logo
Advertisement

লিভার ও কিডনি পরিষ্কার রাখতে সকালে কোন পানীয়গুলো খাবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
লিভার ও কিডনি পরিষ্কার রাখতে সকালে কোন পানীয়গুলো খাবেন
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা বা কফি দিয়ে দিন শুরু করার অভ্যাস অনেকেরই। আবার কেউ দিন শুরু করেন খালি পেটে গরম পানি, লেবু পানি কিংবা ভেষজ পানীয় দিয়ে। স্বাস্থ্যকর কিছু পানীয় শরীরে প্রয়োজনীয় তরল জোগাতে পারে এবং দিনের শুরুতে ভালো একটি অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। লিভার বা কিডনিকে আলাদা করে পরিষ্কার বা ডিটক্স করার জন্য কোনো বিশেষ পানীয়ের প্রয়োজন হয়, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শরীরের বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল অপসারণে কিডনি এবং বিপাকীয় বিভিন্ন কাজে লিভার নিজেরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এসব পানীয়কে ডিটক্সের ওষুধ হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে দেখা ভালো।

তবু চিনি ছাড়া, পরিমিত এবং উপযোগী কিছু পানীয় দিনের শুরুতে নেওয়া যেতে পারে। চলুন জেনে নিই বমেন ৭টি পানীয়ের কথা।

লেবু ও হলুদ মেশানো পানি

এক গ্লাস পানিতে অল্প লেবুর রস ও সামান্য হলুদ মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। লেবু থেকে ভিটামিন সি পাওয়া যায় এবং পানি শরীরে তরলের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে।

হলুদের সক্রিয় উপাদান কারকিউমিন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। এর প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে শুধু হলুদ পানি খেলেই লিভার পরিষ্কার হয়ে যাবে বা কিডনির সব বর্জ্য বের হয়ে যাবে, এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

যেভাবে তৈরি করবেন: এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে আধা লেবুর রস ও এক চিমটি হলুদ মিশিয়ে নিতে পারেন। অতিরিক্ত চিনি না দেওয়াই ভালো।

জিরা পানি

জিরা আমাদের রান্নাঘরের পরিচিত মসলা। অনেকেই হজমের জন্য জিরা ভেজানো পানি পান করেন। এতে অতিরিক্ত চিনি বা কৃত্রিম উপাদান না থাকায় এটি দিনের শুরুতে একটি সাধারণ পানীয় হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।

তবে জিরা পানি কিডনি থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয় বা লিভার ডিটক্স করে, এমন দাবির পক্ষে শক্ত মানব গবেষণা নেই। তাই এটিকে স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে দেখা ভালো, কোনো চিকিৎসা হিসেবে নয়।

ছবি: হেল্থশট্স
ছবি: হেল্থশট্স

যেভাবে তৈরি করবেন: এক চা চামচ জিরা এক গ্লাস পানিতে রাতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে কয়েক মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে হালকা গরম অবস্থায় পান করতে পারেন।

আমলকীর পানি বা জুস

আমলকীতে ভিটামিন সি ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। পরিমিত পরিমাণে তাজা আমলকী খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

তবে আমলকীর জুস খেলেই লিভার বা কিডনি পরিষ্কার হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। বিশেষ করে বাজারের প্যাকেটজাত আমলকীর জুসে অতিরিক্ত চিনি থাকতে পারে। তাই খেলে চিনি ছাড়া বা কম চিনি দিয়ে খাওয়াই ভালো।

ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

যেভাবে তৈরি করবেন: কয়েকটি তাজা আমলকী ভালোভাবে ধুয়ে পানি দিয়ে ব্লেন্ড করে নিতে পারেন। প্রয়োজন হলে ছেঁকে পান করুন।

ডাবের পানি

ডাবের পানি শরীরে তরল ও কিছু ইলেকট্রোলাইট সরবরাহ করে। গরমের দিনে বা শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকলে এটি একটি ভালো পানীয় হতে পারে।

তবে ডাবের পানিকেও কিডনি বা লিভারের ডিটক্স পানীয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বিশেষ করে যাদের কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত তরল বা পটাশিয়াম সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

কিডনি রোগীদের কতটা তরল বা পটাশিয়াম নেওয়া উচিত, তা রোগের ধরন ও কিডনির কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

আদা ও পুদিনার চা

সকালের চায়ে চিনি না দিয়ে আদা ও পুদিনা ব্যবহার করা যেতে পারে। আদা অনেকের ক্ষেত্রে হজমের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। পুদিনাও খাবার ও পানীয়তে স্বাদ ও সতেজতা যোগ করে।

তবে আদা বা পুদিনার চা লিভারের বিষাক্ত পদার্থ সরিয়ে দেয়, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এটি মূলত চিনি ছাড়া একটি উষ্ণ ও হালকা পানীয় হিসেবে উপভোগ করা যেতে পারে।

ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

যেভাবে তৈরি করবেন: এক টুকরো তাজা আদা ও কয়েকটি পুদিনা পাতা পানিতে দিয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে নিন। চাইলে হালকা গরম অবস্থায় পান করতে পারেন।

মেথি পানি

মেথি বীজে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে মেথি পানি খেলে কিডনি ও লিভার ডিটক্স হয়ে যায়, এমন দাবি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

মেথি রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, তাদের নিয়মিত মেথি পানি শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ছবি: ফ্রিপিক
ছবি: ফ্রিপিক

যেভাবে তৈরি করবেন: এক চা চামচ মেথি বীজ রাতে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে পানি ছেঁকে পান করতে পারেন।

তুলসী চা

তুলসী দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর পাতায় বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। চিনি ছাড়া তুলসী চা সকালে একটি হালকা পানীয় হতে পারে।

তবে তুলসী চা লিভার বা কিডনি থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়, এমন বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই। তাই এটিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

যেভাবে তৈরি করবেন: এক মুঠো পরিষ্কার তুলসী পাতা পানিতে দিয়ে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। এরপর ছেঁকে হালকা গরম অবস্থায় পান করুন।

আসলেই কি ডিটক্স পানীয় দরকার?

ডিটক্স শব্দটি শুনতে আকর্ষণীয় হলেও শরীরকে আলাদা করে পরিষ্কার করার জন্য বিশেষ কোনো পানীয় দরকার, এমন প্রমাণ নেই। কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। অন্যদিকে লিভার শরীরের বিপাকীয় নানা প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ বা NCCIH জানিয়েছে, বিভিন্ন ডিটক্স ডায়েট ও ক্লিনজের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বের করার দাবির পক্ষে শক্ত গবেষণাগত প্রমাণ নেই। বরং অতিরিক্ত উপবাস, শুধু জুস পান করা কিংবা প্রচুর পানি ও হারবাল চা খেয়ে খাবার বাদ দেওয়ার মতো পদ্ধতি ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত পানি পান করলেও শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কিডনি ও লিভার ভালো রাখতে আসলে কী করবেন?

একটি নির্দিষ্ট পানীয়ের ওপর নির্ভর করার চেয়ে দৈনন্দিন জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন
  • অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমান
  • ফল, সবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন
  • অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
  • অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা করুন
  • অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সীমিত রাখুন
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হারবাল বা detox supplement ব্যবহার করবেন না

যাদের কিডনি রোগ, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পানীয় বা তরলের পরিমাণও ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। কিডনি রোগে অনেক সময় অতিরিক্ত তরল গ্রহণ সীমিত করতে হয়।

শুধু পানীয় নয়, অভ্যাসটাই গুরুত্বপূর্ণ

সকালে এক গ্লাস পানি, লেবু পানি, ডাবের পানি বা চিনি ছাড়া ভেষজ চা দিয়ে দিন শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু এটিকে লিভার বা কিডনি পরিষ্কার করার বিশেষ পদ্ধতি মনে করার প্রয়োজন নেই।

শরীরের সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। কিডনি বা লিভারের কোনো রোগ থাকলে শুধু ঘরোয়া পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়াই জরুরি।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া