বালিশ রোদে দিলে কি ঘাড়ে ব্যথায় উপকার হয়, যা বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান

সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘাড় শক্ত হয়ে আছে, মাথা ডানে-বাঁয়ে ঘোরাতে কষ্ট হচ্ছে বা ঘাড়ের পেশিতে ব্যথা করছে। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। তখন অনেকেই প্রথমে নিজের বালিশটির দিকে নজর দেন। বালিশ অনেক পুরনো হয়ে গেছে কি না, বেশি নরম বা বেশি শক্ত কি না, কিংবা দীর্ঘদিন ব্যবহার করার কারণে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে কি না, এসব প্রশ্ন মনে আসে।
আমাদের দেশে ঘাড়ে ব্যথা হলে বালিশ রোদে দেওয়ার একটি প্রচলিত ঘরোয়া অভ্যাস রয়েছে। অনেকে মনে করেন, ভালো করে রোদে দিলে বালিশের জীবাণু ও স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর হয় এবং ঘাড়ের ব্যথাও কমে। কিন্তু বালিশ রোদে দিলেই ঘাড়ের ব্যথা সেরে যায়, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। তবে বালিশ শুকনো ও পরিষ্কার রাখার কিছু স্বাস্থ্যগত সুবিধা রয়েছে, যা ঘুমের পরিবেশ ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বালিশ রোদে দিলে কী হয়?
ঘুমানোর সময় আমাদের শরীর থেকে ঘাম, ত্বকের তেল ও মৃত কোষ বালিশে জমতে পারে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে বালিশে ধুলা, অ্যালার্জেন এবং ডাস্ট মাইটের মতো উপাদান জমার সুযোগ তৈরি হয়। বালিশে আর্দ্রতা থাকলে ছত্রাক বা অন্যান্য জীবাণুর বৃদ্ধির পরিবেশও তৈরি হতে পারে।
রোদে বা ভালো বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় বালিশ শুকিয়ে নিলে এর ভেতরের আর্দ্রতা কমতে পারে। এতে বালিশকে শুকনো ও সতেজ রাখতে সাহায্য হয়। তবে শুধু রোদে দেওয়া বালিশকে পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত করে ফেলে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয়।
বালিশ পরিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে ধোয়া ও পুরোপুরি শুকিয়ে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বালিশ রোদে দিলে কি ঘাড়ের ব্যথা কমে?
সরাসরি উত্তর হলো, শুধু বালিশ রোদে দেওয়াকে ঘাড়ের ব্যথার চিকিৎসা হিসেবে ধরা যাবে না।
ঘাড়ের ব্যথা হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। ভুল ঘুমের ভঙ্গি, অতিরিক্ত উঁচু বা নিচু বালিশ, দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মুঠোফোনের দিকে ঝুঁকে থাকা, পেশিতে টান কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেও ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে।
তবে বালিশ যদি স্যাঁতসেঁতে, চ্যাপ্টা বা আকার হারিয়ে ফেলে, তাহলে মাথা ও ঘাড়কে যথাযথভাবে সাপোর্ট দিতে নাও পারে। সঠিক সাপোর্ট না পাওয়া ঘুমের সময় ঘাড়ের অবস্থানকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে। উপযুক্ত বালিশ ঘাড়কে স্বাভাবিক অবস্থানে রাখতে সহায়তা করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বালিশের উচ্চতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ঘাড়ে ব্যথা থাকলে শুধু বালিশ নরম না শক্ত, তা দেখলেই হবে না। এর উচ্চতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বালিশ এতটা উঁচু হওয়া উচিত নয় যে মাথা সামনের দিকে উঠে যায়। আবার এতটা নিচুও হওয়া ঠিক নয় যে মাথা ও ঘাড় নিচের দিকে বেঁকে থাকে।
চিত হয়ে ঘুমালে এমন বালিশ দরকার, যা ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁককে সাপোর্ট দেয়। পাশ ফিরে ঘুমালে মাথা ও ঘাড় যেন মেরুদণ্ডের সঙ্গে মোটামুটি একই সরল রেখায় থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। হার্ভার্ড হেলথও ঘাড়ের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে ঘুমের ভঙ্গি ও বালিশের সঠিক সাপোর্টের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বালিশ পুরনো হলে কী সমস্যা হতে পারে?
সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বালিশের ভেতরের উপাদান চ্যাপ্টা বা দলা পাকানো হয়ে যেতে পারে। ফলে আগের মতো সাপোর্ট নাও দিতে পারে।
বালিশের আকার নষ্ট হয়ে গেলে ঘুমের সময় মাথা ও ঘাড়ের অবস্থান বদলে যেতে পারে। এর ফলে সকালে ঘাড় শক্ত লাগা বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
বালিশে দুর্গন্ধ, দাগ, দলা পাকানো ভরাট অংশ বা পর্যাপ্ত সাপোর্ট না থাকার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সেটি বদলানোর কথা বিবেচনা করা উচিত। সাধারণভাবে অনেক বালিশ এক থেকে দুই বছর পর বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে, যদিও উপাদান ও ব্যবহারের ওপর এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে।
শুধু রোদে দিলেই কি বালিশ পরিষ্কার হয়ে যায়?
এখানে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা দরকার। বালিশ রোদে দেওয়া আর বালিশ পরিষ্কার করা এক বিষয় নয়।
রোদে দিলে বালিশের আর্দ্রতা কমতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি সতেজ রাখতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু বালিশে জমে থাকা ঘাম, ত্বকের তেল, মৃত কোষ, ধুলা ও অন্যান্য ময়লা দূর করার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ধোয়া বা পরিষ্কার করা দরকার।
সব বালিশ একইভাবে ধোয়া যায় না। কিছু বালিশ মেশিনে ধোয়া যায়, আবার মেমরি ফোমের মতো কিছু বালিশ পানিতে ভেজানো ঠিক নয়। তাই বালিশের গায়ে থাকা পরিষ্কার করার নির্দেশনা মেনে চলা সবচেয়ে নিরাপদ।

বালিশ রোদে দেওয়ার সময় কী খেয়াল রাখবেন?
বালিশ রোদে দেওয়ার অভ্যাস থাকলে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা ভালো।
- বালিশের গায়ের পরিষ্কার করার নির্দেশনা আগে দেখে নিন
- ধোয়ার পর বালিশ পুরোপুরি শুকিয়ে নিন
- বালিশের ভেতরেও আর্দ্রতা রয়ে গেছে কি না নিশ্চিত করুন
- বালিশ মাঝে মাঝে উল্টে দিন, যাতে সব দিক ভালোভাবে শুকাতে পারে
- অতিরিক্ত তাপ বা রোদে কোনো উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কি না, তা বিবেচনা করুন
- পালক বা বিশেষ ধরনের বালিশ হলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে চলুন
বিশেষ করে পালক বা অন্যান্য সংবেদনশীল উপাদানের বালিশের ক্ষেত্রে সরাসরি তীব্র রোদ সবসময় উপযুক্ত নয়। তাই বালিশের ধরন অনুযায়ী শুকানোর পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত।
ঘাড়ে ব্যথা হলে আর কী করতে পারেন?
ঘাড়ের ব্যথা হালকা হলে কিছু সাধারণ ব্যবস্থা আরাম দিতে পারে। যেমন, গরম বা ঠান্ডা সেঁক, হালকা নড়াচড়া এবং দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় বসে না থাকা। মুঠোফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের সময় ঘাড় অনেকক্ষণ নিচু করে রাখাও এড়িয়ে চলা ভালো।
ঘাড়ের ব্যথা যদি ঘুম থেকে ওঠার পর বেশি হয়, তাহলে নিজের ঘুমের ভঙ্গি ও বালিশের উচ্চতা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
তবে ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে বা বারবার ফিরে এলে শুধু বালিশ পরিবর্তন করে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। কারণ ঘাড়ের ব্যথার পেছনে অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে।
কোন লক্ষণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
ঘাড়ের সাধারণ ব্যথা অনেক সময় নিজে থেকেই কমে যায়। কিন্তু কিছু লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন-
- ব্যথা কয়েক দিনেও না কমা
- ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকা
- হাত বা আঙুলে ঝিনঝিনি হওয়া
- হাত দুর্বল বা অবশ লাগা
- ব্যথা ঘাড় থেকে হাতের দিকে ছড়িয়ে যাওয়া
- আঘাতের পর ঘাড়ে তীব্র ব্যথা শুরু হওয়া
- জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
বিশেষ করে দুর্ঘটনা বা আঘাতের পর ঘাড়ে ব্যথা হলে নিজে থেকে ঘাড় মটকানো বা জোরে মালিশ করা উচিত নয়।
তাহলে ঘাড়ে ব্যথা হলে বালিশ রোদে দেবেন?
বালিশ রোদে দেওয়া ঘাড়ের ব্যথার সরাসরি চিকিৎসা নয়। তবে বালিশ শুকনো ও পরিষ্কার রাখতে এটি কিছু ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে বালিশে আর্দ্রতা জমে থাকলে সেটি ভালোভাবে শুকানো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ঘাড়ের ব্যথা কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাথা ও ঘাড়ের জন্য উপযুক্ত সাপোর্ট নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বালিশ নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজন হলে পুরনো বালিশ পরিবর্তন করাও জরুরি।
ঘাড়ে ব্যথা হলেই বালিশ রোদে দিলেই ব্যথা সেরে যাবে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। রোদে দিলে বালিশের আর্দ্রতা কমতে পারে এবং ঘুমের পরিবেশ সতেজ রাখতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু ঘাড়ের ব্যথার মূল কারণ যদি ভুল ঘুমের ভঙ্গি, অনুপযুক্ত বালিশ, পেশিতে টান বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা হয়, তাহলে শুধু বালিশ রোদে দিয়ে সেই সমস্যা দূর হবে না।
তাই ঘাড়ে ব্যথা থাকলে প্রথমে বালিশের উচ্চতা ও সাপোর্ট ঠিক আছে কি না দেখুন। বালিশ পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন এবং প্রয়োজন হলে সেটি বদলে ফেলুন। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা হাত অবশ হওয়া, দুর্বলতা কিংবা তীব্র ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: টিভি ৯