সকালের নাশতার পর পেট ফুলে যায়, স্বস্তি দিতে পারে এই ৭ খাবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করার পর অনেকেরই পেট ভারী লাগে। কারও পেট ফুলে যায়, কারও আবার ঢেঁকুর, গ্যাস বা অস্বস্তি শুরু হয়। অনেকে মনে করেন, নাশতা বেশি খাওয়ার কারণেই এমন হচ্ছে। কিন্তু শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, কী খাচ্ছেন সেটিও পেট ফাঁপা বা ব্লোটিংয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে এমন কিছু খাবার রয়েছে, যেগুলো কারও কারও ক্ষেত্রে সহজে হজম হয় না এবং পেটে গ্যাস বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে কিছু সহজপাচ্য খাবার সকালের নাশতায় রাখলে পেট তুলনামূলক আরামদায়ক থাকতে পারে।
সম্প্রতি গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি সকালের নাশতায় এমন সাতটি খাবারের কথা জানিয়েছেন, যেগুলো পেট ফাঁপার প্রবণতা থাকা ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী হতে পারে। তালিকায় রয়েছে ওটস, চিয়া বীজ, ডিম, টকদই, কিউই, কলা, বাদাম, ডোসা এবং পালং শাকের মতো খাবার।
তবে মনে রাখতে হবে, ব্লোটিংয়ের কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কোনো খাবার একজনের জন্য আরামদায়ক হলেও অন্যজনের ক্ষেত্রে গ্যাস বা পেট ফাঁপা বাড়াতে পারে।
সকালের নাশতার পর পেট ফুলে যায় কেন?
পেট ফাঁপা বা ব্লোটিং খুব সাধারণ একটি হজমের সমস্যা। বেশি পরিমাণে খাবার খাওয়া, দ্রুত খাওয়া, কিছু খাবারে অসহিষ্ণুতা, অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হওয়া কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো বিভিন্ন কারণে এটি হতে পারে।
কিছু খাবারে এমন কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা অন্ত্রে সহজে শোষিত না হয়ে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে গাঁজন হতে পারে। এর ফলে গ্যাস তৈরি হয়ে পেট ফুলে যাওয়ার অনুভূতি হতে পারে।
তাই সকালে এমন খাবার বেছে নেওয়া ভালো, যা আপনার শরীর সহজে সহ্য করে এবং যাতে পর্যাপ্ত আঁশ ও প্রোটিন থাকে।
পেট ফাঁপা কমাতে সকালের নাশতায় যে ৭ খাবার রাখতে পারেন
ওটস, চিয়া বীজ ও ব্লুবেরি
সকালের নাশতায় ওটসের সঙ্গে চিয়া বীজ ও অল্প ব্লুবেরি রাখা যেতে পারে। ওটস ও চিয়া বীজে আঁশ রয়েছে। আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচল ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে চিয়া বীজ পানিতে ভিজিয়ে খেলে এতে দ্রবণীয় আঁশ পাওয়া যায়। অন্যদিকে অল্প পরিমাণ ব্লুবেরি অনেকের জন্য সহজে সহ্যযোগ্য হতে পারে।
তবে যাদের খাদ্যতালিকায় হঠাৎ করে বেশি আঁশ যোগ করার অভ্যাস নেই, তারা শুরুতেই বেশি চিয়া বীজ বা ওটস না খাওয়াই ভালো। একসঙ্গে অতিরিক্ত আঁশ খেলে উল্টো গ্যাস বাড়তে পারে।
ডিম ও টক রুটি
ডিম প্রোটিনের ভালো উৎস। ডিমের সঙ্গে টক রুটি খেতে পারেন।
ডা. সৌরভ শেঠির মতে, ডিমে গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট প্রায় নেই। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি এমন নাশতার তুলনায় সহজে সহ্য হতে পারে, যেগুলোতে বেশি গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী টক রুটিও কিছু মানুষের কাছে সাধারণ রুটির তুলনায় সহজপাচ্য হতে পারে।
তবে রুটি খাওয়ার পর কারও যদি গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা বাড়ে, তাহলে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা জরুরি।
সাধারণ ডোসা
ফারমেন্ট করা চাল ও ডালের ব্যাটার দিয়ে তৈরি সাধারণ ডোসাও সকালের নাশতার জন্য একটি বিকল্প হতে পারে।
ফারমেন্টেশনের কারণে ব্যাটারের গঠন ও স্বাদে পরিবর্তন আসে। ডা. শেঠি সাধারণ ডোসাকে তুলনামূলক সহজপাচ্য নাশতার একটি বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সঙ্গে অল্প সাম্বার রাখা যেতে পারে।
তবে ডোসার সঙ্গে বেশি তেল, মাখন বা ভারী পুর ব্যবহার করলে খাবারটি আর আগের মতো হালকা নাও থাকতে পারে।
ল্যাকটোজমুক্ত গ্রিক দই ও স্ট্রবেরি
দুধ বা সাধারণ দই খেলে যাদের পেট ফাঁপে, তাদের ক্ষেত্রে ল্যাকটোজমুক্ত গ্রিক দই একটি বিকল্প হতে পারে।
গ্রিক দইয়ে প্রোটিন থাকে। ল্যাকটোজমুক্ত হলে দুধের ল্যাকটোজের কারণে যাদের অস্বস্তি হয়, তাদের জন্য এটি তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে। এর সঙ্গে স্ট্রবেরি যোগ করা যায়।
তবে দই বা দুগ্ধজাত খাবার খেলেই যদি আপনার পেট ফুলে যায়, তাহলে শুধু ল্যাকটোজমুক্ত লেখা দেখেই বেশি পরিমাণে খাওয়া উচিত নয়। ব্যক্তিগত সহ্যক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
কিউই ও ভেজানো চিয়া বীজ
কিউই ফল ও চিয়া বীজ দিয়েও সকালের নাশতা তৈরি করা যায়।
কিউই নিয়মিত পায়খানা হতে সহায়তা করতে পারে। আর পানিতে ভেজানো চিয়া বীজে দ্রবণীয় আঁশ থাকে। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে পেট ভারী ও ফাঁপা লাগতে পারে। তাই নিয়মিত মলত্যাগে সহায়ক খাবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্লোটিং কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে চিয়া বীজ খাওয়ার সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কলা, ওটস ও আখরোট
কলা, ওটস ও আখরোট দিয়ে সহজ একটি নাশতা তৈরি করা যায়। এই তিনটি খাবার থেকে আঁশ, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি পাওয়া যায়।
কলা অনেকের জন্য সহজপাচ্য ফল হলেও সবার শরীর একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তাই কলা খাওয়ার পর যদি আপনার গ্যাস বা পেট ফাঁপা বাড়ে, তাহলে পরিমাণ কমিয়ে দেখতে পারেন।
পালং শাক ও ডিমের অমলেট
সকালের নাশতায় পালং শাক দিয়ে ডিমের অমলেটও রাখা যেতে পারে।
ডিম থেকে প্রোটিন এবং পালং শাক থেকে বিভিন্ন পুষ্টি ও আঁশ পাওয়া যায়। ডা. শেঠির মতে, এই খাবারে গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট তুলনামূলক কম থাকে।
তবে অমলেটে পেঁয়াজ বা রসুন দিলে যাদের পেট ফাঁপে, তারা এগুলো বাদ দিতে পারেন। কারণ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেঁয়াজ ও রসুন ব্লোটিংয়ের সমস্যা বাড়াতে পারে।
শুধু খাবার বদলালেই কি ব্লোটিং কমবে?
সবসময় নয়। পেট ফাঁপার পেছনে খাবার ছাড়াও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। খুব দ্রুত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া, খাবারে অসহিষ্ণুতা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা অন্য কোনো হজমের সমস্যার কারণেও এটি হতে পারে।
তাই নাশতা পরিবর্তনের পাশাপাশি ধীরে ধীরে খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং কোন খাবারের পর সমস্যা বাড়ছে তা লক্ষ্য করা উপকারী হতে পারে।
কোন খাবারে আপনার পেট ফাঁপে, তা খেয়াল করুন
একটি খাবারকে সবার জন্য ব্লোটিংয়ের কারণ বা সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
উদাহরণ হিসেবে, দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে দুধ খাওয়ার পর পেট ফাঁপতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শস্য, ডাল, পেঁয়াজ বা রসুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই খাবারের একটি তালিকা তৈরি করে কোন খাবারের পর কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা কয়েক দিন লক্ষ্য করা যেতে পারে। এতে নিজের জন্য উপযোগী নাশতা বেছে নেওয়া সহজ হতে পারে।
সকালের নাশতা কেমন হওয়া ভালো?
পেট ফাঁপার প্রবণতা থাকলে সকালের নাশতা খুব ভারী না করে সহজ ও পরিমিত রাখা যেতে পারে। নাশতায় চেষ্টা করতে পারেন-
- পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখতে
- আঁশযুক্ত খাবার যোগ করতে
- অতিরিক্ত তেল ও চিনি কমাতে
- খুব দ্রুত না খেতে
- পর্যাপ্ত পানি পান করতে
- নিজের শরীরে কোন খাবার সমস্যা তৈরি করছে তা লক্ষ্য করতে
ওটস, ডিম, দই, ফল, চিয়া বীজ বা সবজির মতো খাবার দিয়ে সহজ নাশতা তৈরি করা যায়। তবে একই খাবার সবার জন্য উপযুক্ত হবে না।
কখন পেট ফাঁপা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাঝেমধ্যে পেট ফাঁপা সাধারণ সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এটি যদি নিয়মিত হয় বা প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি করে, তাহলে কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে পেট ফাঁপার সঙ্গে যদি দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, বারবার বমি, মলে রক্ত, অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ সব ধরনের ব্লোটিং শুধু খাবারের কারণে হয় না।
সকালের নাশতার পর পেট ফুলে যাওয়া বা গ্যাসের সমস্যা অনেকেরই হয়। এমন ক্ষেত্রে নাশতায় কী থাকছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি ওটস, চিয়া বীজ ও ব্লুবেরি, ডিম ও টক রুটি, সাধারণ ডোসা, ল্যাকটোজমুক্ত গ্রিক দই ও স্ট্রবেরি, কিউই ও চিয়া পুডিং, কলা ওটস ও আখরোট এবং পালং শাকের অমলেটের মতো সাতটি বিকল্পের কথা বলেছেন।
তবে পেট ফাঁপার কারণ ব্যক্তি ভেদে আলাদা। তাই কোনো খাবার খেয়ে সমস্যা হলে সেটি শুধু স্বাস্থ্যকর বলে জোর করে খাওয়ার দরকার নেই। নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে খাবার বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আর যদি নিয়মিত ব্লোটিংয়ের সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ থাকে, তাহলে শুধু খাবার পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: এনডিটিভি
