এগ ফ্রিজিং কী, বাংলাদেশে কি এই সেবা পাওয়া যায়

সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা অনেক নারীই ব্যক্তিগত, পেশাগত বা চিকিৎসাজনিত নানা কারণে পিছিয়ে দেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে থাকে। ফলে পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণের একটি উপায় হতে পারে ‘এগ ফ্রিজিং’।
এগ ফ্রিজিং বা ওসাইট ক্রায়োপ্রিজারভেশন হলো এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে নারীর ডিম্বাশয় থেকে নিষিক্ত না হওয়া ডিম্বাণু সংগ্রহ করে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। পরে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে এসব ডিম্বাণু ব্যবহার করে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও কয়েক বছর ধরে এগ ফ্রিজিংয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে এই পদ্ধতি নিয়ে এখনো অনেকের মধ্যে রয়েছে নানা প্রশ্ন। কেন ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হয়, কীভাবে করা হয়, এর খরচ কত এবং ডিম্বাণু ফ্রিজ করে রাখলেই কি ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার নিশ্চয়তা মেলে?
কেন ডিম্বাণু ফ্রিজ করেন নারীরা
এগ ফ্রিজিংয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার একটি সম্ভাবনা ধরে রাখা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর ডিম্বাণুর সংখ্যা ও মান কমতে থাকে। তাই তুলনামূলক কম বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখলে পরবর্তী সময়ে সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ থাকে।
চিকিৎসাজনিত কারণেও অনেক নারী ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন। বিশেষ করে ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির আগে এই পদ্ধতি বিবেচনা করা হতে পারে। এসব চিকিৎসা কখনো কখনো ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মেহনাজ মুশতারী সুমি বলেন, কেমোথেরাপির কারণে ডিম্বাশয়ের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকায় অনেক নারী আগেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখেন।
ডিম্বাশয়ে অস্ত্রোপচার বা প্রজননক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো চিকিৎসার আগেও চিকিৎসকের পরামর্শে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হতে পারে।
তবে চিকিৎসাজনিত কারণ ছাড়াও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কেউ কেউ এগ ফ্রিজিং করেন। যেমন পড়াশোনা, ক্যারিয়ার বা অন্য কোনো কারণে এখনই সন্তান নিতে না চাইলে ভবিষ্যতের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন। উপযুক্ত সঙ্গী না পাওয়ার কারণেও কেউ সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন।
এ ধরনের কারণে ডিম্বাণু সংরক্ষণকে সাধারণভাবে সোশ্যাল এগ ফ্রিজিং বলা হয়।
বয়স বাড়লে কেন ডিম্বাণুর মান কমে
নারীরা নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর নতুন করে ডিম্বাণু তৈরি হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে থাকে এবং সময়ের সঙ্গে অবশিষ্ট ডিম্বাণুর গুণগত মানও কমে যেতে পারে।
আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, একটি মেয়ে জন্মের সময় প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ ডিম্বাণু নিয়ে জন্মায়। বয়ঃসন্ধির সময় এই সংখ্যা কমে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখে দাঁড়ায়। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা আরও কমতে থাকে।
তাই তুলনামূলক কম বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য ভালো মানের ডিম্বাণু পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকতে পারে।
কীভাবে এগ ফ্রিজিং করা হয়
যুক্তরাজ্যের ফার্টিলিটি চিকিৎসার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিউম্যান ফার্টিলাইজেশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, এগ ফ্রিজিংয়ের আগে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নারীর ডিম্বাশয়ের অবস্থা ও ডিম্বাণুর সম্ভাব্য সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।
এরপর সাধারণত হরমোনের ওষুধ বা ইনজেকশন দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো একই সময়ে একাধিক ডিম্বাণুকে পরিপক্ব হতে সহায়তা করা।
ডিম্বাণু পরিপক্ব হলে অ্যানেসথেশিয়া বা সেডেশনের মাধ্যমে সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে যোনিপথ দিয়ে একটি সরু সূচ প্রবেশ করিয়ে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পেটের মধ্য দিয়েও ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হতে পারে।
সংগ্রহের পর ডিম্বাণুগুলো সাধারণত ভিট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে দ্রুত হিমায়িত করা হয়। এরপর তরল নাইট্রোজেনের মধ্যে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়।
ডিম্বাণু কীভাবে ব্যবহার করা হয়
ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সংরক্ষিত ডিম্বাণুগুলো হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করা হয়। যেসব ডিম্বাণু এই প্রক্রিয়ায় অক্ষত থাকে, সেগুলোতে শুক্রাণু প্রবেশ করিয়ে নিষিক্ত করা হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণু ধীরে ধীরে ভ্রূণে পরিণত হলে তা জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। ভ্রূণটি সফলভাবে জরায়ুতে স্থাপিত হলে গর্ভধারণ হতে পারে।
গাই'স অ্যান্ড সেন্ট থমাস এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী,হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করার পর প্রতি ১০টি ডিম্বাণুর মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ৯টি টিকে থাকতে পারে। তবে বুঝতে হবে, ডিম্বাণু টিকে থাকা এবং পরবর্তী সময়ে সফল গর্ভধারণ এক বিষয় নয়। পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সাফল্যের সম্ভাবনা আলাদা।
এগ ফ্রিজিং আর এমব্রিও ফ্রিজিং কি এক?
দুটি পদ্ধতির উদ্দেশ্য কাছাকাছি হলেও এগ ফ্রিজিং ও এমব্রিও ফ্রিজিং এক নয়।

এগ ফ্রিজিংয়ে নিষিক্ত না হওয়া ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হয়। অন্যদিকে, ডিম্বাণু ও শুক্রাণু নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করার পর সেটি হিমায়িত করে রাখলে তাকে ‘এমব্রিও ফ্রিজিং’ বলা হয়। অর্থাৎ, এমব্রিও ফ্রিজিংয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সময় সংরক্ষিত ভ্রূণ হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করে জরায়ুতে স্থাপন করা যায়।
বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিংয়ের সেবা আছে?
বাংলাদেশেও এগ ফ্রিজিংয়ের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখনো চিকিৎসাজনিত কারণ ছাড়া ভবিষ্যতের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ বা সোশ্যাল এগ ফ্রিজিং খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি। ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম জানান, মূলত ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নিতে হবে এমন কিছু নারী ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন।
তার প্রতিষ্ঠানে গত এক দশকে প্রায় ৮ থেকে ১০ জন নারী ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে তাদের কেউ এখনো সংরক্ষিত ডিম্বাণু ব্যবহার করতে ফিরে আসেননি। ফলে বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিংয়ের পর সন্তান জন্মের সাফল্যের হার সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্থানীয় তথ্য এখনো নেই।
বাংলাদেশে কোথায় এগ ফ্রিজিং করা যায়
বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিং বা ডিম্বাণু সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ঢাকায় কয়েকটি ফার্টিলিটি সেন্টার ও প্রজনন চিকিৎসাকেন্দ্রে ফার্টিলিটি প্রিজারভেশন সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানে ডিম্বাণু ফ্রিজিংয়ের সেবা একইভাবে বা একই পরিসরে পাওয়া যায় না। তাই চিকিৎসা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বর্তমানে সেবা চালু আছে কি না, কী ধরনের রোগীর জন্য করা হয় এবং মোট খরচ কত, তা জেনে নেওয়া জরুরি।
ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (ICRC): ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সেবার তালিকায় ফার্টিলিটি প্রিজারভেশনের আওতায় egg ও embryo freezing উল্লেখ করা হয়েছে। ICRC-এর তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনের পাশাপাশি elective fertility preservation বা ভবিষ্যতের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ডিম্বাণু সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ICRC- আরও জানিয়েছে, ডিম্বাণু সংগ্রহের প্রক্রিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। বয়স ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ওপর ভিত্তি করে এই খরচ কমবেশি হতে পারে। এর বাইরে ডিম্বাণু সংরক্ষণের জন্য এককালীন প্রায় ৫৫ হাজার টাকা এবং সংরক্ষণ চালিয়ে যেতে বছরে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। তবে এগুলো নির্দিষ্ট রোগী বা চিকিৎসার জন্য প্রযোজ্য খরচের হিসাব, তাই চিকিৎসা শুরুর আগে বর্তমান ফি সরাসরি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিশ্চিত করা উচিত।
ঢাকা ফার্টিলিটি সেন্টার (DFC): পান্থপথের সিটি টাওয়ারে অবস্থিত ঢাকা ফার্টিলিটি সেন্টারও তাদের সেবার তালিকায় fertility preservation উল্লেখ করেছে এবং egg ও sperm freezing-এর সুবিধার কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকায় আরও কয়েকটি ফার্টিলিটি সেন্টার ও IVF কেন্দ্র রয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের IVF বা embryo freezing সেবা থাকলেই সেখানে elective egg freezing চালু আছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। উদাহরণ হিসেবে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অনলাইন তথ্য ও সেবা তালিকায় পার্থক্য দেখা যায়। তাই রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করাই নিরাপদ।
বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিংয়ের খরচ কত?
বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিংয়ের মোট খরচ একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম হতে পারে। শুধু ডিম্বাণু সংগ্রহের খরচ নয়, এর সঙ্গে প্রাথমিক পরীক্ষা, হরমোনের ওষুধ, ডিম্বাণু সংগ্রহের প্রক্রিয়া, ল্যাবরেটরি চার্জ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের খরচ যুক্ত হতে পারে।
যে প্রতিষ্ঠানে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হবে, সেখানে আগে থেকেই কিছু বিষয় জেনে নেওয়া ভালো-
- প্রাথমিক পরামর্শ ও পরীক্ষার খরচ কত
- হরমোনের ওষুধের আনুমানিক খরচ কত
- ডিম্বাণু সংগ্রহের খরচ কত
- ভিট্রিফিকেশন বা ফ্রিজিংয়ের জন্য কত টাকা লাগে
- বছরে সংরক্ষণ ফি কত
- ভবিষ্যতে ডিম্বাণু ব্যবহার করে IVF বা ICSI করতে অতিরিক্ত কত খরচ হবে
- ডিম্বাণু ব্যবহার না করলে পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণ বা নিষ্পত্তির নিয়ম কী
অর্থাৎ, শুধু ফ্রিজিংয়ের খরচ জানলেই পুরো চিকিৎসার ব্যয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। ভবিষ্যতে সংরক্ষিত ডিম্বাণু ব্যবহার করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সেই চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচও আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগ ফ্রিজিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া। কোন বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হবে, কতগুলো ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পদ্ধতি কতটা উপযোগী, তা চিকিৎসকই সবচেয়ে ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন।
বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিং করতে কত খরচ?
ডা. রাশিদা বেগমের তথ্য অনুযায়ী, তার প্রতিষ্ঠানে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। বয়স এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের পরিমাণ অনুযায়ী এই খরচ কমবেশি হতে পারে।
এরপর ডিম্বাণু ফ্রিজ করার জন্য এককালীন প্রায় ৫৫ হাজার টাকা দিতে হয়। সংরক্ষণ চালিয়ে যেতে বছরে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়।
তবে হাসপাতাল বা ফার্টিলিটি সেন্টারভেদে খরচের পার্থক্য থাকতে পারে। ডা. মেহনাজ মুশতারী সুমি জানান, বার্ষিক সংরক্ষণ ফি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ৩০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
ডা. রাশিদা বেগম আরও জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে এমব্রিও ফ্রিজিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক নারী সংরক্ষিত ভ্রূণ ব্যবহার করে সন্তান নিচ্ছেন। এগ ফ্রিজিং ও এমব্রিও ফ্রিজিংয়ের খরচও অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি হতে পারে।
ডিম্বাণু ফ্রিজ করলেই কি পরে সন্তান হবে?
না। ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। সফলতার সম্ভাবনা নির্ভর করে ডিম্বাণু সংগ্রহের সময় নারীর বয়স, কতগুলো ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হয়েছে, ডিম্বাণুর মান এবং পরে নিষিক্তকরণ ও ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপনের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
গাই'স অ্যান্ড সেন্ট থমাসের তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ বছরের কম বয়সে ১২টি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলে পরে সেগুলো ব্যবহার করে গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ হতে পারে। ২০টি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা থাকলে এই সম্ভাবনা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
তবে এগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও হিসাবের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া সম্ভাবনা। কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
যুক্তরাজ্যের এইচএফইএ বলছে, এগ ফ্রিজিং প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি হলেও এই পদ্ধতির মাধ্যমে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মের সাফল্য নিয়ে সাধারণ আইভিএফের তুলনায় নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো তুলনামূলকভাবে কম।
কতদিন ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা যায়?
ডিম্বাণু কতদিন হিমায়িত করে রাখা যায়, তা দেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে ডিম্বাণু, শুক্রাণু বা ভ্রূণ সর্বোচ্চ ৫৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তবে সংরক্ষণ চালিয়ে যেতে নির্দিষ্ট সময় পরপর নতুন করে সম্মতি দিতে হয়।
দীর্ঘদিন হিমায়িত অবস্থায় রাখলে ডিম্বাণুর কার্যকারিতা কমে যায় কি না, সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছে এইচএফইএ।
তবে ডিম্বাণু কতদিন সংরক্ষণ করা যাবে, তা নিয়ে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তথ্য জেনে নেওয়া জরুরি।
এগ ফ্রিজিংয়ের ঝুঁকি কী?
এগ ফ্রিজিং সাধারণভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাপদ্ধতি হলেও এর কিছু ঝুঁকি রয়েছে। ডিম্বাণু সংগ্রহের আগে সাধারণত প্রায় দুই সপ্তাহ হরমোনের ওষুধ বা ইনজেকশন দেওয়া হয়। এর একটি সম্ভাব্য জটিলতা হলো ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম বা ওএইচএসএস।
এতে পেটে অস্বস্তি, শরীরে তরল জমা এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়তে পারে। গুরুতর হলে হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। গাই'স অ্যান্ড সেন্ট থমাসের তথ্য অনুযায়ী, ভিট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে এই জটিলতার ঝুঁকি এক শতাংশেরও কম।

ডিম্বাণু সংগ্রহের সময়ও কিছু ঝুঁকি থাকে। যেমন সংক্রমণ, রক্তপাত কিংবা আশপাশের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সামান্য আশঙ্কা রয়েছে। অ্যানেসথেশিয়া বা সেডেশনের কারণেও বিরল ক্ষেত্রে অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হতে পারে।
আবার হরমোনের ওষুধে ডিম্বাশয় যথেষ্ট সাড়া না দিলে বা সংগ্রহ করা ডিম্বাণু সংরক্ষণের উপযোগী না হলে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হতে পারে।
ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এগ ফ্রিজিংয়ের পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ফলে কেমোথেরাপি শুরুতে দেরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রোগীর চিকিৎসা কতটা জরুরি, তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নেন ডিম্বাণু সংরক্ষণের সুযোগ নেওয়া যাবে কি না।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী জানা দরকার?
এগ ফ্রিজিং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার একটি সম্ভাবনা ধরে রাখার সুযোগ দিতে পারে। তবে এটি ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের নিশ্চয়তা নয়। বরং এটি একটি সম্ভাবনা সংরক্ষণের পদ্ধতি।
কোন বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হবে, কতগুলো ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, চিকিৎসার ঝুঁকি কী এবং ভবিষ্যতে সাফল্যের সম্ভাবনা কতটা হতে পারে, এসব বিষয় ব্যক্তিভেদে আলাদা। তাই এগ ফ্রিজিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা জরুরি।
বিশেষ করে চিকিৎসাজনিত কারণে ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে মূল রোগের চিকিৎসা যাতে অযথা পিছিয়ে না যায়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত এগ ফ্রিজিংকে নিশ্চিত সমাধান হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সম্ভাবনা ধরে রাখার একটি চিকিৎসা বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত।


-67ce5e.jpg)