logo
Advertisement

ফ্যাটি লিভার হলে কি চা খাওয়া যাবে, জানুন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ফ্যাটি লিভার হলে কি চা খাওয়া যাবে, জানুন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
ছবি: এনডিটিভি

সকালের নাশতা হোক কিংবা বিকেলের আড্ডা, এক কাপ চা অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। কিন্তু পরীক্ষায় যদি গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে, তখন অনেকেই চা খাওয়া নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। চা কি একেবারেই বন্ধ করতে হবে? নাকি কিছু পরিবর্তন করে আগের মতোই পান করা যাবে?

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভার থাকলেই চা পুরোপুরি বাদ দিতে হয় না। বরং চায়ের সঙ্গে কতটা চিনি, দুধ বা মিষ্টি উপাদান যোগ করা হচ্ছে, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এনডিটিভির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. অনন্যা মুখার্জি চা তৈরির ধরনে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন।

গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভার আসলে কী?

গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভারকে লিভারে চর্বি জমার প্রাথমিক বা মৃদু পর্যায় হিসেবে ধরা হয়। এই অবস্থায় লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমে। অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা গেলে লিভারে জমা চর্বি কমানো সম্ভব।

ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন প্রতিরোধ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো বিষয়গুলোর সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু একটি খাবার বাদ দেওয়ার চেয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন ঠিক করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভারে চা খাওয়া যাবে?

হ্যাঁ, সাধারণ চা পান করা মানেই ফ্যাটি লিভার আরও খারাপ হবে, এমন প্রমাণ নেই। চা পাতায় পলিফেনলের মতো উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে চা ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা বা রোগ সারানোর উপায়, এমন দাবিও করা ঠিক নয়। চা নিয়ে গবেষণায় সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও নির্দিষ্ট পরিমাণ চা পান করলে ফ্যাটি লিভার সেরে যাবে, এমন প্রমাণ নেই।

বরং সমস্যাটি অনেক সময় চায়ের সঙ্গে যোগ করা অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ ক্যালরির উপাদানে।

চায়ের মধ্যে চিনি কেন সমস্যা তৈরি করতে পারে?

ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মিষ্টি পানীয় থেকে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করলে মোট ক্যালরি বাড়ে এবং শরীরে বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস ফ্যাটি লিভারে অতিরিক্ত সাধারণ চিনি, বিশেষ করে মিষ্টি পানীয় কমানোর পরামর্শ দেয়।

এ কারণে প্রতিদিন কয়েক কাপ চায়ে যদি একাধিক চামচ চিনি দেওয়া হয়, তাহলে শুধু চা পাতাকে দায়ী করে লাভ নেই। চায়ের সঙ্গে যোগ হওয়া অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞও গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে পরিশোধিত চিনি ও কনডেন্সড মিল্কের মতো মিষ্টি উপাদান এড়িয়ে চলার কথা বলেছেন।

দুধ চায়ে কী করবেন?

দুধ পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। তবে অতিরিক্ত সর, ঘন দুধ বা কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে তৈরি অত্যন্ত ভারী চা নিয়মিত পান না করাই ভালো।

চাইলে কম চর্বিযুক্ত দুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে কম চর্বিযুক্ত দুধ বা চিনি ছাড়া উদ্ভিজ্জ দুধ ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কোন দুধ আপনার জন্য উপযুক্ত, তা নির্ভর করবে আপনার সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার ওপর।

কীভাবে চা খেলে তুলনামূলকভাবে ভালো?

গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে চায়ের অভ্যাসে কয়েকটি সহজ পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

চিনি কমান বা বাদ দিন: সাদা চিনি, ব্রাউন সুগার বা কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে চা মিষ্টি করার অভ্যাস থাকলে তা কমানো গুরুত্বপূর্ণ। চা যতটা সম্ভব কম মিষ্টি বা চিনি ছাড়া পান করা যেতে পারে।

অতিরিক্ত ঘন দুধ এড়িয়ে চলুন: খুব ঘন দুধ ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত উপাদান দিয়ে তৈরি চা নিয়মিত না খাওয়াই ভালো। প্রয়োজন হলে কম চর্বিযুক্ত দুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

চায়ের সঙ্গে বিস্কুট বা মিষ্টি কমান: অনেকের ক্ষেত্রে সমস্যা শুধু চায়ে নয়, চায়ের সঙ্গে নিয়মিত বিস্কুট, কেক, মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাসে। ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে মোট খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ, ফল এবং উপযুক্ত পরিমাণ প্রোটিন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

চায়ের ওপর ভরসা করে থাকবেন না: চায়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকলেও শুধু চা পান করে ফ্যাটি লিভার কমানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে ওজন, খাবার এবং শারীরিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফ্যাটি লিভার কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী?

গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে শুধু চায়ের ধরন পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট নয়। ওজন বেশি থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেসের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকলে শরীরের ওজনের অন্তত ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারে জমা চর্বি কমতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমালে লিভারের প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসও কমতে পারে। তবে ওজন কমানো ধীরে ধীরে করা উচিত।

অর্থাৎ প্রতিদিনের চা নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে পুরো জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রিন টি কি বেশি উপকারী?

চা নিয়ে গবেষণার একটি বড় অংশ গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি নিয়ে হয়েছে। কিছু গবেষণায় চা পান এবং লিভারের স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্ভাব্য ইতিবাচক সম্পর্ক দেখা গেছে। কিন্তু চা ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা করতে পারে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সাধারণ চা এবং ঘন চা নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট এক জিনিস নয়। বিশেষ করে উচ্চমাত্রার গ্রিন টি নির্যাস কিছু মানুষের ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তাই ফ্যাটি লিভার কমানোর আশায় নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার চা নির্যাস বা ভেষজ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে আর কী কী বদলাবেন?

চায়ের পাশাপাশি কয়েকটি অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া দরকার।

মিষ্টি পানীয় কমান: কোমল পানীয়, মিষ্টি জুস ও অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয়ের পরিমাণ কমানো জরুরি।

শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। এমনকি ওজন না কমলেও শারীরিক কার্যকলাপের উপকার রয়েছে।

পরিমাণ বুঝে খাবার খান: অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ও বড় পরিমাণে খাবার খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন: শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ, ফল এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন বা কমান: ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে অ্যালকোহল লিভারের ওপর অতিরিক্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে এক কাপ চায়ের সিদ্ধান্ত কী?

গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভার ধরা পড়েছে বলে এক কাপ চা দেখলেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। মূল বিষয় হলো চাটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং আপনার সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস কেমন।

চিনি ও কনডেন্সড মিল্কের মতো অতিরিক্ত মিষ্টি উপাদান বাদ দিয়ে বা কমিয়ে, প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা দুধ ব্যবহার করে চা পান করা যেতে পারে। তবে ফ্যাটি লিভার কমানোর মূল কাজটি করবে সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর ওজন, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ।

আর আল্ট্রাসাউন্ডে গ্রেড ১ ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লেই নিজের মতো করে কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে চিকিৎসকের সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা ভালো।

সূত্র: এনডিটিভি