ পাওয়া গেলেও পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পাওয়া নাও যেতে পারে।

সকালে শুধু কয়েকটি কলা খেয়ে দীর্ঘ সময় কাটালে কারও কারও দ্রুত ক্ষুধা ফিরে আসতে পারে। আবার খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

তাই কলাকে একমাত্র নাশতা বানানোর বদলে অন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে রাখা বেশি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি।

কলার সঙ্গে কী খেতে পারেন?

সকালের নাশতায় কলা রাখতে চাইলে সেটিকে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়া যেতে পারে। যেমন-

  • কলার সঙ্গে টক দই
  • কলা ও ওটস
  • কলার সঙ্গে বাদাম বা বীজ
  • ডিমের সঙ্গে একটি কলা
  • চিনি ছাড়া দই, কলা ও ওটস

এভাবে নাশতায় কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রোটিন ও আঁশও যোগ করা যায়।

ডায়াবেটিস থাকলে কি সকালে কলা খাওয়া যাবে?

ডায়াবেটিস থাকলেই কলা সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে, এমন নিয়ম নেই। তবে একসঙ্গে তিন-চারটি কলা খাওয়ার মতো ডায়েট শুরু করার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কলা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ ফল। তাই একসঙ্গে বেশি পরিমাণে খেলে রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা থাকলে ব্যক্তির খাদ্যতালিকা, ওষুধ এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ফলের পরিমাণ নির্ধারণ করা ভালো। ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে এই ধরনের ডায়েট নিয়ে সতর্ক থাকার কথাও বলা হয়।

খালি পেটে কলা খাওয়া কি সবার জন্য ভালো?

কলা সকালে খাওয়া নিয়ে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।

২০২৫ সালের একটি ভারতীয় প্রতিবেদনে একজন ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ানের মত তুলে ধরে বলা হয়েছিল, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খালি পেটে কলা খেলে অস্বস্তি, পেট ফাঁপা বা দ্রুত ক্ষুধা লাগতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে হবে এমন নয়।

তাই কলা খাওয়ার পর নিজের শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিও বিবেচনা করা উচিত।

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে আসল বিষয় কী?

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কোনো একটি খাবারকে জাদুকরী সমাধান হিসেবে দেখার বদলে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। একটি সুষম খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, পরিমিত ফল, ডাল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, মাছ/ডিম/অন্যান্য প্রোটিনের উৎস, পরিমিত ভাত বা অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার, বাদাম ও বীজ এবং পর্যাপ্ত পানি।

এর সঙ্গে নিয়মিত হাঁটা বা অন্য শারীরিক কার্যক্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু একটি ফলের ওপর নির্ভর করে ওজন কমানোর চেষ্টা করলে হয়তো কিছুদিন খাবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই অভ্যাস ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এক ধরনের খাবারভিত্তিক ডায়েটের ক্ষেত্রে পুষ্টির ঘাটতি ও পেশির ভর কমার আশঙ্কার কথাও বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।

তাহলে মর্নিং বানানা ডায়েটের কোন অংশটি কাজে আসতে পারে?

এই ডায়েটের সঙ্গে থাকা কিছু জীবনযাপনের অভ্যাস আলাদাভাবে উপকারী হতে পারে। যেমন অতিরিক্ত মিষ্টি ও ফাস্টফুড কমানো, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া।

কিন্তু এসব অভ্যাসের উপকারকে শুধু কলার কারণে ওজন কমার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

অর্থাৎ সকালে কলা খাওয়া এবং একই সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি, ফাস্টফুড ও বেশি ক্যালরির খাবার কমিয়ে দিলে মোট ক্যালরি গ্রহণ কমতে পারে। তখন ওজন কমার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেটি কলার কোনো বিশেষ চর্বি গলানোর ক্ষমতার কারণে নয়।

কলা কীভাবে স্বাস্থ্যকর নাশতার অংশ হতে পারে?

কলা সহজে পাওয়া যায়, বহন করা যায় এবং রান্নার প্রয়োজন হয় না। ব্যস্ত সকালে তাই এটি সুবিধাজনক খাবার।

একটি কলার সঙ্গে ডিম, দই, ওটস বা কিছু বাদাম যোগ করলে নাশতাটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।

আর শরীরচর্চার আগে কলা খাওয়াও অনেকের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে, কারণ এতে কার্বোহাইড্রেট থাকে। তবে প্রত্যেকের খাবারের প্রয়োজন ও সহনশীলতা আলাদা।

সকালে তিন-চারটি কলা খেলেই ১৫ দিনে মেদ গলে যাবে, এমন দাবি করার মতো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মর্নিং বানানা ডায়েটে ওজন কমার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে দিনের মোট খাবার ও ক্যালরি কমে যাওয়া এবং মিষ্টি, ফাস্টফুডসহ অতিরিক্ত ক্যালরির খাবার এড়িয়ে চলা।

কলা অবশ্যই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে ওজন কমানোর জন্য শুধু কলার ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে নতুন কোনো কঠোর ডায়েট শুরু করার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস , ওয়েব এমডি