ইসবগুল খাওয়ার এই উপকারগুলো জানেন কি

কোষ্ঠকাঠিন্য হলেই অনেকের মনে পড়ে ইসবগুলের ভুসির কথা। পানিতে মিশিয়ে খাওয়া এই পরিচিত খাবারটি দীর্ঘদিন ধরে পেট পরিষ্কার রাখতে ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে ইসবগুলের উপকারিতা শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক ধরনের দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ, যা হজমের পাশাপাশি রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা সহায়তা করতে পারে।
তবে ইসবগুলকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বিশেষ করে ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে ইসবগুল নিয়ে যে দাবি করা হয়, তার পেছনে সম্ভাব্য কিছু প্রক্রিয়া থাকলেও সরাসরি ক্যানসার প্রতিরোধ করে, এমন শক্ত প্রমাণ এখনো সীমিত।
ইসবগুল কী?
ইসবগুলের ভুসি মূলত Plantago ovata উদ্ভিদের বীজের বাইরের আবরণ থেকে তৈরি। এতে প্রচুর পরিমাণে দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ থাকে। পানির সংস্পর্শে এলে এই আঁশ পানি শোষণ করে জেলির মতো পদার্থ তৈরি করে। ফলে মল নরম হয় এবং সহজে বের হতে সাহায্য করে।
এ কারণেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ইসবগুল বেশ পরিচিত একটি ফাইবার সাপ্লিমেন্ট।
কোষ্ঠকাঠিন্যে ইসবগুল কীভাবে কাজ করে?
ইসবগুল পানির সঙ্গে মিশে অন্ত্রে মলের পরিমাণ বাড়াতে এবং মলকে নরম রাখতে সাহায্য করে। ফলে মলত্যাগ সহজ হয়।
গবেষণাতেও কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে ইসবগুলের উপকার পাওয়া গেছে। টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় ইসবগুল গ্রহণকারীদের কোষ্ঠকাঠিন্যের উপসর্গের উন্নতি দেখা যায়।
তবে ইসবগুল খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি কম খেলে উল্টো পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে এবং বিরল ক্ষেত্রে অন্ত্রে বাধা তৈরির ঝুঁকিও থাকে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে
ইসবগুলের দ্রবণীয় আঁশ খাবার হজম ও কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি ধীর করতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ে করা একাধিক গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণেও ইসবগুল গ্রহণের সঙ্গে ফাস্টিং ব্লাড সুগার ও HbA1c কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাগুলোর মধ্যে পার্থক্য ছিল এবং ইসবগুল কোনোভাবেই ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প নয়।
তাই ডায়াবেটিস থাকলে ইসবগুল খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ ও খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা জরুরি।
কোলেস্টেরল কমাতেও উপকারী হতে পারে
ইসবগুলের দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে পিত্ত অ্যাসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীর থেকে তা বের হতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে শরীরকে নতুন পিত্ত অ্যাসিড তৈরিতে রক্তের কোলেস্টেরল ব্যবহার করতে হয় এবং LDL বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা কমতে পারে।
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ে করা গবেষণাগুলোতেও ইসবগুল গ্রহণের পর LDL কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে কারও কোলেস্টেরল বেশি থাকলে শুধু ইসবগুলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধই মূল বিষয়।
ইসবগুল কি ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়?
এই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা সতর্ক থাকা দরকার।
মূল প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত খাদ্যআঁশ গ্রহণ অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসবগুল খাদ্যআঁশের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। ইসবগুল অন্ত্রে মল দ্রুত বের হতে সাহায্য করায় ক্ষতিকর উপাদানের সঙ্গে অন্ত্রের দেয়ালের সংস্পর্শের সময় কমতে পারে। এর পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাদ্য হিসেবে কাজ করা এবং শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরিতে সহায়তা করার মতো সম্ভাব্য উপকার নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে এখান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে ইসবগুল খেলেই ক্যানসার প্রতিরোধ হবে। বরং পর্যাপ্ত খাদ্যআঁশযুক্ত খাবার খাওয়া সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ। ইসবগুলকে ক্যানসারের প্রতিরোধক ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
প্রতিদিন ইসবগুল খাওয়া কি নিরাপদ?
বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য উপযুক্ত পরিমাণে ইসবগুল সাধারণত নিরাপদ। তবে শুরুতে বেশি পরিমাণে খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা পেটের অস্বস্তি হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের গিলতে সমস্যা আছে, অন্ত্রে কোনো বাধা রয়েছে বা গুরুতর পেটের সমস্যা আছে, তাদের ইসবগুল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিয়মিত ওষুধ খেলেও চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলা ভালো, কারণ খাদ্যআঁশ কিছু ওষুধের শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে।
কীভাবে ইসবগুল খেলে উপকার পাবেন?
ইসবগুল সাধারণত পানি বা অন্য কোনো তরলে মিশিয়ে খাওয়া হয়। মিশিয়ে রাখার পর বেশি সময় অপেক্ষা না করে খেয়ে নেওয়া এবং পরে পর্যাপ্ত পানি পান করা ভালো।
তবে ঠিক কতটা ইসবগুল খেতে হবে, তা ব্যক্তির বয়স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। তাই দীর্ঘদিন নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শুধু ইসবগুল খেলেই কি ফাইবারের চাহিদা পূরণ হবে?
না। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক আঁশযুক্ত খাবার থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ থেকে খাদ্যআঁশ পাওয়া যায়।
ইসবগুল প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ফাইবারের উৎস হিসেবে কাজে আসতে পারে। কিন্তু এটিকে সুষম খাবারের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ইসবগুল শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ঘরোয়া উপায় নয়। এর দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ হজমের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, মলত্যাগ সহজ করতে এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা ও LDL কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। গবেষণায় এসব উপকারের পক্ষে প্রমাণও রয়েছে।
তবে ইসবগুলকে কোনো রোগের ওষুধ বা ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আর ইসবগুল খেলে পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে বা দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে ইসবগুল ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
