উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা হার্ট অ্যাটাক এড়াতে মেনে চলুন ৫ অভ্যাস

উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরে থেকে যায়। তাই অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনির সমস্যা ও চোখের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লেই হার্ট অ্যাটাক হবে, এমন নয়। বরং নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া এবং জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা গেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বন্ধ এবং পর্যাপ্ত ঘুম হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ওষুধ খেলেই কি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকের ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়। খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ওজন, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণের মতো বিষয়গুলিও রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলে।
তাই চিকিৎসক ওষুধ দিলে তা নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করা বা ডোজ কমানো উচিত নয়। একই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনাও জরুরি।
খাবারে লবণ ও সোডিয়াম কমান
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে খাবারে অতিরিক্ত সোডিয়াম কমানো গুরুত্বপূর্ণ। শুধু রান্নার লবণ নয়, প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারেও সোডিয়াম থাকতে পারে।
তাই নিয়মিত বেশি লবণযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত নোনতা স্ন্যাকস, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও বেশি সোডিয়ামযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার কমানো ভালো।
খাদ্যতালিকায় বেশি করে রাখতে পারেন সবজি, ফল, পূর্ণশস্য, ডাল, বাদাম, মাছ এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে DASH ধরনের হৃদ্স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও উপকারী হতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
শরীরচর্চা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। একেবারে ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকলে শুরুতেই কঠিন শরীরচর্চা করার প্রয়োজন নেই।
হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী অন্য কোনো মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরামর্শ দেয়।
তবে যাদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ, খুব বেশি রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা ভালো।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অতিরিক্ত ওজন উচ্চ রক্তচাপসহ হৃদ্রোগের বিভিন্ন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
এর জন্য না খেয়ে থাকা বা হঠাৎ কঠোর ডায়েট করার দরকার নেই। বরং খাবারের পরিমাণ ও মান ঠিক করা, সবজি ও পূর্ণশস্য বাড়ানো, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস তৈরি করা বেশি কার্যকর।
এমনকি শরীরের ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেও কিছু মানুষের রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে উপকার হতে পারে।
ঘুমের সমস্যা, বিশেষ করে স্লিপ অ্যাপনিয়া উপেক্ষা করবেন না
জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাঁসফাঁস করে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। তাই এমন উপসর্গ নিয়মিত হলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তবে নাক ডাকলেই যে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে, তা নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করতে পারেন।
নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন এবং ওষুধ ঠিকমতো খান
উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা। কারণ অনেকের ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে গেলেও শরীরে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না।
বাড়িতে রক্তচাপ মাপলে নিয়মিত রেকর্ড রাখলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরবর্তী পরামর্শের সময় তা কাজে লাগতে পারে। তবে একবারের একটি রিডিং দিয়েই উচ্চ রক্তচাপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
চিকিৎসক যদি রক্তচাপ কমানোর ওষুধ দিয়ে থাকেন, তা নির্ধারিত নিয়মে খাওয়া জরুরি। রক্তচাপ স্বাভাবিক মনে হলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়।
ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহলও ঝুঁকি বাড়ায়
উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি ধূমপান হৃদ্রোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। তাই ধূমপান করলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত।
অতিরিক্ত অ্যালকোহলও রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অ্যালকোহল গ্রহণ করলে তা সীমিত করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা ভালো।
স্ট্রেসকেও গুরুত্ব দিন
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সরাসরি সবসময় উচ্চ রক্তচাপের একমাত্র কারণ নয়, তবে স্ট্রেসের কারণে অনিয়মিত খাবার, কম শরীরচর্চা, ধূমপান বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের মতো অভ্যাস তৈরি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস রক্তচাপের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই নিয়মিত হাঁটা, শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রয়োজন হলে রিলাক্সেশন পদ্ধতি অনুসরণ করা উপকারী হতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন?
রক্তচাপ খুব বেশি বেড়ে গেলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে রক্তচাপ ১৮০/১২০ mmHg-এর বেশি হওয়ার সঙ্গে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা বা অবশভাব, দৃষ্টির পরিবর্তন কিংবা কথা বলতে সমস্যা হলে এটি জরুরি পরিস্থিতি হতে পারে। এমন অবস্থায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপকে শুধু একটি সংখ্যার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তবে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ, কম সোডিয়ামযুক্ত সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রক্তচাপ স্বাভাবিক দেখালেই চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। জীবনযাপনের পরিবর্তন ও চিকিৎসা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বেশি কার্যকর।


