পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে আজই বদলান এই ৮ অভ্যাস

পেটের সমস্যা হলেই আমরা অনেক সময় খাবারের দিকে নজর দিই। কোন খাবার খেলাম, কী খেলে গ্যাস হলো, কোন খাবার বাদ দিলে পেট ভালো থাকবে, এসব নিয়ে ভাবি। কিন্তু শুধু খাবারই হজমের স্বাস্থ্যের জন্য দায়ী নয়। আমরা কখন খাচ্ছি, কীভাবে খাচ্ছি, পর্যাপ্ত পানি পান করছি কি না কিংবা মলত্যাগের চাপ আটকে রাখছি কি না, এসব দৈনন্দিন অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে খাবার খেতে খেতে মোবাইল দেখা, কাজের চাপে খাবার বাদ দেওয়া, সারাদিন অল্প অল্প করে খাওয়া বা রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে রাতের খাবার খাওয়ার মতো অভ্যাস তৈরি হয়। দিনের পর দিন এগুলো চলতে থাকলে হজমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক সৌরভ শেঠি সম্প্রতি এমন আটটি অভ্যাসের কথা জানিয়েছেন, যেগুলো নিয়মিত করলে পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মোবাইল দেখতে দেখতে খাবেন না
খাবার টেবিলে বসে মোবাইল স্ক্রল করা এখন অনেকেরই অভ্যাস। খেতে খেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা কিংবা খবর পড়ার কারণে আমরা খাবারের দিকে মনোযোগ কম দিই।
চিকিৎসক সৌরভ শেঠির মতে, এভাবে খেলে পেট ভরে যাওয়ার সংকেতের দিকে মনোযোগ কমে যেতে পারে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
তাই খাবারের সময় অন্তত কিছুক্ষণ মোবাইল দূরে রাখা ভালো। ধীরে ধীরে খাবার চিবিয়ে খাওয়া এবং খাবারের স্বাদ ও পরিমাণের দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
ব্যস্ততার কারণে বারবার খাবার বাদ দেবেন না
অনেকেই কাজের চাপে কখনো দুপুরের খাবার, কখনো সকালের নাশতা বাদ দেন। আবার পরে একসঙ্গে অনেকটা খাবার খেয়ে নেন।
তবে পরিকল্পিত উপবাস আর ব্যস্ততার কারণে অনিয়মিতভাবে খাবার বাদ দেওয়া এক বিষয় নয়। চিকিৎসক সৌরভ শেঠির মতে, অনিয়মিতভাবে খাবার বাদ দেওয়ার অভ্যাস মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং হজমতন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই নিয়মিত সময়ে পরিমিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা ভালো।
প্রতিবার খাবারের পর মিষ্টি খাবেন না
ভাত, মাছ, মাংস বা সবজি খাওয়ার পর মিষ্টি, মিষ্টি পানীয় কিংবা অন্য কোনো মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার অভ্যাস অনেকের রয়েছে।
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্ত্রের জীবাণু বা গাট মাইক্রোবায়োমের ওপরও খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব রয়েছে। তবে মিষ্টি খেলেই ক্ষতিকর জীবাণু বেড়ে যায়, এমন সরল সিদ্ধান্তে না গিয়ে মূল বিষয় হিসেবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত।
তাই প্রতিদিন প্রতিটি খাবারের শেষে মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেটি কমানো ভালো।
সামান্য ব্যথা হলেই আইবুপ্রোফেন খাবেন না
মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা বা অন্য কোনো ছোটখাটো ব্যথা হলেই নিজের মতো করে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস অনেকের আছে।
বিশেষ করে আইবুপ্রোফেনের মতো নন-স্টেরয়ডাল প্রদাহনাশক ওষুধ বা এনএসএআইডি দীর্ঘদিন কিংবা অতিরিক্ত ব্যবহারে পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রের আবরণে ক্ষতি করতে পারে। কখনো কখনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াও এ ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
তাই প্রয়োজন ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক খাওয়া উচিত নয়। কোনো ওষুধ বারবার প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সারাদিন পানি না খেয়ে রাতে একসঙ্গে বেশি পানি পান করবেন না
অনেকে দিনের ব্যস্ততায় খুব কম পানি পান করেন। পরে রাতে বাড়ি ফিরে একসঙ্গে অনেকটা পানি পান করেন।
শরীরের পানির প্রয়োজন সারাদিনের বিভিন্ন সময়ে পূরণ করা ভালো। শুধু রাতে একসঙ্গে অনেক পানি পান করলে দিনের পানিশূন্যতা পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া যায় না।
পর্যাপ্ত পানি পান করা মল নরম রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। তবে ব্যক্তিভেদে পানির প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।
তাই তৃষ্ণা লাগা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দিনের বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত পানি পান করার অভ্যাস করা ভালো।
মলত্যাগের চাপ আটকে রাখবেন না
ব্যস্ততা, বাইরে থাকার অস্বস্তি কিংবা কাজের চাপের কারণে অনেকেই মলত্যাগের চাপ পেলেও তা আটকে রাখেন।
এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি বা বাড়তে পারে। চিকিৎসক সৌরভ শেঠিও নিয়মিত মলত্যাগের চাপ উপেক্ষা না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রয়োজনে দিনের এমন একটি সময় বেছে নিন, যখন তাড়াহুড়া ছাড়াই টয়লেটে যেতে পারবেন।
সারাক্ষণ অল্প অল্প করে খাবেন না
কাজ করতে করতে বিস্কুট, বাদাম, চিপস, ফল কিংবা অন্য খাবার অল্প অল্প করে সারা দিন খাওয়ার অভ্যাস অনেকের রয়েছে।
চিকিৎসক সৌরভ শেঠি জানিয়েছেন, খাবারের মাঝের বিরতিতে পরিপাকতন্ত্রে মাইগ্রেটিং মোটর কমপ্লেক্স নামে একটি স্বাভাবিক চলাচলের ধরণ থাকে। ঘন ঘন খাবার খেলে এই স্বাভাবিক বিরতি কমে যায়।
এর অর্থ এই নয় যে ক্ষুধা লাগলেও খাবার খাওয়া যাবে না। বরং সারাক্ষণ অপ্রয়োজনে কিছু না কিছু খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে পরিমিত খাবার ও প্রয়োজনীয় নাশতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা ভালো।
ঘুমানোর ঠিক আগে রাতের খাবার খাবেন না
রাতের খাবার খেয়েই বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার সমস্যা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই এ ধরনের সমস্যা রয়েছে।
এছাড়া ঘুমানোর প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে শেষ খাবার শেষ করার পরামর্শ দেয় বিভিন্ন গবেষণা।
অর্থাৎ রাতের খাবার খুব দেরিতে খেলে শুধু ঘুমের ওপর নয়, হজমের আরামের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
পেট ভালো রাখতে শুধু খাবারের তালিকা নয়
গাট বা পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য কোনো একটি খাবারকে জাদুকরী সমাধান হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের সামগ্রিক জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত ও সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি, শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা পরিপাকস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ ব্যবহারের অভ্যাস কমানোও জরুরি।
পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিন কী খাচ্ছেন, তার পাশাপাশি কীভাবে জীবনযাপন করছেন, সেদিকেও নজর দিতে হবে। খেতে খেতে মোবাইল দেখা, অনিয়মিতভাবে খাবার বাদ দেওয়া, অপ্রয়োজনে ব্যথানাশক খাওয়া, মলত্যাগের চাপ আটকে রাখা, সারাক্ষণ নাশতা করা এবং ঘুমানোর ঠিক আগে খাবার খাওয়ার মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে বদলানো যেতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন পেটব্যথা, বারবার অম্বল, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, মলে রক্ত, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: এনডিটিভি
