logo

ইতিহাসের যে ভয়ংকর মহামারি বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর চেহারা

ইতিহাসের যে ভয়ংকর মহামারি বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর চেহারা
মধ্যযুগীয় শিল্পীরা 'ব্ল্যাক ডেথ' বা প্লেগ মহামারিকে যেভাবে চিত্রিত করেছিলেন। ছবি: দ্য কালেক্টর

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি বরং এ ঘটনাগুলো বদলে দিয়েছে আমাদের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও জীবনযাপনের ধরনও। ব্ল্যাক ডেথ (Black Death) বা কালো মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। চতুর্দশ শতাব্দীতে ছড়িয়ে পড়ে এই ভয়াবহ মহামারি। ইউরোপের বিপুল মানুষ ওই সময় প্রাণ হারান। জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে নেমে আসে আতঙ্ক। বহু গ্রাম হয়ে পড়ে জনশূন্য আর অসংখ্য পরিবার হারিয়ে ফেলে তাদের প্রিয়জনদের।

১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সালের মধ্যে ইউরোপে ব্ল্যাক ডেথের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব দেখা যায়। ঐতিহাসিকদের ধারণা, এই মহামারিতে ইউরোপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক মানুষ মারা গিয়েছিলেন। তবে এর প্রভাব শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ ছিল না। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলও এই মহামারিতে আক্রান্ত হয় সেসময়।

যে তথ্যটি জানলে সবচেয়ে বেশি অবাক হবেন- তা হলো, ব্ল্যাক ডেথের জন্য দায়ী জীবাণু এখনও পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়নি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বর্তমানে এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব হলেও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে এখনো প্লেগের সংক্রমণ আছে।

কিন্তু জানেন কি কীভাবে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল? কেন এত মানুষ মারা প্রাণ হারায়? আর শত শত বছর পরও কেন এই প্লেগের জীবাণু পৃথিবীতে টিকে আছে?

চলুন, জেনে নিই ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই মহামারি সম্পর্কে।

ব্ল্যাক ডেথ

ব্ল্যাক ডেথ ছিল ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী প্লেগ মহামারি। এটি Yersinia pestis নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়েছিল বলে জানা যায়। সংক্রমিত ইঁদুরজাতীয় প্রাণী এবং তাদের শরীরে থাকা মাছির মাধ্যমে এই জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। প্লেগের সাধারণত কয়েকটি ধরন আছে। এর মধ্যে বুবোনিক প্লেগ সবচেয়ে পরিচিত। ব্ল্যাক ডেথের সময় এই রোগের ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটেছিল। তবে নিউমোনিক প্লেগ ও সেপটিসেমিক প্লেগও গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে।

ব্ল্যাক ডেথ নামটির সঙ্গে রোগের কারণে শরীরে কালচে পরিবর্তন দেখা দেওয়ার বিষয়টি প্রায়ই যুক্ত করা হয়ে থাকে। তবে এই নামের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে।


কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল ব্ল্যাক ডেথ?

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং মানুষের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতা

ছবি: পিবিএস
ছবি: পিবিএস

য়াতের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয় সেই সময়।

১৩৪৭ সালের দিকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরগুলো দিয়ে ইউরোপে এই মহামারিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সিসিলি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল দ্রুত আক্রান্ত হয় এতে। পরবর্তী সময়ে মধ্য ও উত্তর ইউরোপের বহু এলাকাতেও এর প্রভাব দেখা দেয়।

তখন মানুষ ব্যাকটেরিয়া কিংবা জীবাণু সম্পর্কে ভালোভাবে জানত না। সংক্রমণ কীভাবে ছড়ায়, তা বোঝার মতো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও ছিল সীমিত। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়া বা রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্লেগের জীবাণু সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে থাকে। নিউমোনিক প্লেগের ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত ক্ষুদ্র জলকণার মাধ্যমেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

কেন এত ভয়াবহ ছিল এই মহামারি

ব্ল্যাক ডেথের ভয়াবহতার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা: সেই সময়ে ব্যাকটেরিয়া, জীবাণু বা সংক্রমণ সম্পর্কে মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ছিল না। আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিকও আবিষ্কৃত হয়নি সেই সময়। ফলে রোগটির কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব ছিল না তখন।

অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও ঘনবসতি: মধ্যযুগের অনেক শহরে ঘরবাড়ি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যবিধিও ছিল দুর্বল। এসব পরিস্থিতিতে ইঁদুর ও মাছির বিস্তার এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের কাজগুলো কঠিন হয়ে উঠত।

মধ্যযুগীয় প্লেগের ঐতিহাসিক চিত্রায়ণ। ছবি: রও পিক্সেল
মধ্যযুগীয় প্লেগের ঐতিহাসিক চিত্রায়ণ। ছবি: রও পিক্সেল

রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণা: সে সময় অনেক মানুষ মনে করতেন, অশুভ শক্তি, ঈশ্বরের অভিশাপ বা আকাশের বিশেষ অবস্থানের কারণে এই রোগ ছড়াচ্ছে। ফলে বৈজ্ঞানিকভাবে সংক্রমণের কারণ বের করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

দ্রুত সংক্রমণ ও উচ্চ মৃত্যুঝুঁকি: প্লেগের কিছু ধরন অল্প সময়ের মধ্যে গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে চিকিৎসা না পেলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি এসব ক্ষেত্রে অনেক বেড়ে যায়। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ও মরদেহ সৎকারের ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়ে যায়।

ব্ল্যাক ডেথে কত মানুষ মারা গিয়েছিল জানেন কি?

ব্ল্যাক ডেথের সবচেয়ে ভয়াবহ সময় ছিল ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সাল, মোট ৪ বছর। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাবের সময়কাল আলাদা ছিল।

ঐতিহাসিকদের প্রচলিত অনুমান অনুযায়ী, ইউরোপে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এই মহামারিতে মারা যায়। তৎকালীন মোট জনসংখ্যার আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা দেওয়া হয়েছে।

তবে যেহেতু সেই সময়ে নির্ভরযোগ্য জনসংখ্যার হিসাব ও মৃত্যুর নথি সব জায়গায় সংরক্ষিত ছিল না, তাই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।

ইউরোপের বাইরেও মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে মহামারিটির ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব থাকলেও কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।

ব্ল্যাক ডেথের লক্ষণ কী ছিল?

প্লেগের ধরন অনুযায়ী লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। ব্ল্যাক ডেথের সময় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকটি লক্ষণ বিশেষভাবে দেখা যেত।

প্লেগ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করছেন একজন চিকিৎসক। ছবি: মিডজার্নি/জেসি (Midjourney/JC)
প্লেগ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করছেন একজন চিকিৎসক। ছবি: মিডজার্নি/জেসি (Midjourney/JC)

হঠাৎ জ্বর ও কাঁপুনি, মাথাব্যথা ও শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, কুঁচকি, বগল বা ঘাড়ের লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া এবং তীব্র ব্যথা, গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ, ত্বকে কালচে পরিবর্তন কিংবা টিস্যুর ক্ষতি, নিউমোনিক প্লেগে কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং কখনো রক্তমিশ্রিত কফ।

বুবোনিক প্লেগে লসিকাগ্রন্থি ফুলে যে বেদনাদায়ক গুটি তৈরি হয়, তাকে বুবো বলা হয়। আর এটি রোগটির অন্যতম পরিচিত লক্ষণ।

প্লেগের তিনটি প্রধান ধরন সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ।

বুবোনিক প্লেগ: সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এতে লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায় এবং জ্বর দেখা দেয়।

নিউমোনিক প্লেগ: এই ধরনে ফুসফুস আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত জলকণার মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরে জীবাণু ছড়াতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।

সেপটিসেমিক প্লেগ: এই ধরনে জীবাণু রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে। রোগীর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

সেই সময়ে মানুষ যেভাবে রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল

ব্ল্যাক ডেথের সময় চিকিৎসা ও জীবাণুবিজ্ঞানের জ্ঞান সীমিত থাকলেও মানুষ সংক্রমণ ঠেকানোর নানা চেষ্টা করেছিল। কিছু শহরে বাইরের লোকজনের প্রবেশ সীমিত করে দেওয়া হয়। আক্রান্ত এলাকা থেকে আসা জাহাজ ও যাত্রীদের নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষায় রাখা বা আলাদা করে রাখার ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সে সময়। পরবর্তী সময়ে এসব অভিজ্ঞতা থেকেই পৃথকীকরণ বা কোয়ারেন্টিনের ধারণা আরও সংগঠিত রূপ পায়। তবে সেই সময়ের সব পদক্ষেপ সমান কার্যকর ছিল না। রোগের প্রকৃত কারণ জানা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ ভুল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করত।

ব্ল্যাক ডেথ বদলে দিয়েছিল ইউরোপের সমাজ ও অর্থনীতি

ব্ল্যাক ডেথের প্রভাব শুধু মৃত্যুর সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ইউরোপের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। মহামারিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাওয়ায় কৃষি, নির্মাণ ও অন্যান্য কাজে শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়। শ্রমিকের সংকটের কারণে কিছু এলাকায় তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে। ফলে মজুরি বাড়ার প্রবণতাও দেখা যায়। পাশাপাশি অনেক কৃষিজমি চাষ করার মতো মানুষ অবশিষ্ট ছিল না। কিছু জমি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। আবার কিছু এলাকায় জমির মালিকদের শ্রমিক আকৃষ্ট করতে বেশি সুবিধা দিতে হয়। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ও জমির ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে।

১৩৪৮ সালের ব্ল্যাক ডেথ (প্লেগ মহামারি)। ছবি: পল লেহুগারের ‘হিস্ট্রি অফ ফ্রান্স ইন ওয়ান হান্ড্রেড সিনস’ (History of France in One Hundred Scenes) গ্রন্থ থেকে নেওয়া।
১৩৪৮ সালের ব্ল্যাক ডেথ (প্লেগ মহামারি)। ছবি: পল লেহুগারের ‘হিস্ট্রি অফ ফ্রান্স ইন ওয়ান হান্ড্রেড সিনস’ (History of France in One Hundred Scenes) গ্রন্থ থেকে নেওয়া।

অন্যদিকে, মহামারি ঠেকাতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। এতে মানুষের মধ্যে ভয়, হতাশা ও প্রচলিত বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে আতঙ্কের কারণে কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। এ ছাড়া মহামারির পর ইউরোপের জনসংখ্যা আগের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরেও প্লেগের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তাই ব্ল্যাক ডেথকে মধ্যযুগীয় ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শত শত বছর পরও প্লেগ কেন পৃথিবীতে টিকে আছে?

অনেকের ধারণা, ব্ল্যাক ডেথের মতো ভয়াবহ মহামারি এখন আর পৃথিবীতে নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্লেগের জীবাণু এখনও প্রকৃতিতে টিকে আছে। ৮ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০-এর দশক থেকে মানুষের মধ্যে প্লেগের বেশির ভাগ সংক্রমণের খবর এসেছে আফ্রিকা থেকে। বিশেষ করে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও মাদাগাস্কারে রোগটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও প্লেগের সংক্রমণ ঘটে। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে বছরে গড়ে প্রায় সাতটি মানব সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়। এসব সংক্রমণের বেশির ভাগই দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ এলাকায় দেখা যায়।

এর প্রধান কারণ হলো, প্লেগের জীবাণু বন্য ইঁদুরজাতীয় প্রাণী ও অন্যান্য ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকতে পারে। এসব প্রাণীর শরীরে থাকা সংক্রমিত মাছি মানুষের শরীরেও জীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে। বন্য প্রাণীদের মধ্যে জীবাণুর এই প্রাকৃতিক চক্র পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। ফলে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হলেও পৃথিবী থেকে প্লেগের জীবাণু সম্পূর্ণ নির্মূল করা সহজ নয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদের উত্তরের একটি প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর দাঁতে পাওয়া প্রাচীন জীবাণুর প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, ওই অঞ্চলে প্লেগের কোনো একটি রূপ অন্তত ৫ হাজার ৫০০ বছর আগে থেকেই ছিল। অর্থাৎ, প্লেগ শুধু মধ্যযুগের ইউরোপের ঘটনা নয়। এই জীবাণুর ইতিহাস মানুষের লিখিত ইতিহাসেরও বহু আগের।

আধুনিক চিকিৎসায় কি প্লেগ নিরাময় সম্ভব?

হ্যাঁ, বর্তমানে প্লেগের চিকিৎসা সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হলো, রোগের কারণ শনাক্ত করা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সাহায্যে সংক্রমণের চিকিৎসা করা। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে প্লেগ নিরাময় সম্ভব। কিন্তু বুঝতে হবে, চিকিৎসা নিতে দেরি হলে রোগটি প্রাণঘাতী হতে পারে। এ কারণে প্লেগের সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস, ভ্রমণ কিংবা অসুস্থ বা মৃত বন্য প্রাণীর সংস্পর্শে আসার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে তা জানাতে হবে।

ছবি: ট্রি-সিটি হেরাল্ড
ছবি: ট্রি-সিটি হেরাল্ড

প্লেগ প্রতিরোধে কিছু দেশে বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য টিকার ব্যবস্থা বা সুপারিশ রয়েছে। তবে টিকা সবার জন্য নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের তুলনায় পরীক্ষাগারকর্মী ও নির্দিষ্ট ঝুঁকিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে টিকা বিবেচনা করা হতে পারে। নিউমোনিক প্লেগের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কেও পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তাই শুধু টিকার ওপর নির্ভর না করে সংক্রমণ এড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

ব্ল্যাক ডেথ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংক্রামক রোগ শুধু মানুষের শরীরকে আক্রান্ত করে না বরং পুরো সমাজকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। রোগের কারণ সম্পর্কে অজ্ঞতা, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ভুল তথ্যের বিস্তার একটি সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্ল্যাক ডেথের সময় মানুষ জানত না কীভাবে একটি ব্যাকটেরিয়া এত মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। আজ বিজ্ঞান সেই জীবাণুকে শনাক্ত করতে পারে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সাহায্যে চিকিৎসাও করতে পারে। তবু জীবাণুটি প্রকৃতিতে রয়ে গেছে, যা আমাদের সতর্ক থাকার কথা মনে করিয়ে দেয়।

ব্ল্যাক ডেথ তাই কেবল অতীতের একটি ভয়াবহ অধ্যায় নয়। এটি ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি, বিজ্ঞান এবং মানবিক সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র

NDTV, Why The Plague Has Not Disappeared And How Modern Medicine Manages It

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC), প্লেগ রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত

CDC, প্লেগের কারণ ও সংক্রমণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), প্লেগ রোগের তথ্য

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ব্ল্যাক ডেথ