logo

আক্কেল দাঁত কেন এত দেরিতে ওঠে, ব্যথা হওয়ার কারণ জানুন

আক্কেল দাঁত কেন এত দেরিতে ওঠে, ব্যথা হওয়ার কারণ জানুন
ছবি: মিডওয়েস্ট ওরাল সার্জারি অ্যান্ড ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্টস

মানুষের বেশির ভাগ স্থায়ী দাঁত কৈশোরের মধ্যেই উঠে যায়। কিন্তু মুখের একেবারে পেছনের দাঁতগুলো সাধারণত অনেক পরে ওঠে। এই দাঁতই পরিচিত আক্কেল দাঁত নামে। বয়সের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধি ও বিচারবোধ পরিণত হওয়ার ধারণা থেকেই বাংলায় এর এমন নাম হয়েছে।

আক্কেল দাঁত ওঠার সময় অনেকের মাড়িতে ব্যথা, ফোলা কিংবা অস্বস্তি হয়। কারও ক্ষেত্রে ব্যথা এতটাই বেশি হতে পারে যে খাওয়া বা মুখ খোলাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে কেন এই দাঁত এত দেরিতে ওঠে? সবার কি আক্কেল দাঁত থাকে? আর ব্যথা হলেই কি দাঁত তুলে ফেলতে হয়?

আক্কেল দাঁত কখন ওঠে?

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত ৩২টি স্থায়ী দাঁত থাকতে পারে। এর মধ্যে চারটি আক্কেল দাঁত থাকে মুখের একেবারে পেছনে, ওপরের ও নিচের চোয়ালের দুই পাশে একটি করে। তবে সবার চারটি আক্কেল দাঁত থাকে না। কারও একটি, দুটি বা তিনটি থাকতে পারে। আবার কারও কোনো আক্কেল দাঁতই নাও থাকতে পারে।

আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ১৭ থেকে ২১ বছর বয়সের মধ্যে আক্কেল দাঁত ওঠা শুরু করে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা NHS বলছে, সাধারণত কৈশোরের শেষ ভাগ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে এই দাঁত বের হয়। তবে নির্দিষ্ট বয়সের পর আক্কেল দাঁত আর উঠবে না, এমন কোনো নিয়ম নেই। কারও ক্ষেত্রে আরও পরেও এটি বের হতে পারে।

কেন আক্কেল দাঁত উঠতে এত সমস্যা হয়?

এর অন্যতম কারণ হলো মুখের ভেতরে জায়গার অভাব।

আক্কেল দাঁত ওঠার সময় মুখের অন্য ২৮টি স্থায়ী দাঁত সাধারণত আগেই জায়গা করে নেয়। ফলে চোয়ালে নতুন দাঁতের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নাও থাকতে পারে। তখন আক্কেল দাঁত স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে না উঠে কাত হয়ে যেতে পারে, মাড়ির ভেতরে আটকে থাকতে পারে বা আংশিকভাবে বের হতে পারে। এই অবস্থাকে ইমপ্যাক্টেড উইজডম টুথ বলা হয়।

আক্কেল দাঁত যদি মাড়ির ভেতরে বা আংশিকভাবে আটকে থাকে, তখন দাঁতের চারপাশে খাবারের কণা ও ব্যাকটেরিয়া জমে যেতে পারে। সেখান থেকে মাড়িতে সংক্রমণ হতে পারে। ফলে ব্যথা, ফোলা এবং মুখ খুলতে অসুবিধার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আক্কেল দাঁতে ব্যথা হওয়ার কারণ কী?

আক্কেল দাঁত ওঠার সময় হালকা অস্বস্তি সবসময় বড় সমস্যা নয়। কিন্তু তীব্র বা বারবার হওয়া ব্যথার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

মাড়িতে সংক্রমণ

আংশিকভাবে বের হওয়া আক্কেল দাঁতের চারপাশে খাবার ও ব্যাকটেরিয়া জমে মাড়িতে সংক্রমণ হতে পারে। এই সমস্যাকে পেরিকোরোনাইটিস বলা হয়। এতে মাড়ি ফুলে যাওয়া, ব্যথা এবং কখনো কখনো জ্বর বা অসুস্থ লাগার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

দাঁতের ক্ষয়

আক্কেল দাঁত মুখের একেবারে পেছনে থাকায় ঠিকভাবে পরিষ্কার করা কঠিন হতে পারে। ফলে দাঁতে প্লাক জমে ক্ষয় হতে পারে। পাশের দাঁতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

মাড়ির রোগ

আক্কেল দাঁতের আশপাশ পরিষ্কার রাখা কঠিন হলে মাড়ির প্রদাহ বা মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনেক সময় পাশের দাঁতের মাড়িতেও সমস্যা তৈরি হয়।

দাঁত কাত হয়ে ওঠা

জায়গার অভাবে আক্কেল দাঁত সামনের দাঁতের দিকে কাত হয়ে উঠতে পারে। আবার কখনো মাড়ির নিচেই আটকে থাকতে পারে। এ ধরনের অবস্থায় ব্যথা, সংক্রমণ ও আশপাশের দাঁতে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আক্কেল দাঁত উঠলেই কি তুলে ফেলতে হয়?

না। আক্কেল দাঁত থাকলেই সেটি তুলে ফেলতে হবে, এমন নয়।

যদি দাঁতটি স্বাভাবিকভাবে ওঠে, পরিষ্কার রাখা যায় এবং কোনো ব্যথা বা রোগের কারণ না হয়, তাহলে সাধারণত সেটি পর্যবেক্ষণে রাখা যায়। NHS-এর তথ্য অনুযায়ী, সমস্যা তৈরি না করলে আক্কেল দাঁত সাধারণত রেখে দেওয়া হয় এবং নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের সময় সেটি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

তবে দাঁতটি বারবার সংক্রমণ, তীব্র ব্যথা, দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির রোগ, সিস্ট বা অন্য কোনো সমস্যা তৈরি করলে ডেন্টিস্ট চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে পারেন। প্রয়োজনে দাঁতের অবস্থান বোঝার জন্য এক্স-রে করা হয়।

ব্যথা হলে কখন ডেন্টিস্টের কাছে যাবেন?

আক্কেল দাঁতের ব্যথা কয়েক দিন ধরে থাকলে বা বারবার ফিরে এলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে মাড়ি বা মুখ ফুলে গেলে, মুখ খুলতে কষ্ট হলে, জ্বর হলে, মুখে দুর্গন্ধ বা খারাপ স্বাদ অনুভূত হলে কিংবা ব্যথা বাড়তে থাকলে দ্রুত ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কারণ শুধু ব্যথার ওষুধ খেয়ে উপসর্গ কমিয়ে রাখলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হয় না। দাঁতটি কী অবস্থায় আছে এবং আশপাশের মাড়ি ও দাঁতে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।

আক্কেল দাঁত মানুষের স্বাভাবিক দাঁতেরই অংশ। তবে অন্য দাঁতের তুলনায় এটি দেরিতে ওঠে এবং মুখের পেছনে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেকের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই আক্কেল দাঁত উঠলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার তীব্র ব্যথা বা ফোলাকেও স্বাভাবিক ভেবে ফেলে রাখা ঠিক নয়। দাঁতের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ডেন্টিস্টই বলতে পারবেন চিকিৎসা বা দাঁত তোলার প্রয়োজন আছে কি না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা