অ্যালার্ম আবিষ্কারের আগে ঘুম ভাঙানোর নানা কৌশল

আধুনিক অ্যালার্ম ক্লক না থাকলেও মানুষ সময়মতো ঘুম ভাঙানোর জন্য নানা কৌশল বের করেছিল বহু আগে থেকেই। শিল্পযুগের ব্রিটেন থেকে প্রাচীন চীনের মোমের ঘড়ি; ইতিহাসে মানুষকে জাগানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে সৃজনশীল যন্ত্র ও পদ্ধতি।
শিল্পযুগে ঘুম ভাঙানো
ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের সময় নতুন কারখানাগুলোতে সময়ের অতি কঠোর নিয়মের প্রয়োজন পড়েছিল। শ্রমিকরা যদি পাঁচ মিনিটও দেরি করত, পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে যেত। সেই সময়ের অ্যালার্ম ক্লক সাধারণ শ্রমিকদের কাছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল।
কারখানাগুলো প্রথমে হুইসেল বা ঘণ্টার আওয়াজ ব্যবহার করলেও সেগুলো প্রায়ই নির্ভরযোগ্য ছিল না। তাই মানুষের উপর নির্ভর করে একটি নতুন পেশা জন্ম নিল নক্কার আপার (Knocker upper)।
নক্কার আপাররা রাস্তায় হাঁটত, জানালায় টোকা দিত বা শিমের দানা ছুঁড়ে ঘুমন্ত মানুষদের জাগাতেন। তাদের কাজ ছিল নিশ্চিত হওয়া যে প্রতিটি গ্রাহক সঠিক সময়ে জাগছে। কখনও কখনও তারা পুরো পাড়া জুড়ে কাজ করত।
প্রাচীন ও আধুনিক অন্যান্য সমাজেও এমন কাজের নজির পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম সম্প্রদায়ে রমজানের সময় সূর্যোদয়ের আগে প্রার্থনা এবং সেহরির জন্য মানুষকে ঘুম থেকে ওঠাতে সাহায্য করার ব্যবস্থা ছিল।
প্রাকৃতিক এবং প্রাণীভিত্তিক সংকেত
অ্যালার্ম ক্লকের আগেও মানুষ ঘুম থেকে উঠত প্রাকৃতিক সংকেত এবং দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী। দিনের আলো, সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত ছিল ঘুম ও জাগরণের প্রধান নির্দেশক।
মোরগের ডাক ঘুম ভাঙানোর প্রাথমিক শব্দঘণ্টা হিসেবে কাজ করত। গবেষণায় দেখা গেছে, মোরগ শুধু আলো দেখে নয়, তাদের নিজস্ব সার্কেডিয়ান রিদম অনুযায়ী ডাক দেয়।
অতীতের কৃষিজীবী বা গ্রামীণ সমাজে মানুষ প্রায়শই রাতে দুটি পর্যায়ে ঘুমাত। সেই সময়ে ঘণ্টা বা ঘণ্টার আওয়াজও ব্যবহৃত হত, বিশেষ করে ইউরোপের মধ্যযুগ ও প্রাথমিক আধুনিক সময়ে।
প্রাচীন ঘড়ি ও অ্যালার্ম
প্রথম অ্যালার্ম ঘড়ি বা ঘুম ভাঙানোর যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে
নক্কার আপারদের যুগ
শিল্প বিপ্লবের শহরগুলোতে লিডস, ম্যানচেস্টার, শেফিল্ড ও লন্ডনের পূর্বাংশে নক্কার আপাররা রাতভর ঘুম ভাঙাত, কখনও সকাল ৩টায়। তারা শুধু মানুষকে জাগাত না, রাতের অদ্ভুত ঘটনা নজরে আনত। এক নক্কার আপার ১৮৭৬ সালে ব্র্যাডফোর্ডে রাত ২টায় আগুনের খবর দিয়ে পরিবারের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। এছাড়াও ১৮৮৮ সালে জ্যাক দ্য রিপারের প্রথম শিকার, মেরি নিকলসের মৃতদেহের খবরও নক্কার আপারের মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম ক্লক সুলভ ও সাধারণ হয়ে যাওয়ায় ১৯২০-এর দশকে এই পেশা প্রায় বিলুপ্ত হয়।
ঘুম ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত শিক্ষা
প্রাচীন সমাজে মানুষের ঘুমের সময়সূচি আজকের তুলনায় অনেকটাই নিয়মিত ছিল। প্রাতঃকালের আলো ও ধারাবাহিক ঘুম-জাগরণের রুটিন সুস্থ্য জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ঘুমের সময় মস্তিষ্ক ও শরীরের স্বাভাবিক ঘড়িকে ঠিক রাখে এবং রাতের ঘুমকে আরও স্বাস্থ্যকর করে
ইতিহাসে মানুষ সবসময় ঘুম থেকে উঠার জন্য নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করেছে প্রাকৃতিক সংকেত থেকে শুরু করে জটিল যান্ত্রিক ঘড়ি। আমাদেরও অতীতের অভ্যাস থেকে শেখার আছে। প্রাতঃকালীন আলো, নিয়মিত ঘুম এবং ঘুমের আগে জীবনযাত্রার সঠিক পরিকল্পনা আমাদের সুস্থ ও সময়মতো জাগার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে
সূত্র : বিবিসি


