logo

ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ৭ উপায়, কোন অভ্যাসগুলো বদলাবেন

ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ৭ উপায়, কোন অভ্যাসগুলো বদলাবেন
ছবি: সাইন্স এলার্ট

ক্যানসার এমন একটি রোগ, যার নাম শুনলেই অনেকের মনে ভয় তৈরি হয়। শরীরের কোনো কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করলে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার হতে পারে। তবে ক্যানসার মানেই সবসময় অনিবার্য পরিণতি নয়। অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা গেলে ক্যানসারের বোঝা কমানো সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে নতুন ক্যানসার আক্রান্তের প্রায় ৩৭ শতাংশ এমন কারণের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যেগুলো প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর মধ্যে তামাক, সংক্রমণ, অ্যালকোহল, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ ও অতিবেগুনি রশ্মির মতো বিষয় রয়েছে।

অর্থাৎ ক্যানসার পুরোপুরি ঠেকানোর কোনো একক উপায় নেই। তবে প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস বদলালে অনেক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

তামাক থেকে পুরোপুরি দূরে থাকুন

ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো তামাক বর্জন করা।

সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল, সাদাপাতা বা অন্য যেকোনো ধরনের তামাক শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু ফুসফুস নয়, মুখ, গলা, খাদ্যনালি, পাকস্থলী, যকৃত, মূত্রথলি এবং আরও কয়েকটি অঙ্গের ক্যানসারের সঙ্গে তামাকের সম্পর্ক রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, তামাক ক্যানসারের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিগুলোর একটি। তামাকের কোনো নিরাপদ মাত্রার ব্যবহার নেই। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও ক্ষতিকর।

তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান বা অন্য কোনো তামাকজাত পণ্য ব্যবহার না করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

খাবারের দিকে নজর দিন

খাদ্যাভ্যাস ক্যানসারের ঝুঁকির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যানসার হবে বা কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যানসার প্রতিরোধ করা যাবে।

ছবি: নিউজ মেডিকাল
ছবি: নিউজ মেডিকাল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে বেশি করে ফল ও শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য এবং কম প্রক্রিয়াজাত খাবার রাখার পরামর্শ দেয়। অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষিত মাংস নিয়মিত বেশি খাওয়ার অভ্যাস কমানো ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত সংরক্ষিত মাংস খাওয়ার সঙ্গে কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।

তাই খাবারের ক্ষেত্রে কোনো একটি উপাদানকে সম্পূর্ণ শত্রু না ভেবে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।

শরীরচর্চা করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

শুধু ওজন কমানোর জন্য নয়, ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শরীরচর্চার অভাব এবং অতিরিক্ত ওজন বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে অন্ত্র, স্তন, জরায়ু, কিডনি ও খাদ্যনালির কয়েক ধরনের ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

প্রতিদিন হাঁটা, সাইকেল চালানো, সিঁড়ি ব্যবহার করা বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্য কোনো শারীরিক কাজ করা যেতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি করাই মূল কথা।


অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন বা কমান

অ্যালকোহলও ক্যানসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। মুখ, গলা, খাদ্যনালি, যকৃত, বৃহদান্ত্র ও স্তনসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে অ্যালকোহল সেবনের সম্পর্ক রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অ্যালকোহল ক্যানসারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কার্সিনোজেন। তাই ক্যানসারের ঝুঁকি যতটা সম্ভব কমাতে অ্যালকোহল না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

প্রয়োজনীয় টিকা নিন

কিছু সংক্রমণ পরবর্তী সময়ে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা HPV এবং হেপাটাইটিস বি ভাইরাস উল্লেখযোগ্য।

HPV সংক্রমণের সঙ্গে জরায়ুমুখের ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রমণ যকৃতের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

HPV ও হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নির্দিষ্ট বয়স বা ঝুঁকির মানুষের জন্য সুপারিশ করা হতে পারে। তাই নিজের বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া উচিত।

অতিরিক্ত রোদ থেকে ত্বককে সুরক্ষা দিন

সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির অতিরিক্ত সংস্পর্শ ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় তীব্র রোদে থাকলে ত্বক ঢেকে রাখা, ছাতা ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যেতে পারে।

ছবি : স্টিভেন লিন
ছবি : স্টিভেন লিন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, অতিবেগুনি রশ্মি মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী এবং অতিরিক্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য রোদ একেবারে এড়িয়ে যেতে হবে। ভিটামিন ডির প্রয়োজন ব্যক্তিভেদে আলাদা এবং ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বায়ুদূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকে সতর্ক থাকুন

ক্যানসারের সব ঝুঁকি ব্যক্তিগত অভ্যাসের কারণে হয় না। পরিবেশ ও কর্মক্ষেত্রের কিছু উপাদানও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বায়ুদূষণ ফুসফুসের ক্যানসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। পাশাপাশি কিছু কর্মক্ষেত্রে অ্যাসবেস্টসসহ নির্দিষ্ট কার্সিনোজেনের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি থাকে।

যারা কারখানা, নির্মাণকাজ বা রাসায়নিকের সঙ্গে যুক্ত পেশায় কাজ করেন, তাদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক, সুরক্ষা পোশাক এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত।

না খেয়ে থাকলেই কি ক্যানসার ঠেকানো যায়?

সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকার বিষয়ে অনেক কথা বলা হয়। ভারতীয় একটি আলোচ্য প্রতিবেদনেও না খেয়ে থাকা বা উপবাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ছবি: সাইন্স
ছবি: সাইন্স

কিন্তু না খেয়ে থাকলেই ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়, এমন শক্ত প্রমাণ নেই। মানুষের ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় হিসেবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নির্দেশনা বলা যায় না।

একইভাবে, ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য সবার দীর্ঘ সময় উপবাস করা প্রয়োজন, এমন কথাও বলা ঠিক নয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, গর্ভাবস্থা, কম ওজন বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

ভিটামিন ডি কি ক্যানসার প্রতিরোধ করে?

ভিটামিন ডি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খেলেই ক্যানসার প্রতিরোধ হবে, এমন দাবি করা যায় না।

কারও ভিটামিন ডির ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা পূরণ করা যেতে পারে। কিন্তু ক্যানসার ঠেকানোর জন্য নিজের ইচ্ছায় বেশি মাত্রায় ভিটামিন ডি বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।

মানসিক চাপ কি ক্যানসারের সরাসরি কারণ?

মানসিক চাপ শরীর ও মনের ওপর নানা প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে খারাপ করতে পারে।

তবে মানসিক চাপ থাকলেই ক্যানসার হবে, এমন সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য মানসিক চাপকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার বদলে ভালো ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সামাজিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়ার দিকে নজর দেওয়া ভালো।

ক্যানসার প্রতিরোধের পাশাপাশি দ্রুত শনাক্ত করাও জরুরি

ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের কাশি, শরীরের কোথাও অস্বাভাবিক গাঁট, দীর্ঘদিনের রক্তপাত, মল বা প্রস্রাবে রক্ত, দীর্ঘস্থায়ী গিলতে সমস্যা বা কোনো ক্ষত দীর্ঘদিন না শুকানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ছবি : হেল্থ এভরিডে
ছবি : হেল্থ এভরিডে

তবে এসব লক্ষণ থাকলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। অনেক সাধারণ রোগেও একই ধরনের উপসর্গ হতে পারে। পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্যানসার দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া গেলে নিরাময়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে।


ক্যানসার মানেই কি প্রতিরোধ করা সম্ভব?

না। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু সব ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। বয়স, বংশগত কারণ, পরিবেশ এবং এমন কিছু বিষয়ও রয়েছে যেগুলো সবসময় ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

তাই কোনো ব্যক্তির ক্যানসার হলে তাকে তার জীবনযাত্রার জন্য দায়ী করা ঠিক নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রায় ৩৮ শতাংশ ক্যানসার ঝুঁকির কারণ এড়িয়ে এবং প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

ক্যানসার প্রতিরোধের কোনো জাদুকরি খাবার, ওষুধ বা একক নিয়ম নেই। বরং তামাক থেকে দূরে থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া এবং ক্ষতিকর পরিবেশগত সংস্পর্শ কমানোর মতো একাধিক অভ্যাস একসঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ক্যানসার নিয়ে ভয় না পেয়ে ঝুঁকির কারণগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস